এক শিল্পগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখতে ৩৬ ব্যাংকের উদ্যোগ অন্য সংকটাপন্ন শিল্পের ক্ষেত্রে কেন নয়

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১০ এএম

একটি শিল্পকারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠছে। শ্রমিকরা কাজে যাচ্ছেন। কাঁচামাল ঢুকছে, উৎপাদন হচ্ছে, পণ্য বাজারে যাচ্ছে। সেই উৎপাদন থেকে আয় হচ্ছে, আর সেই আয় থেকেই ধীরে ধীরে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে আরেকটি কারখানার চিমনি নীরব। মেশিন আছে, ভবন আছে, শ্রমিকের দক্ষতা আছে, বাজারও আছে। কিন্তু কাঁচামাল নেই। এলসি খোলা যাচ্ছে না। ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত। কয়েক মাস পর উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। শ্রমিকের কাজ নেই, প্রতিষ্ঠানের আয় নেই, আর ব্যাংকের পাওনা ফেরত পাওয়ার পথও আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের দুই বড় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেন এমনই দুই ভিন্ন ছবি সামনে এনেছে।

দুই গ্রুপেরই রয়েছে বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ। দুই পক্ষই ব্যবসায়িক সংকটের কথা বলছে। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় তাদের ক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছে ভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ। সিটি গ্রুপের ব্যবসা সচল রেখে ঋণ পুনর্গঠনের পথ খুঁজছে একাধিক ব্যাংক। অন্যদিকে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ঋণ, সম্পদ ও মালিকানা নিয়ে তদন্ত ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের মধ্যে তাদের কয়েকটি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে ঋণ আদায় ও শিল্পসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য কি দুই ধরনের নীতি তৈরি হয়েছে?

চলতি বছরের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ বর্তমানে বড় ধরনের ঋণ ও তারল্য সংকটের মধ্যে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুটি বিদেশি ব্যাংকসহ ৩৬টি ব্যাংকের কাছে গ্রুপটির বকেয়া ঋণের পরিমাণ ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি। তবে জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ২৯টি ব্যাংকে সিটি গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যাংক ও সূত্রের হিসাবে ঋণের অঙ্কে পার্থক্য রয়েছে। তবে, বড় অঙ্কের ঋণ থাকলেও জুন পর্যন্ত এসব ঋণ আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়নি। বরং ব্যাংকগুলো গ্রুপটির ব্যবসা সচল রেখে কীভাবে পাওনা আদায় করা যায়, সেই পথ খুঁজছে। ১৮ জুন ৩৬টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সিটি গ্রুপের ঋণ নিয়ে বৈঠকে বসেন। সেখানে ঋণ পুনর্গঠন, ব্যাংকগুলোর সমন্বিত তদারকি এবং গ্রুপটির নগদ অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিকে সিটি গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে রাখার পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র মনিটরিং কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে বাইরের পুনর্গঠন বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সিটি গ্রুপের ব্যাংকিং সুবিধাগুলো চালু রাখতে এবং ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত প্রভিশনের চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে চলতি বছরের ডিসেম্বর বা তার পরবর্তী সময় পর্যন্ত ঋণগুলো খেলাপি না করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ অনুমোদন চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ ঋণ আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর ভাষ্য, কোনো একটি ব্যাংক যদি এককভাবে সিটি গ্রুপের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিন্তু সব ব্যাংক একসঙ্গে কাজ করলে সফলতার সম্ভাবনা বাড়ে।

এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের উদ্যোগে এই প্রক্রিয়া এগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও প্রস্তাবিত সমাধানের সঙ্গে একমত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাসরুর আরেফিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির বার্ষিক আয় প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মী প্রায় ২৫ হাজার। গ্রুপটির ব্যবসা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়নি। অর্থাৎ তাদের উৎপাদন ও ব্যবসা থেকে এখনও আয় করার সক্ষমতা রয়েছে। গ্রুপটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টাকার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষতি, ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত চলতি মূলধন না পাওয়া এবং গ্যাস সংযোগে বিলম্ব তাদের ব্যবসায় বড় চাপ তৈরি করেছে। ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় আমদানি সক্ষমতা কমেছে। আবার কয়েকটি বড় শিল্প প্রকল্প গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারেনি।

ব্যাংকারদের বিবেচনায় তাই প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাংকের পাওনা আদায় আরও কঠিন হবে। বরং ব্যবসা চালু রাখা গেলে ভবিষ্যতের আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৩০ জুন ২০২৬-এর মুদ্রানীতি ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সিটি গ্রুপের ২৯টি ব্যাংকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। তিনি জানান, তিনি তিনটি বড় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের একটি সমাধান বের করতে বলেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো কিছু সমাধান প্রস্তাব করেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে সহায়তা করবে। গভর্নর আরও আশা প্রকাশ করেন, সিটি গ্রুপের ঋণ সংকট তিন মাসের মধ্যে সমাধানের পথে যেতে পারে।

অন্যদিকে এস আলম গ্রুপের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, ঋণ ও সম্পদ নিয়ে তদন্ত এবং নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ জোরদার হয়। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারের লক্ষ্য ছিল ব্যাংকগুলোর ওপর আগের প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণ কমানো, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ঋণ বিতরণে অনিয়মের তদন্ত এবং ব্যাংকের অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা করা।

এই ব্যাংকিং সংকটের ধাক্কা গিয়ে পড়ে এস আলম গ্রুপের শিল্পকারখানায়। গ্রুপটির অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি এসব কাঁচামালের একটি অংশ সমজাতীয় স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ করে তাদের উৎপাদনে সাহায্য করা হতো। ফলে উৎপাদন সচল রাখার জন্য নিয়মিত আমদানি, এলসি খোলা এবং প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা, চলমান এলসিগুলো জোরপূর্বক বাতিল করা, ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত হওয়া এবং নতুন এলসি খোলার সুযোগ না পাওয়া, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি করা। এর ফলে একপর্যায়ে কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং কারখানার বিদ্যমান মজুদ ও শেষ হয়ে আসে। উৎপাদন অব্যাহত রাখার মতো কাঁচামাল না থাকায় ধীরে ধীরে গ্রুপের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় এস আলম গ্রুপের চিনি, ইস্পাত, সিমেন্ট, ভোজ্যতেল, ব্যাগসহ বিভিন্ন খাতের ২০টিরও অধিক কারখানায় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া সমজাতীয় স্থানীয় উৎপাদনকারীদের উৎপাদন সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এসব কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরাসরি নিয়োজিত প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মসংস্থান হারানোসহ সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর সঙ্গে যুক্ত সরবরাহকারী, পরিবহন ও অন্যান্য সহায়ক কার্যক্রম ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং ও আর্থিক সংকটের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর সংগে যুক্ত বৃহত্তর শিল্প ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

এস আলম গ্রুপের কর্তৃপক্ষ জানান, গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব হঠাৎ করে ফ্রিজ করা, ব্যাংক লেনদেনের ওপর বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক সব ঋণপত্র বাতিল করা, নতুন ঋণপত্র খোলার আবেদন গ্রহণ না করা এবং ঋণপত্র খোলার সুযোগ প্রদান না করায় প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। ফলে উৎপাদন চালু রাখার প্রয়োজনীয় মূলধন ও কাঁচামাল সরবরাহ দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। পাশাপাশি ব্যাংক হিসাবগুলো ফ্রিজ করার মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ পরিশোধে বাধা দেওয়া হয় এবং গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়, যার মাধ্যমে ১৯৮৪ সালের ব্যবসা শুরু থেকে যে গ্রুপের ঋণ কখনও শ্রেণিকরণ হয়নি, সেই গ্রুপকে ঋণ খেলাপি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কয়েক মাস কর্মীদের বেতন ও উৎসব বোনাস দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। তাদের দাবি, ব্যাংকিং সুবিধা পুনর্বহাল করা হলে কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা সম্ভব। তবে সরকার বলছে, এস আলম গ্রুপের কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো নির্দেশ দেয়নি এবং গ্রুপটির ঋণ খেলাপি পরিস্থিতি ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

এখানেই দুই শিল্পগোষ্ঠীর পরিস্থিতির পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিটি গ্রুপের ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবসা চালু রেখে ব্যাংকের টাকা উদ্ধার করা যায়। এস আলমের ক্ষেত্রে তদন্ত ও ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়ার মধ্যেও কীভাবে কারখানাগুলো সচল রাখা যেত দুই ক্ষেত্রেই ব্যাংকের টাকা উদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে ব্যবসা চালু রাখাকে সমাধানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্য ক্ষেত্রে ব্যাংকিং সুবিধা সংকুচিত হওয়ার পর উৎপাদনই থেমে গেছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখানে একটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। এস আলম গ্রুপের মালিকানা, ঋণ বিতরণে অনিয়ম বা অর্থপাচারের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর তদন্ত অবশ্যই হতে হবে। ব্যাংকের অর্থের অপব্যবহার হয়ে থাকলে তা উদ্ধার করাও জরুরি। তবে এসব অভিযোগের তদন্ত বা সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়ার সঙ্গে উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের এক বা একাধিক শেয়ার হোল্ডারের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং কারখানার উৎপাদন দুটি বিষয় কি একই সঙ্গে পরিচালনা করা যেত না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একজন শেয়ারহোল্ডার তদন্তের মুখে পড়লে একটি চিনি শোধনাগারের উৎপাদনক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায় না। কোনো মামলা চললে একটি কোল্ড রোলিং মিলের মেশিনও অচল হয়ে যায় না।

কারখানার প্রকৃত মূল্য শুধু জমি, ভবন ও মেশিনে নয়। এর সঙ্গে রয়েছে দক্ষ শ্রমিক, ব্যবস্থাপনা, সরবরাহকারী, ক্রেতা, বাজার এবং বছরের পর বছর গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক সম্পর্ক। দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হয়, দক্ষ শ্রমিক অন্যত্র চলে যেতে পারেন, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে যায় এবং বাজারে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান দুর্বল হয়। ফলে আজ যে শিল্পসম্পদকে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কয়েক বছর অচল থাকার পর তার প্রকৃত মূল্য অনেক কমে যেতে পারে।

 একটি অচল কারখানা কারও জন্যই সুফল বয়ে আনে না। মালিকের জন্য নয়, শ্রমিকের জন্য নয়, ব্যাংকের জন্যও নয় এবং দেশের অর্থনীতির জন্য এটি একটি অশনি সংকেত। বিশেষ করে ব্যাংকিং সুবিধা কাঁচামাল আমদানি ও মূলধনের সুযোগ সীমিত করে কোনো উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান অচল করে দিলে সেই প্রতিষ্ঠানের আয় সৃষ্টি ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। কারখানা বন্ধ থাকলে আয় বন্ধ হয়। আয় বন্ধ হলে ঋণ পরিশোধের অর্থও আসে না। বরং উৎপাদন চালু থাকলে পণ্য বিক্রি হবে, নগদ অর্থ তৈরি হবে এবং সেই অর্থ থেকে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের সুযোগ থাকবে। তাই কোনো শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্ত থাকলেও উৎপাদনশীল ইউনিটগুলোকে আলাদা ব্যবস্থাপনায় সচল রাখার সুযোগ ছিল কি না, সেটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এখানে সিটি গ্রুপের ঘটনাটি একটি উদাহরণ তৈরি করেছে এবং এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। সেখানে ব্যাংকগুলো বলছে, একসঙ্গে কাজ করলে প্রতিষ্ঠানটিকে সচল রেখে পাওনা আদায়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। নগদ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, বোর্ডে ব্যাংকের প্রতিনিধি রাখা, স্বাধীন মনিটরিং কমিটি এবং বাইরের পুনর্গঠন বিশেষজ্ঞ যুক্ত করার প্রস্তাবও সেই উদ্দেশ্যের অংশ। প্রশ্ন হচ্ছে, একই ধরনের নিয়ন্ত্রিত কাঠামো কি অন্য সংকটাপন্ন শিল্পকারখানার ক্ষেত্রেও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে না? বিশেষ করে যেখানে কারখানা সচল রাখার মাধ্যমে কর্মসংস্থান উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যাংকের পাওনা আদায় একসাথে রক্ষা করা সম্ভব।

একদিকে সরকার দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলা এবং উৎপাদনমুখী শিল্পের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে চলতি বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিপত্রের মাধ্যনে এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের অনুকূলে শতভাগ নগদ মার্জিনের বিপরীতে আমদানি এলসি খোলার জন্য রূপালী ব্যাংককে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১২১ ধারা অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এই সুবিধাটি মঞ্জুর করা হয়েছে, যা ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

 বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ প্রকল্পটি চালু রয়েছে এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কাঁচামালের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন স্থগিত করতে পারে। দেশের প্রয়োজনে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ঋণশ্রেণিকৃত থাকা এসএস পাওয়ার-১কে এলসি খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন অব্যাহত রাখার স্বার্থে এর আগেও বেশ কয়েকটি সংস্থাকে অনুরূপ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

এই এসএস পাওয়ার ১ লিমিটেডের অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যও আমাদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন দেশের ইতিহাসে একক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক ঋণ ও অর্থায়ন অর্জনের সক্ষমতা দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শুরুতে এত বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণকে দেশের জন্য একটি বড় আর্থিক চাপ হিসেবে দেখার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীদের কাছ থেকে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও বৃহৎ অর্থায়ন অর্জন একটি দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আস্থা, আর্থিক সক্ষমতা এবং বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের সামর্থ্যরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। একই সঙ্গে এই অর্জন দেশের অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের জন্যও একটি উৎসাহব্যাঞ্জক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তাই এই অর্জন ও আন্তর্জাতিক আস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডকে সচল রাখাও দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ বৃহৎ প্রকল্পের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মামুন রশিদের মতে, সিটি গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও শিল্পনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরেছে। সিটি গ্রুপ ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণের চাপে থাকলেও ৩৬টি ব্যাংক একসঙ্গে বসে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সচল রেখে ঋণ পুনর্গঠনের পথ খুঁজছে। এর পেছনে বড় ব্যবসায়িক ভিত্তি, প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক আয় এবং প্রায় ২৫ হাজার কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অন্যদিকে এস আলম গ্রুপের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের পর ব্যাংকিং সুবিধা, ঋণ ও সম্পদ নিয়ে তদন্ত এবং নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ জোরদার হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ ও লেনদেনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, এলসি খোলায় বাধা এবং কার্যকরী ব্যাংকিং সুবিধা সংকোচিত হওয়ায় আমদানি ও দৈনিক ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যাহত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও আমদানি সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে এবং কাঁচামাল সংকটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে একপর্যায়ে ২০টির অধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে।

 মামুন রশিদের মতে, মূল প্রশ্ন মালিক কে, সেটি নয়; মূল প্রশ্ন হলো ঋণ আদায় ও শিল্পসম্পদ রক্ষায় নীতি কেন এত ভিন্ন। সিটি গ্রুপকে সচল রেখে ব্যাংকের পাওনা উদ্ধারের উদ্যোগ যদি অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত হয়, তাহলে এস আলম গ্রুপের কারখানাগুলো সচল রেখে ঋণ আদায়ের বিকল্প কাঠামো কেন তৈরি হলো না এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সংকটাপন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত ও সবার ক্ষেত্রে সমান পুনর্গঠন নীতি থাকা জরুরি।

 ব্যাংকের টাকা উদ্ধার করা যেমন জরুরি, তেমনি শিল্পসম্পদ রক্ষা করাও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত চলবে, সম্পদ উদ্ধারের ব্যবস্থা হবে এবং প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে উৎপাদনশীল কারখানা সচল রাখার ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। একটি কারখানা সচল রাখলে কত আয় হতে পারে, কত মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষা হবে, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা কতটা, সম্পদের বর্তমান মূল্য কত এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না এসব প্রশ্নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত