লিটল ম্যাগ চত্বর সুনসান

অমর একুশে বইমেলা-২০২৬-এর সপ্তম দিনে মেলার সার্বিক পরিবেশে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য ও বাড়তি জনসমাগম। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশ জুড়ে বইপ্রেমীদের উপস্থিতি ছিল বিগত দিনের চেয়ে বেশি। স্টলগুলোতে নতুন বই উল্টেপাল্টে দেখছেন পাঠকরা, কিনছেন পছন্দের বই। তবে এর বিপরীতে একেবারেই ভিন্ন চিত্র লিটল ম্যাগ চত্বরে যেখানে একসময় তরুণ লেখক-পাঠকের সরব পদচারণায় মুখর থাকত পরিবেশ। সেখানে এখন বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা।

মেলার শুরুতে দর্শনার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়ছে। বিক্রিও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকটি প্রকাশনীর প্রকাশক-বিক্রেতারা। কিন্তু লিটল ম্যাগ চত্বরে এর প্রভাব পড়েনি। সপ্তম দিন পেরিয়ে গেলেও বেশিরভাগ স্টলে দেখা যায় ক্রেতাশূন্যতা, কিছু স্টল বন্ধও দেখা যায়।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যার পর লিটল ম্যাগ চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, অনেক স্টলই বন্ধ। কয়েকজন সম্পাদক জানান, প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে তারা নিয়মিত স্টল খোলা রাখছেন না। কেউ কেউ বলছেন, রমজানসহ বিভিন্ন কারণে পাঠকের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। তাছাড়া চত্বরে খানাখন্দ ও অপ্রতুল আলোর কারণে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে না পারায় ওইমুখো হচ্ছেন না বইপ্রেমীরা।

লিটল ম্যাগ অনুরাগীদের অভিযোগ, আয়োজকদের পরিকল্পনায় এই চত্বর যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। বাণিজ্যিক প্রকাশনীগুলোর তুলনায় লিটল ম্যাগের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা কম। লেখক-পাঠকের আড্ডা কিংবা আলোচনা আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট ও আকর্ষণীয় কোনো ব্যবস্থা না থাকায় স্বতঃস্ফূর্ত মিলনমেলা গড়ে উঠছে না।

‘আড্ডাপত্র’ স্টলের লেখক শাহীন ইসলাম বলেন, দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে বইমেলায় আসছি। লিটল ম্যাগ চত্বর সবসময় ছিল লেখক-পাঠকদের ভাবনার আদান-প্রদানের জায়গা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই সেই প্রাণবন্ত আবহ খুঁজে পাচ্ছি না। পাঠকের উপস্থিতি কম, আলোচনাও সীমিত।

লেখক মিজানুর রহমান বলেন, মননশীল সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে লিটল ম্যাগের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু পাঠকসংখ্যা কমে গেলে নতুন লেখকরাও উৎসাহ হারান। ফলে একটি সৃজনশীল ধারার বিকাশ ব্যাহত হয়।

কয়েকজন সম্পাদক মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি ও অনলাইন প্রকাশনার বিস্তারের ফলে মুদ্রিত লিটল ম্যাগের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কিছুটা কমেছে। দ্রুত প্রকাশ ও সহজ প্রচারের সুবিধা অনেককে ছাপা সংস্করণ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলে লিটল ম্যাগ চত্বর আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে। নিয়মিত আলোচনা, পাঠচক্র, কবিতা পাঠ কিংবা তরুণ লেখকদের নিয়ে মুক্ত সংলাপ আয়োজন করা গেলে আগ্রহ বাড়বে।

একসময় যে চত্বর ছিল বিকল্প সাহিত্যচর্চার প্রাণকেন্দ্র, সেখানে এখনকার এই নিস্তব্ধতা অনেককেই ভাবিয়ে তুলছে। লিটল ম্যাগের স্বাতন্ত্র্য ও সৃজনশীল শক্তিকে ধরে রাখতে আয়োজকদের সক্রিয় পদক্ষেপই পারে চত্বরে ফিরিয়ে আনতে সেই হারানো প্রাণচাঞ্চল্য।

৭ম দিনে নতুন বই এসেছে ৮১টি : গতকাল বুধবার অমর একুশে বইমেলার সপ্তম দিনে সময়সূচি ছিল দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ৮১টি। এ নিয়ে সর্বমোট প্রকাশিত বই সংখ্যা ২৮২।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : সন্জীদা খাতুন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেন মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন ভীষ্মদেব চৌধুরী।

মফিদুল হক বলেন, সন্জীদা খাতুন জীবন জুড়ে নির্মাণ করেছিলেন এক ভিন্নতর সত্তা। সবচেয়ে বড় কথা, তার জীবনসাধনায় আত্মবিকাশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল সমষ্টি বিকাশের ভাবনা। তার ব্যক্তিত্বের বহুমাত্রিকতা নির্মিত হয়েছে কর্মের বিস্তার এবং জীবনভর বহুমুখী সাধনার দ্বারা। ফলে সন্জীদা খাতুনের পরিচিতি ও অবদান কোনো একক অভিধায় চিহ্নিত করা মুশকিল। সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে বিচরণ করেছেন, মানুষের ও সমাজের অন্তরে যে ছাপ রেখে গেছেন, তা একটি সামগ্রিক বিবেচনা দাবি করে।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি খোকন মাহমুদ ও মনিরুজ্জামান মিন্টু। আবৃত্তি পরিবেশন করেন সুনৃত সুজন, রূপশ্রী চক্রবর্তী এবং শারমিন সুলতানা জুঁই। সংগীত পরিবেশন করেন সুমন মজুমদার, বর্ণালী সরকার, সুকন্যা মজুমদার, মুন্নী কাদের, গার্গী ঘোষ, নাদিয়া আরেফিন শাওন।

আজকের সময়সূচি : আজ বৃহস্পতিবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : সুকান্ত ভট্টাচার্য শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সুমন সাজ্জাদ। আলোচনায় অংশ নেবেন আহমেদ মাওলা। সভাপতিত্ব করবেন আবদুল হাই শিকদার। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।