বাতিল হবে টিসিবি স্মার্টকার্ড পণ্য মিলবে ফ্যামিলি কার্ডে

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) স্মার্ট কার্ডধারী পরিবারগুলো ভর্তুকি মূল্যে প্রতি মাসে তেল, চিনি, ডালসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার সুবিধা ভোগ করেন। তবে এই অর্থবছরের মধ্যেই সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী এই স্মার্ট কার্ডগুলো বাতিল হয়ে যাবে। তবে সুবিধা থেকে যাবে। এই সুবিধা পাওয়া যাবে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে। অর্থাৎ টিসিবির কার্ডের যে সুবিধা পাওয়া যেত, সেটা এখন ফ্যামিলি কার্ড ছাড়া মিলবে না। তবে এই কার্ড পেতে হলে বর্তমান কার্ডধারী পরিবারগুলোকে নির্ধারিত মানদন্ড পূরণ করতে হবে। যা পূরণ করতে না পারলে বাতিল হয়ে যাবে টিসিবির পণ্য কেনার সুবিধা।

ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬ (খসড়া) থেকে জানা যায়, চলতি বছরের জুনের মধ্যে টিসিবির সব কার্ড বিলুপ্ত করা হবে। টিসিবির এই সুবিধাটা যোগ হবে ফ্যামিলি কার্ডের মধ্যে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমেই পরে সরকারি নগদ সহায়তা যেমন মিলবে, তেমনি টিসিবির পণ্যের সুবিধাও পাওয়া যাবে এই কার্ডে। তবে এর জন্য দুই ধাপের পরিবারই শুধু এই কার্ডের যোগ্য হবেন, যারা অতিদরিদ্র এবং দরিদ্র।

জানা গেছে, বর্তমানে যারা টিসিবির স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করছেন তাদেরকে পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তাদের পরিবারের সব ধরনের তথ্য পরীক্ষা করা হবে। নির্দিষ্ট মানদন্ড অনুযায়ী লাইভ ভেরিফিকেশন শেষে নিবন্ধিত হলেই একেকটি পরিবার খাদ্য সহায়তা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

বিদ্যমান টিসিবি স্মার্ট কার্ড কার্যক্রমকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করা হবে। এর ফলে নাগরিকের একাধিক কার্ড বহনের প্রয়োজন হবে না। যাতে করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে সরকার। এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট কিছু ধাপ অতিক্রমের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে।

এর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা টিসিবির বিদ্যমান উপকারভোগীর ডেটাবেজ সমাজসেবা অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর) এ সরাসরি স্থানান্তরিত হবে। প্রতিটি টিসিবি কার্ডধারী পরিবারের এনআইডি নম্বর যাচাই করে একটি ইউনিক ফ্যামিলি আইডি তৈরি করা হবে, যা ভবিষ্যতে ফ্যামিলি কার্ড নম্বর হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে কার্যকরী স্মার্ট কার্ডের সংখ্যা ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ৭৯৪টি। যারা প্রতি মাসে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য কিনছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চালু হওয়া এই টিসিবি কার্ডের মাধ্যমে অনেক ধনী ব্যক্তি, সরকারি চাকরিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীরা ছিলেন এই কার্ডের প্রধান সুবিধাভোগী। কিন্তু তারা এক কোটি পরিবারকে এর মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার দাবি করলেও সংখ্যাটাকে এক কোটিতে নিয়ে যেতে পারেনি।

অন্তর্বর্তী সরকার এসে লাখ লাখ কার্ড বাতিল করে এবং যাচাইবাছাইয়ের মাধ্যমে নতুন কার্ড ইস্যু করে। কিন্তু তারা সংখ্যাটিকে ৬৬ লাখ ২৯ হাজারের বেশি নিতে পারেনি। তবে বর্তমান সরকারও টিসিবির এই সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা ১ কোটিতে নেওয়ার কথা বলেছে।

নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়েছে, বিবেচিত পরিবারগুলো ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করেই টিসিবির পণ্য কিনবে। যেসব ডিলার বর্তমানে টিসিবির পণ্য বিক্রি করছেন, তারাই এই সেবা দিয়ে যাবেন। তবে এর জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থা যোগ করা হবে। যেতে হবে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করবে। যার মধ্য দিয়ে সরকার নগদ সহায়তা দেবে দরিদ্র পরিবারগুলোকে। সরকার গঠনের পর দলটি এখন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। তবে এই কার্ডের মাধ্যমে শুধু নগদ সহায়তাই নয়, টিসিবি ও খাদ্য অধিদপ্তরের মতো খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি রয়েছে সবগুলোই এই কার্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। দেশের সবগুলো পরিবারই এই কার্ড পাবে যেখানে পরিবারগুলোর ‘স্ট্যাটাস’ অনুযায়ী বিভিন্ন ক্যাটাগরির সুবিধা পাবে। এ কারণে এই ফ্যামিলি কার্ডকে একটা পর্যায়ে সার্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ডে রূপান্তর করবে এ সরকার। বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে ৯৫টির বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। যেগুলোকে এই একটি কার্ডের আওতায় আনা হবে। এর ফলে প্রশাসনিক অপচয় কমবে বলে মনে করছে সরকার। পাশাপাশি কোন পরিবার কী ধরনের সহায়তা পাওয়ার উপযোগী তা নির্ধারণ হবে এই কার্ডের মাধ্যমে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের দ্বিতীয় বছর বা ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে টিসিবির সব সুবিধা এবং অন্যান্য খাদ্যসহায়তা (ভিজিএফ, ওএমএস) ফ্যামিলি কার্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

যেসব পরিবার টিসিবির পণ্য কেনার উপযোগী হবেন : সরকার বলছে, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি)’ স্কোরিং পদ্ধতিকে মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও মানদন্ড মাপা হবে নির্ধারিত স্কোরের মাধ্যমে।

এই স্কোর বোর্ডকে ৫টি ধাপে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শূন্য থেকে ৭৭৭ পর্যন্ত স্কোরধারী পরিবার অতিদরিদ্র বলে গণ্য হবে। দ্বিতীয় ধাপে ৭৭৮ থেকে ৭৯৬ স্কোরধারী যার দরিদ্র বলে বিবেচিত হবে। এ ছাড়া ৭৯৭ থেকে ৮১৪ স্কোরধারী ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, ৮১৫ থেকে ৮৩৭ স্কোরধারী নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং ৮৩৮ থেকে ১ হাজার স্কোরধারী পরিবার সচ্ছল বা উচ্চবিত্ত বলে গণ্য হবে।

ফ্যামিলি কার্ডের প্রথম পর্যায়ে শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের স্কোরধারী পরিবারগুলো যুক্ত হবে। ডিএসআর পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতি বছরই এই স্কোরিং হালনাগাদ করা হবে।

এই স্কোর তৈরির জন্য নাগরিকত্ব ও পরিচয়, সম্পদ ও ভূমির মালিকানা, বাসস্থানের ধরন, আয়ের উৎস এবং কাজের ধরন, প্রতিবন্ধী সদস্যসংবলিত পরিবার, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, হিজড়া, দুর্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবাগুলোকে আমলে নেওয়া হবে।

বিদ্যমান টিসিবি স্মার্ট কার্ডধারীরা এই নীতিমালার আওতায় আবার পর্যবেক্ষণের সম্মুখীন হবেন। যদি তাদের পিএমটি স্কোর ৭৯৬ এর নিচে থাকে অর্থাৎ প্রথম দুটি ধাপের মধ্যে থাকে তবেই তারা ফ্যামিলি কার্ড পাবেন এবং সেই কার্ড দিয়ে টিসিবির পণ্য কেনার সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। ৭৯৬ এর উপরে স্কোর হলে তাদের টিসিবি কার্ড বাতিল বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ টিসিবির সুবিধাটা শুধুমাত্র অতিদরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারগুলোই ভোগ করতে পারবে।

আবেদনকারী তথ্য প্রদান করার সঙ্গে সঙ্গে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে থাকা পিএমটি স্কোরিং ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য থেকে ১০০০ এর মধ্যে একটি স্কোর প্রদান করবে।

এ জন্য টিসিবি কার্ডধারীদের ফ্যামিলি কার্ড ছাড়া অন্য কোনো কার্ড থাকবে না। যাচাই বাছাইয়ে যারা আগে টিসিবি কার্ড পেয়েছিলেন কিন্তু বর্তমানে দারিদ্রসীমার ওপরে উঠে গেছে (স্কোর ৭৯৬+) তাদের বিদ্যমান টিসিবি সুবিধা বাতিল করা হবে এবং তারা নতুন ফ্যামিলি কার্ডের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবে।

এ ছাড়া টিসিবি পণ্য ক্রয়ের সময় সুবিধাভোগীকে কোনো নগদ টাকা বহন করতে হবে না। তারা ফ্যামিলি কার্ডের ডিজিটাল ওয়ালেট বা কিউআর কোড ব্যবহার করে পেমেন্ট করতে পারবেন। টিসিবি পণ্য বিতরণের সময় ডিলার পয়েন্টে আবেদনকারীর এনআইডি বা কার্ড স্ক্যান করে ওটিপি ভেরিফিকেশন করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের পুরাতন সব কার্ড অকার্যকর হয়ে যাবে।

যদি কোনো পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের নগদ ভাতা না পায় কিন্তু শুধু টিসিবি সুবিধার জন্য যোগ্য হয়, তবে সিস্টেম তাদের জন্য শুধু ‘ফুড উইন্ডো’ সচল রাখবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবি কর্তৃপক্ষ সমাজসেবা অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় সব কারিগরি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য প্রদান করতে বাধ্য থাকবে।