স্বাস্থ্যসেবার দশা

কে না জানে, স্বাস্থ্যসেবা দুর্গতি আর দুর্বিপাকের মধ্যে পড়ে আছে? ভুক্তভোগী সেবাপ্রার্থীরা যেমন জানেন, তেমনি ওই সেবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িতরাও জানেন। চিকিৎসার নামে সরকারি হাসপাতালগুলো একশ্রেণির কর্মচারীর হাতে বন্দি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে,  রোগীদের ওষুধ কিনে দিতে হয়। হাসপাতালে ‘নাপা’ জাতীয় ট্যাবলেট ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না। অধিকাংশ হাসপাতালে সেবাপ্রার্থী ও বহিরাগতদের ভিড়ে ত্যক্ত পরিবেশ। সেই পরিবেশ-পরিস্থিতি বোঝা ও জানার জন্যই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুল না জানিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। দেখেছেন অব্যবস্থা, অসংগতি; প্রকাশ করেছেন অসন্তোষ, নির্দেশ দিয়েছেন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। গত মঙ্গলবার তিনি গিয়েছিলেন মহাখালীর সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালে ও বুধবার গেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ নানা মন্তব্য লিখছেন। সেগুলো যে মন্ত্রীর নজরে আসে, তা বলাবাহুল্য। আবার সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও নানা সমস্যা-সংকটের নিউজ আসে। এগুলো তো মহানগর, জেলা শহর স্তরের হাসপাতালের দুর্দশা। তার নিচের স্তরে, উপজেলা ও প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সেবাদশা কেমন হতে পারে, তা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা উপজেলায় বাস করেন না। জরুরি মুহূর্তে তাদের পাওয়া যায় না।

এ রকম সেবাবিহীন আরেক খাত হচ্ছে ভূমি। ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না ভূমি অফিসে। সিদ্ধিরগঞ্জের ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সময়মতো অফিসাররা আসেন না। প্রতিমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হলেও, তারা আসেন ১০টার পর। এ চিত্র গোটা দেশের ভূমি অফিসের। স্বাস্থ্য ও ভূমি দুটোই সরাসরি জনগণের প্রতিদিনের সেবা ও কাজের জায়গা। গরিব ও নিরক্ষর কৃষকদের তারা কেবল হয়রানিই করেন না, সেখানে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। এই যে সেবার অবস্থা, সরকারি অফিসের, সেটা জনআকাক্সক্ষার বিপরীত। জনগণ সেবা চায়, আর তারা চায় অর্থ। এই মানসিকতা শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে না পারলে সেবা দুরূহ থেকে যাবে। সরকার জনগণকে সবরকম সেবাই পৌঁছে দিতে চায়, সেটা বোঝা যাচ্ছে। মন্ত্রী হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে না জানিয়ে সেবা দেওয়ার নমুনা দেখতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন, তা কি তিনি আগে থেকে ধারণা করতে পারেননি? পেরেছেন বলেই হাসপাতালের পরিচালকদের ফুলের তোড়া চাননি। তারা কতটা কর্মপরায়ণ ও কর্মদক্ষ, তা যাচাই করতেই তিনি দুটি হাসপাতালে গেছেন। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোও পরিদর্শন করা উচিত। সেবার নামে উচ্চমূল্য নেওয়ার হৃদয়হীন ব্যবসায় জড়িত বেসরকারি হাসপাতালগুলো। সেখানে সেবার নামে যেভাবে গলাকাটা সেবামূল্য নেওয়া হচ্ছে, তার লাগাম টেনে ধরতে না পারলে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সেবা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে।

মনে রাখতে হবে, সেবা খাত মানসিকভাবে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকায় জনদুর্ভোগ বাড়ছে। এই সুযোগে পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ক্লিনিক ব্যবসা। এদের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই লাইসেন্স বা কারিগরি ও প্রাযুক্তিক উপকরণ। নেই দক্ষ টেকনিশিয়ান ও সুশিক্ষিত চিকিৎসক। অধিকাংশ হাসপাতালের সহায় হচ্ছে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, যারা অফিস টাইমের পর রাতের বেলায় সেবার নামে অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত থাকেন। জ্ঞান-গরিমায় প্রাগ্রসর হওয়ার জন্য প্রতিদিনের যে আপডেট পড়াশোনা প্রয়োজন, তা তারা করেন না। এতেও যে সেবাপ্রার্থীকে বঞ্চিত করছেন, তাও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। এই উপলব্ধি হতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে। শুধু নিঃশব্দে হাসপাতাল পরিস্থিতি যাচাই করলে চলবে না, নিয়মিত মনিটরিং করাও তার ও কর্মকর্তাদের কাজ। ছয় মাসের মধ্যে যদি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসের সেবা উন্নত করা না যায়, তাহলে সরকারের সেবাদানের আকাক্সক্ষা ও ইচ্ছা নস্যাৎ হবে।