বিশ্বের অনেক দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জন্মহার দ্রুত কমে যাচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে এ সমস্যার মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে মানুষকে সন্তান নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে দেশটিতে জন্মহার কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় অভিনব একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রাজ্য সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী কোনো দম্পতির দুই বা তার বেশি সন্তান হলে তাদের ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ প্রকল্প চালুর ইঙ্গিত দিয়েছেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু। রাজ্যের বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, জন্মহার বাড়ানো জন্য এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং চলতি মাসের শেষ দিকেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হতে পারে।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনা তৈরি করেছে। রাজ্যের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশে মোট উর্বরতার হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজ্যের বর্তমান টিএফআর প্রায় ১ দশমিক ৫। এই হারকে জনসংখ্যার প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে বলে মনে করা হয়। সাধারণভাবে জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখতে এ হার ২ দশমিক ১ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা।
বিধানসভায় দেওয়া ভাষণে চন্দ্রবাবু নাইডু বলেন, জন্মহার কমে যাওয়া শুধু অন্ধ্রপ্রদেশের সমস্যা নয়। বিশ্বের অনেক দেশও এই একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। জনসংখ্যার গড় বয়স বাড়তে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে উন্নয়ন ও উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতির মোকাবেলায় রাজ্য সরকার একটি নতুন প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা করছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো দম্পতি যদি দুই বা তার বেশি সন্তানের জন্ম দেন তবে সরকার তাদের ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেবে। সন্তান জন্মের সময়ই এ অর্থ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, এ উদ্যোগ পরিবারগুলোকে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করবে।
চন্দ্রবাবু নাইডু বলেন, সরকার একটি অভিনব পদ্ধতির কথা ভেবেছে এবং এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা জন্মহার বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা যদি এ প্রকল্প সফলভাবে চালু করতে পারি তবে তা ভবিষ্যতে রাজ্যের জনসংখ্যা ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের শেষের দিকে এ প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। এরপর আগামী এপ্রিল মাস থেকেই তা কার্যকর করা হতে পারে। তবে প্রকল্পের বিস্তারিত কাঠামো এখনও প্রকাশ করা হয়নি। কারা এই সুবিধা পাবেন এবং কীভাবে অর্থ দেওয়া হবে তা নিয়ে সরকার বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করছে।
শহরাঞ্চলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের চাপ এবং পরিবার পরিকল্পনার পরিবর্তিত ধারা এ প্রবণতার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। অনেক পরিবার এখন কম সন্তান নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের নতুন পরিকল্পনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে জন্মহার কতটা বাড়বে তা সময়ই বলে দেবে বলে মনে করছেন জনসংখ্যা বিশ্লেষকরা। অন্ধ্রপ্রদেশে বর্তমানে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে দ্রুত উন্নয়ন হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য আগামী কয়েক দশকে রাজ্যের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা। সেই লক্ষ্যে ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত কর্মক্ষম জনসংখ্যা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রশাসন।
চন্দ্রবাবু নাইডু বিধানসভায় বলেন, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয় বরং সুষম জনসংখ্যা কাঠামো তৈরি করাও জরুরি। সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে রাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজের ভারসাম্য বজায় থাকে। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের এ প্রস্তাব ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে সময়োপযোগী উদ্যোগ বলে মনে করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন জন্মহার বৃদ্ধির জন্য শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আপাতত রাজ্য সরকার এ নতুন প্রকল্প নিয়ে এগোতে প্রস্তুত। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হলে অন্ধ্রপ্রদেশ ভারতের প্রথম রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি হবে যেখানে জন্মহার বাড়াতে সরাসরি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।