‘ইউটিউব ইউনিভার্সিটি’র রাজনৈতিক অর্থনীতি

ভারতের হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি ছিল মাইক্রো-নেটওয়ার্কড প্রোপাগান্ডা পরিবার, কমিউনিটি বা দলীয় গ্রুপে ছড়িয়ে পড়া বার্তা, যেখানে বিশ্বাসের সম্পর্ক আগে থেকেই তৈরি। কিন্তু বাংলাদেশের ‘ইউটিউব ইউনিভার্সিটি’ হলো পারফরমেটিভ প্রোপাগান্ডা। ক্যামেরার সামনে আবেগময় উপস্থাপনা, নাটকীয় থাম্বনেইল ও লাইভ চ্যাটে তাৎক্ষণিক সমর্থন। এখানে দর্শক শুধু গ্রাহক নয়, অংশগ্রহণকারী। কমেন্ট, শেয়ার, সুপারচ্যাট সব মিলিয়ে তৈরি হয় নতুন ডিজিটাল জনসমাজ টিভি প্রোগ্রাম দেখছি, কিন্তু টিভি দেখছি না। বাসায় টেলিভিশন চলছে, কিন্তু পর্দায় সংবাদ বুলেটিন নয়, ইউটিউব লাইভ। স্ক্রিনে বড় বড় অক্ষরে লেখা: ‘বড় খবর!’, ‘গোপন তথ্য ফাঁস!’, ‘দেশ কাঁপানো বিশ্লেষণ!’। থাম্বনেইলের লাল বৃত্তে চিহ্নিত একটি মুখ, পাশে বিস্ময়ের চিহ্ন। কমেন্ট বক্সে ঝড়, আগুন ইমোজি, করতালি, ক্রোধ, সমর্থন। আজকের বাংলাদেশে রাজনীতির বহু সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয় না প্রেস ব্রিফিংয়ে; বরং আলোচিত হয় এই লাল বৃত্তের ভেতর। বিতর্ক শুরু হয় না নীতিগত দলিলে; বরং শিরোনামের নাটকীয়তায়। জনমতের এক নতুন রাজধানী তৈরি হয়েছে ডিজিটাল, অ্যালগরিদমিক, আবেগচালিত। এই বাস্তবতা রাতারাতি তৈরি হয়নি। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি’ শব্দবন্ধ একসময় আলোচনায় এসেছিল। যাচাইহীন তথ্য, বিকৃত ইতিহাস, আবেগচালিত জাতীয়তাবাদ ফরোয়ার্ড মেসেজে সামাজিক সত্যে রূপ নেয়। বাংলাদেশে তার সমান্তরাল রূপ হলো ‘ইউটিউব ইউনিভার্সিটি’। তবে পার্থক্য আছে। এখানে তথ্য ছড়ায় গোপনে নয়, প্রকাশ্য মঞ্চে; নেটওয়ার্কের ভেতরে নয়, অ্যালগরিদমের তাড়নায়। ভারতের হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি ছিল মাইক্রো- নেটওয়ার্কড প্রোপাগান্ডা পরিবার, কমিউনিটি বা দলীয় গ্রুপে ছড়িয়ে পড়া বার্তা, যেখানে বিশ্বাসের সম্পর্ক আগে থেকেই তৈরি। কিন্তু বাংলাদেশের ‘ইউটিউব ইউনিভার্সিটি’ হলো পারফরমেটিভ প্রোপাগান্ডা। ক্যামেরার সামনে আবেগময় উপস্থাপনা, নাটকীয় থাম্বনেইল ও লাইভ চ্যাটে তাৎক্ষণিক সমর্থন। এখানে দর্শক শুধু গ্রাহক নয়, অংশগ্রহণকারী। কমেন্ট, শেয়ার, সুপারচ্যাট সব মিলিয়ে তৈরি হয় নতুন ডিজিটাল জনসমাজ।

যোগাযোগবিদ্যার ইতিহাসে আমরা ‘ম্যাজিক বুলেট থিওরি’র কথা পড়েছি। যেখানে গণমাধ্যমের বার্তা সরাসরি মানুষের মনকে প্রভাবিত করে বলে ধরা হতো। যদিও তত্ত্বটি পরে সীমিত বলে বিবেচিত হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তাৎক্ষণিকতা ও পুনরাবৃত্তিমূলক কনটেন্ট সেই সরাসরি প্রভাবের অনুভূতিকে আবারও জাগিয়ে তুলেছে। যখন একজন জনপ্রিয় ইউটিউবার প্রতিদিন একই ব্যাখ্যা দেন, একই রাজনৈতিক শত্রু নির্মাণ করেন, তখন সেই বয়ান ধীরে ধীরে দর্শকের বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে। আমরা দেখেছি, ভিন্ন দ্রাঘিমায় বসে কেবল ইউটিউব কনটেন্টের আহ্বানে ঢাকার ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে বুলডোজার ডাকার মতো আবেগ তৈরি হয়, দুটি পত্রিকা অফিসে আগুন জ্বলে ওঠে। এখানে ‘Two-Step Flow Theory’ নতুন অর্থে প্রাসঙ্গিক। এই তত্ত্ব বলেছিল, গণমাধ্যমের বার্তা সরাসরি জনতার কাছে না গিয়ে প্রথমে ‘অপিনিয়ন লিডার’-এর কাছে যায়, তারপর তাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এখন বহু ইউটিউবার সেই অপিনিয়ন লিডার। তারা শুধু খবর ব্যাখ্যা করেন না; খবরের ফ্রেম নির্ধারণ করেন। কোন ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি ষড়যন্ত্র; কে মজলুম, কে জালিম; কে দেশপ্রেমিক, কে দেশদ্রোহী এসব সংজ্ঞা প্রায়ই তাদের ভাষ্যে গঠিত হয়। রাজনৈতিক এজেন্ডা-সেটিং ধীরে ধীরে দলীয় পরিসর থেকে সরে এসে ডিজিটাল ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় স্থানান্তরিত হয়। করোনা-মহামারীর পরের সময়টা মনে করুন। অনিশ্চয়তা, ভয়, বিভ্রান্তি। এই সময়েই ‘Media Dependency Theory’ নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সংকটের সময়ে মানুষ তথ্যের জন্য গণমাধ্যমের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়। বাংলাদেশেও সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে মানুষ দ্রুত, সরাসরি ও বিকল্প ব্যাখ্যার খোঁজ করেছে। এই শূন্যতায় কিছু ইউটিউবার নিজেদের বিকল্প সাংবাদিক, বিকল্প বুদ্ধিজীবী, এমনকি বিকল্প রাজনৈতিক দিকনির্দেশক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন বিকল্প হয়ে ওঠে যাচাইহীনতার আশ্রয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবতায় ইউটিউব এখন শুধু একটি ভিডিও প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি একটি প্রভাবশালী তথ্য-উৎপাদন ও বিতরণ কাঠামো। সাংবাদিকতা ক্রমেই ফেসবুক-নির্ভর, রাজনীতি অনেকাংশে ইউটিউব-নির্ভর, জনমত সংগঠিত হয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে, অর্থনৈতিক লেনদেন চলে মোবাইল অ্যাপে। যোগাযোগ, মতামত, প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ সবকিছুই ডিজিটাল অবকাঠামোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। ফলে জন্ম নেয় এক নতুন যোগাযোগ-প্যারাডাইম: তথ্যের গতি দ্রুত, কিন্তু যাচাই তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

বাংলাদেশের কোটি কোটি তরুণ এখন ফেসবুক ও ইউটিউব-নির্ভর। তারা কনটেন্ট তৈরি করছে, শেয়ার করছে, মতামত দিচ্ছে, অনুসারী তৈরি করছে। জনসংস্কৃতির এক বিশাল ক্ষেত্র তাদের হাতে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই বিস্তৃত ডিজিটাল জনপরিসর কি যুক্তিনির্ভর গণতান্ত্রিক আলোচনার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে? নাকি তা ধীরে ধীরে আবেগ, বিভাজন ও প্রোপাগান্ডা-নির্ভর এক ধরনের ‘ডিজিটাল জনমবতন্ত্রে’ রূপ নিচ্ছে? করোনা-পরবর্তী অনিশ্চয়তার শূন্যতায় কিছু ইউটিউবার ও ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার নিজেদের ‘সত্যের একমাত্র ধারক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। প্রচলিত গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা বা অবিশ্বাসকে পুঁজি করে তারা দর্শকদের আস্থা অর্জন করেছেন। এই প্রভাবশালী ডিজিটাল ব্যক্তিত্বদের একটি অংশ ধীরে ধীরে তাদের দর্শকদের ‘ভক্ত-মুরিদ’-এ রূপান্তর করছেন। সমালোচনামূলক প্রশ্ন নিরুৎসাহিত করা, ভিন্নমতকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে চিত্রিত করা, অনুসারীদের আবেগকে সংগঠিত শক্তিতে রূপ দেওয়া এসব কৌশল এখন অচেনা নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশভিত্তিক অবস্থান থেকে উসকানিমূলক রাজনৈতিক বয়ানও তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছে, যেখানে বাস্তবতার জটিলতার চেয়ে আবেগের তীব্রতা বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে গড়ে উঠছে এক ধরনের ডিজিটাল পীরতন্ত্র। এখানে তথ্য যাচাইয়ের চেয়ে ব্যক্তিনির্ভর আনুগত্য বেশি মূল্যবান। যুক্তির চেয়ে পরিচয়; প্রমাণের চেয়ে আবেগ এ সবই গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড হয়ে ওঠে। তখন গণতান্ত্রিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়, জনপরিসর ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাবের দিকে সরে যায়। ডিজিটাল কালচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘অ্যালগরিদমিক পাবলিকস’। ইউটিউবের অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকে প্রমোট করে, যা বেশি ইন্টারঅ্যাকশন তৈরি করে। আর ইন্টারঅ্যাকশন সবচেয়ে দ্রুত জন্ম নেয় রাগ, ভয়, ক্ষোভ ও বিভাজন থেকে। তৈরি হয় ‘আফেক্টিভ কমিউনিকেশন’, যেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ দ্রুত ছড়ায়। এভাবে জনপরিসর ধীরে ধীরে ইকো-চেম্বারে পরিণত হয়। দর্শক একই ধরনের মতাদর্শিক কনটেন্ট দেখতে দেখতে বিশ্বাস করতে শুরু করেন, এটাই একমাত্র সত্য। এর প্রভাব মূলধারার রাজনীতিতেও স্পষ্ট। কিছু জনপ্রিয় ইউটিউবারের বক্তব্য রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রতিক্রিয়া বা অবস্থানকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে। বিদেশভিত্তিক ভিডিও বা লাইভ বিশ্লেষণ কখনো কখনো মাঠের রাজনীতির চেয়েও বেশি আলোচিত হয়। এতে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হয়, কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে তাৎক্ষণিক ও আবেগনির্ভর।  উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হলো, মূলধারার সংবাদমাধ্যমও এখন সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর ট্রেন্ড অনুসরণ করছে। যাচাই, সম্পাদনা ও নীতিগত মানদণ্ড অনেক সময় ভিউ ও ক্লিকের কাছে হচ্ছে পরাজিত। বিষয়টি কেবল প্রযুক্তিগত রূপান্তর নয়; এটি সাংবাদিকতার প্যারাডাইম শিফট যেখানে ভিজ্যুয়াল সেনসেশনালিজম যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের জায়গা দখল করছে। তবে একটি কথা স্পষ্ট,  ইউটিউব নিজে সমস্যা নয়। এটি এক মুক্ত মাধ্যম। এখানে বিকল্প কণ্ঠ আছে, প্রান্তিক মত আছে, নাগরিক সাংবাদিকতার সুযোগ আছে। প্রশ্ন হলো, এই মুক্ততা কি দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে? নাকি ঘৃণা, বিভাজন ও প্রোপাগান্ডার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে? মুক্ত মাধ্যম তখনই গণতান্ত্রিক শক্তি, যখন তা বহুমত, প্রমাণ ও যুক্তিকে ধারণ করে। আর যখন তা কেবল ভক্ত-অনুসারী  তৈরি করে, তখন তা গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে। এই প্রেক্ষাপটে যোগাযোগ তত্ত্বগুলো আবার আমাদের সামনে ফিরে আসে।

‘ম্যাজিক বুলেট’ আমাদের সতর্ক করে সরাসরি প্রভাবের ঝুঁকি সম্পর্কে; ঞড়ি-ঝঃবঢ় ঋষড়ি দেখায় অপিনিয়ন লিডারের শক্তি; গবফরধ উবঢ়বহফবহপু বোঝায় সংকটে মিডিয়ার বাড়তি প্রভাব; আর অ্যালগরিদমিক পাবলিকস ও আফেক্টিভ কমিউনিকেশন শেখায়, ডিজিটাল যুগে আবেগই সবচেয়ে বড় মুদ্রা। এসব কেবল একাডেমিক আলোচনার বিষয় নয়; বরং আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝার বিশ্লেষণাত্মক হাতিয়ার। অতএব, ইউটিউব যেন ঘৃণা চাষের ক্ষেত্র না হয়, তার জন্য প্রয়োজন তিনটি স্তম্ভ মিডিয়া লিটারেসি, প্রমাণনির্ভর কনটেন্ট এবং সমালোচনামূলক দর্শক। মুক্ত মাধ্যমের শক্তি তখনই টেকসই হবে, যখন তা দায়িত্বশীল স্বাধীনতায় রূপ নেবে। অন্যথায়, ইউটিউব ইউনিভার্সিটি জ্ঞান নয়, বিভাজনের কারখানায় পরিণত হবে; আর জনমত হয়ে পড়বে অ্যালগরিদমের বন্দি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

rajibnandy@cu.ac.bd