টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৫ এএম

বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলেই প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রপ্তানি কিংবা অবকাঠামোর কথা ওঠে আসে। কিন্তু এমন এক সম্পদ আছে, যার ওপর সব অর্জনের স্থায়িত্ব নির্ভর করে। কিন্তু নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সেটি প্রাপ্য গুরুত্ব পায় না। সেই সম্পদ হলে বিশুদ্ধ পানি। একসময় এটি ছিল পরিবেশ বা জনস্বাস্থ্যের বিষয়। আজ অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকটকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পানি, উন্নয়ন নির্ধারণকারী অর্থনৈতিক প্রশ্ন। বাস্তবতাই এমন সত্যকে বাস্তব করছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে। ফলে উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার, নিরাপদ পানিকে দুর্লভ করে তুলছে।  ঢাকায় অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, প্রাকৃতিক পুনঃপূরণের সক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন নদীগুলো দূষণে বিপর্যস্ত। সংকটের রূপ ভিন্ন হলেও বার্তা এক পানি এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম নিয়ামক। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এখনো বিশে^র শতকোটি মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বর্তমান অগ্রগতি, প্রয়োজনের তুলনায় ধীর। দেশে পানির প্রাপ্যতার চেয়ে বড় সমস্যা হলো এর গুণগত মান। আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও দূষণ নিরাপদ পানির অধিকারকে অনিশ্চিত করছে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে এখনো প্রায় তিন কোটি মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার করছেন। জলবায়ুর পরিবর্তন সংকটকে আরও তীব্র করছে। অর্থনীতির ভাষায়, এর অর্থ আরও গভীর। দূষিত পানির কারণে অসুস্থতা বাড়ে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়, শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হয় ও কৃষিতে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। এসব কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি আঘাত। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, গ্যারি বেকার তার ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশুদ্ধ পানি কোনো ভোগ্যপণ্য নয়, মানব পুঁজিতে তা সবচেয়ে মৌলিক বিনিয়োগ। বিষয়টি আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তার ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ গ্রন্থে উন্নয়নকে, মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিরাপদ পানি ছাড়া, সেই সক্ষমতা গড়ে ওঠে না। একটি শিশু যদি বারবার পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়, তার শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একজন শ্রমিক অসুস্থ হলে, উৎপাদনশীলতা কমে। একটি দরিদ্র পরিবার, নিরাপদ পানির অভাবে আরও বেশি স্বাস্থ্য ব্যয় বহন করে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। ফলে পানির সংকট কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়ায়।

পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব ‘সংবিধান’ রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করেছে। একইভাবে জাতিসংঘ নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনকে, মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পানি ব্যবস্থাপনা এখনো খণ্ডিত। কৃষি, নগর উন্নয়ন, শিল্প, পরিবেশ ও জলবায়ু অভিযোজন প্রতিটি খাত ভিন্ন পরিকল্পনায় পরিচালিত হয়। অথচ নদী, ভূগর্ভস্থ পানি, জলাভূমি ও বৃষ্টির পানি একই জলচক্রের অংশ। একটি অংশের ওপর অতিরিক্ত চাপ, পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। অর্থনীতিবিদ আর্থার পিগু, বহু আগে দেখিয়েছেন বাজার সবসময় সামাজিক ব্যয়ের হিসাব করে না। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলে, তখন দূষণের প্রকৃত মূল্য বহন করে সমাজ। ফলে স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ে, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও নিরাপদ পানি সরবরাহে ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এই অদৃশ্য ব্যয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে। নদী শুধু পানির উৎস নয় এটি কৃষি, মৎস্য, পরিবহন, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের ভিত্তি। সুতরাং নদী রক্ষা মানে অর্থনীতিকে রক্ষা। পানি ব্যবস্থাপনা একটি মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব হতে পারে না। রাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অসম্ভব। বাংলাদেশের সামনে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু ‘পানি নিরাপত্তা’ নিশ্চিত না হলে, এসব লক্ষ্য টেকসই হবে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ষষ্ঠ লক্ষ্য আলাদা কোনো উদ্দেশ্য নয়, এটি প্রায় সব উন্নয়ন লক্ষ্যের ভিত্তি। এখন প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন।

ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে নদী, জলাধার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে জোর দিতে হবে। শিল্পবর্জ্য শোধন বাধ্যতামূলক করে, দূষণকারীকে দূষণের ব্যয় বহনের নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত। নদীকে জমি বা নৌপথের উৎস হিসেবে নয়, তাকে জীবন্ত অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পানি পর্যবেক্ষণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানি প্রযুক্তি, আধুনিক সেচব্যবস্থা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। প্রযুক্তি তখনই কার্যকর যখন এর সঙ্গে সুশাসন, জবাবদিহি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ যুক্ত থাকে। উন্নয়নের ইতিহাসে একসময় খাদ্যনিরাপত্তা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এরপর বিদ্যুৎ, সড়ক ও ডিজিটাল সংযোগ উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে। আগামীতে ওই তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে, পানি নিরাপত্তা। ভবিষ্যতে অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, জলবায়ু অভিযোজনসহ সামাজিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বিশুদ্ধ পানি। উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি যদি শক্তিশালী করতে হয়, তবে একে ব্যয় নয় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত