সংরক্ষণের নামে নদী হত্যা!

ভোরের নরম আলোয় শীতলক্ষ্যা-বালু নদীর বুকে সোনালি রেখা আঁকা হয়, কুয়াশা সরিয়ে জেগে ওঠে তীরের সবুজ ঘাস। নদী তখন মনে হয় নিঃশব্দে শ্বাস নেওয়া এক জীবন্ত সত্তা যার ঢেউয়ে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, ভাঙন, গড়ে ওঠা জনপদ আর অগণিত মানুষের গল্প। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার চনপাড়া পূর্ববাসন কেন্দ্রের দক্ষিণে, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা চরে রাষ্ট্রীয় অর্থে চলছে প্রকৃতি ধ্বংসের আয়োজন। ‘ইকো পার্ক’ নির্মাণের নামে নদী তীর দখল করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) যাদের প্রধান দায়িত্বই নদী রক্ষা ও নাব্য বজায় রাখা।

নদী রক্ষা আইন অনুসারে তীরভূমিতে (ফোরশোর) কোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। অথচ বিআইডব্লিউটিএ চরটিকে ‘ফোরশোর’ হিসেবে চিহ্নিত করে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প চালাচ্ছে। এটি তাদের চলমান ‘নদীপাড় সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধন’ প্রকল্পের অংশ।

পরিবেশবাদী ও নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্প সবুজায়নের নামে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ ব্যবস্থাকে নতুন হুমকির মুখে ফেলছে। চরটি পলি জমে সৃষ্ট এটি খনন করে নাব্য ফিরিয়ে আনাই যৌক্তিক ও পরিবেশবান্ধব হতো। কিন্তু ইকোপার্ক নির্মাণে চ্যানেল সংকুচিত হয়ে স্রোতের পথ বদলে যাবে, পলি জমার হার বাড়বে এবং কয়েক বছরের মধ্যে আশপাশের এলাকা বেদখল হওয়ার আশঙ্কা।

চরটির আয়তন লম্বায় ৯০০ মিটার, প্রস্থে ২০০ মিটার। পশ্চিমে বালু নদ, পূর্বে শীতলক্ষ্যা; দক্ষিণে দুই নদীর মিলনস্থল। একসময় এ পথে বড় নৌযান চলত, কিন্তু খননের অভাবে নাব্য সংকট তীব্র। শুষ্ক মৌসুমে স্থানীয় কৃষকরা এখানে শাকসবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন প্রায় শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত।

গত বছর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন চরটি পরিদর্শনে গেলে কর্মকর্তারা ইকোপার্কের প্রস্তাব দেন। বিআইডব্লিউটিএ দাবি করছে, এতে চর সংরক্ষিত হবে এবং চনপাড়া পূর্ববাসন এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘চরটি মাঝনদীতে জেগে ওঠা পলির স্তূপ এটি ফোরশোর নয়। বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘এটিকে ফোরশোর দেখিয়ে নির্মাণ আইনের সুকৌশলী লঙ্ঘন। বিআইডব্লিউটিএর মূল দায়িত্ব নাব্য রক্ষা, পার্ক নির্মাণ নয়।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল চার মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১১ কর্মকর্তাকে আইনি নোটিস দিয়েছিল। নোটিসে দাবি করা হয়, নির্মাণ বন্ধ করে নদীর প্রবাহ সচল করতে হবে। নোটিস পাওয়ার পরও কাজ চলছে এক বছর বিরতির পর আবার এক্সকাভেটর দিয়ে খোদাই, বালু উত্তোলন, রাস্তা নির্মাণ ও পিলার বসানো হচ্ছে।

হাইকোর্টের একাধিক রায় (যেমন রিট ৩৫০৩/২০০৯) তীরভূমিতে স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ দাবি করছে, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসরণ করছে। কিন্তু আইনজীবী আবুল বাশার রুবেল বলেন, রায়ের মূল চেতনা নদী দখলমুক্ত করা এটি তার বিপরীত। কৃষকদের ক্ষতি ও বিকল্প প্রস্তাব।

কৃষক শারাফাত ইসলাম কায়েস, রজব আলীসহ অনেকে বলেন, স্থানীয় কাউন্সিলর ও তার লোকজন হুমকি দিয়ে চাষ বন্ধ করিয়েছে। প্রায় ১২ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিপূরণের আশ্বাস মিললেও কিছু দেওয়া হয়নি। স্থানীয়রা প্রস্তাব দিচ্ছেন চনপাড়া পূর্ববাসনের উত্তরে ওয়াসার ৯০ বিঘা খালি জমিতে পার্ক করা যায়, নদী না ধ্বংস করে।

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রাহয়ান কবীর বলেন, ‘জেলা প্রশাসন অনুমতি দেয়নি। তীরভূমিতে স্থাপনা নিষিদ্ধ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘কাজ বন্ধ ছিল। স্থানীয় এডির মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে দেখছি।’

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সহকারী পরিচালক মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘বেলার চিঠি পেয়ে আমরা বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ পাঠিয়েছি। উচ্ছেদের ক্ষমতা আমাদের নেই।’

বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি।