দায়িত্বগ্রহণের এক বছরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মৌলিক কয়েকটি সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। প্রথম বর্ষ থেকেই হলে আবাসন নিশ্চিত করা, খাবারের মান উন্নয়ন, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়িত হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে প্রায় ৩০ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের দাবি করেছেন ডাকসু নেতারা। তাদের দাবি, ১২ মাসে ৩৬টি সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সবগুলোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় অনেক কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনে সাদিক-ফরহাদ নেতৃত্বাধীন ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয়লাভ করে। ১৪ সেপ্টেম্বর দায়িত্বগ্রহণের পর এক বছর পূর্তির প্রাক্কালে ডাকসুর প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সব প্রতিশ্রুতিরই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে : নির্বাচনের আগে ১২ মাসে ৩৬টি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল। ইশতেহারে উল্লেখ করা সবকটি প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এসএম ফরহাদ। তাদের দাবি, প্রশাসনিক সহযোগিতার অভাব ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, খাবারের দাম কমিয়ে মান বৃদ্ধির জন্য আমরা টিসিবির সঙ্গে সমন্বয় করতে চেয়েছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতিতে সেটি সম্ভব হয়নি। আবাসন সমস্যা দূর করতে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, এর আগে সেটির উদ্বোধনও হয়েছিল। বর্তমানে প্রকল্পটি আবার দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
কাটেনি আবাসন সংকট : ঢাবির অন্যতম বড় সংকট আবাসন। নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের হলে আবাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছর পরও সেই সংকটের দৃশ্যমান সমাধান হয়নি। বিশেষ করে নারী হলগুলোতে তীব্র আবাসনসংকট এখনো বিদ্যমান। অনেক শিক্ষার্থীকে সিটের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বড় প্রকল্পের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়নের অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
খাবার মান নিম্ন : শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অন্যতম অভিযোগ হলের খাবারের মান নিয়ে। ইশতেহারেও বিষয়টি ছিল অগ্রাধিকারের তালিকায়। ডাকসু নির্বাচনের পর প্রথম দিকে বিভিন্ন হলের খাবারের মান নিয়ে কিছু তদারকি কার্যক্রম দেখা গেলেও সেটির স্থায়ী প্রভাব পড়েনি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি হলের ক্যান্টিনের খাবারে কেঁচো, ব্লেড ও তেলাপোকা পাওয়া গেছে। ফলে খাবারের মান উন্নয়ন ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।
অনিরাপদ ক্যাম্পাস : নির্বাচনের আগে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ নারীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এক বছর পরও ক্যাম্পাসে অনিরাপদ রয়ে গেছে। ক্যাম্পাসে এখনো মাদকাসক্ত ও ভবঘুরেদের দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, তাদের কেউ কেউ ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করে। এসব ব্যক্তি ও ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের প্রশাসনিক সেবা সহজ করা এবং রেজিস্ট্রার ভবনকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমানোর প্রতিশ্রুতিও ছিল ডাকসুর। সেটার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই। ফলে ডাকসুর চেষ্টার পরও এ ক্ষেত্রে টেকসই ও স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি।
নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন নেতারা : এক বছরের কার্যক্রমে ডাকসু নেতারা নানা বিতর্কেও জড়িয়েছেন। উচ্ছেদ অভিযানের নামে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের অভিযোগ, মাঠে খেলতে যাওয়া শিশুদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানো, একটি কনসার্টে সিগারেট বিতরণ, হিজড়াদের সঙ্গে বাগ্বিত-া এবং স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ডাকসুর মাত্র তিন প্রতিনিধির উপস্থিতির মতো ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েন তারা। এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের নেতাদের আচরণ ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রায় ৩০ কোটি টাকার কাজ করেছে ডাকসু : মৌলিক কয়েকটি প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলেও এক বছরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও কল্যাণমূলক কাজ করার দাবি করেছে ডাকসু। নেতাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া মাত্র ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি বিভিন্ন সহযোগিতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি টাকার এক হাজারের মতো কাজ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কলাভবনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন, মেয়েদের কমনরুমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় এক শিক্ষার্থীকে হিজাব উপহার এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করাসহ নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু কল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়েছে ডাকসু। তবে অনাবাসিক ছাত্রীদের হলের নির্দিষ্ট সুবিধায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, সব কমনরুমে নারী কর্মচারী নিয়োগ এবং হলগুলোয় গার্ডিয়ান লাউঞ্জ তৈরির মতো প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ বলেন, ১০৫ বছরের ইতিহাসে এবারের ডাকসু সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সমস্যাগুলোর কোনোটি অমীমাংসিত রাখা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি ন্যূনতম সহযোগিতাও করত, তাহলে আমাদের কোনো সংকট থাকত না। উল্টো প্রশাসন প্রতিটি কাজে বাধা সৃষ্টি করেছে। তবু আমরা বিভিন্ন স্পনসর ম্যানেজ করে অন্তত ৩০ কোটি টাকার প্রায় ১ হাজার কাজ ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছি। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, প্রশাসন আমাদের বাজেট না দিলেও আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে বড় অঙ্কের ফান্ড নিয়ে আসি। কিন্তু প্রশাসন বিভিন্নভাবে আমাদের কাজ আটকে দিয়েছে। তবুও আমরা শিক্ষার্থীদের মৌলিক সংকটগুলো মোকাবিলা করেছি।
বর্তমান ডাকসুর মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর। এরপর নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে ডাকসুর মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়বে। এ সময়ের মধ্যেও নির্বাচন না হলে বর্তমান ছাত্র সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন হবে কিনা জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন অবশ্যই হওয়া উচিত, হতেই হবে।’