আমরা নারী, আমরা সবই পারি; সমর সম্মুখে ধরতে পারি তরবারি বাংলা সাহিত্যের এই পঙ্ক্তি যেন আজকের নারীদের শক্তি, সাহস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। সময় বদলেছে, বদলেছে নারীদের ভূমিকা। সমাজের নানা বাধা পেরিয়ে আজ নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পথে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন স্তরে কাজ করা নারীদের গল্প সামনে আনে এই বাস্তবতা। এ সুযোগ ও সাহস পেলে নারীরা শুধু নিজেদের নয়, বদলে দিতে পারেন সমাজের চিত্রও।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পথ দেখাচ্ছেন তৌহিদা শিরোপা: দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন ‘মনের বন্ধু’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তৌহিদা শিরোপা। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি, বরং মানুষের মানসিক সুস্থতাকে সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন।
তার নেতৃত্বে ‘মনের বন্ধু’ ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে। বিশেষ করে পোশাকশ্রমিক, নারী ও তরুণদের জন্য সহজলভ্য ও স্বল্প খরচে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরিতেও তারা নিয়মিত কাজ করছে।
তৌহিদা শিরোপা জানান, তার এই পথচলার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিবারের সমর্থন। শুরু থেকেই পরিবার তাকে সাহস ও উৎসাহ দিয়েছে, যা তাকে নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করেছে। তাদের উৎসাহ ও বিশ্বাসই তার কাজের প্রতি আরও দৃঢ় থাকতে সাহায্য করেছে।
তবে এই যাত্রা সহজ ছিল না। তিনি জানান, শুরুতে মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ছিল খুবই কম। অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন না। মানুষকে বোঝানো যে, মানসিক স্বাস্থ্যও শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এখন আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেবাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে কম বাজেটে কীভাবে সাশ্রয়ীভাবে এই সেবা দেওয়া যায়, সেটি একটি বড় বিষয়।
নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমাজে এখনো অনেক ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি প্রয়োজনীয় সহমর্মিতা অনুপস্থিত। তার মতে, নারীদের অনেক চ্যালেঞ্জ পুরুষদের তুলনায় বেশি মোকাবিলা করতে হয়। সমাজে যদি নারীদের প্রতি আরও সংবেদনশীলতা তৈরি হয়, তাহলে এই চ্যালেঞ্জগুলো অনেকটাই কমে আসবে।
একজন নারী হিসেবে সামাজিক কোনো বাধার মুখোমুখি হয়েছেন কি? জবাবে শিরোপা বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার ক্ষেত্রে তেমন বড় কোনো সামাজিক বাধা আসেনি। তবে আমাদের সমাজে অনেক নারী পারিবারিক কারণে চাকরি বা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। আবার অনেক সময় নারীরা নিজের মনেই দ্বিধায় থাকেন, আমি পারব কি পারব না। এই মানসিক বাধাটাও বড় একটি বিষয়। গত এক দশকে নারীরা অনেক বেশি কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে মনে করেন ব্যতিক্রমধর্মী এই উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, এখন এমন ক্ষেত্র খুব কমই আছে যেখানে নারীরা নেই। এটি অবশ্যই বড় অগ্রগতি। তবে বিজ্ঞান বা ব্যবসার মতো কিছু ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে অংশগ্রহণের অনুপাত ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
নারীদের সাফল্যের জন্য তার পরামর্শ কী হলো প্রথমেই নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি পড়াশোনা ঠিকভাবে চালিয়ে যাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাজ যাই হোক না কেন সেটা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করতে হবে। নিজের প্রতি সৎ থাকা এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করে যাওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন তৌহিদা শিরোপা।
রান্নাঘর থেকে উদ্যোক্তা : নারীর সাফল্যের গল্প সবসময় বড় কোনো অফিস বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় সেই গল্পের শুরু হয় ঘরের ভেতর থেকেই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গৃহিণী সানজিয়া সুলতানা তেমনই এক উদাহরণ। সংসারের সব দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তিনি নিজের শখকে রূপ দিয়েছেন একটি ছোট উদ্যোগে। ‘ঞধংঃু ঈধশব ইৎধযসধহনধৎরধ’ নামের একটি অনলাইন পেজের মাধ্যমে তিনি এখন বিভিন্ন ধরনের কেক তৈরি করে বিক্রি করছেন।
শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণভাবে। পরিবারের সদস্যদের জন্য শখ করে কেক বানাতেন সানজিয়া। ধীরে ধীরে তার তৈরি কেকের স্বাদ ও নকশা পরিচিতজনদের নজর কাড়ে। তাদের উৎসাহেই তিনি অর্ডার নেওয়া শুরু করেন।
তার ভাষায়, ‘শুরুতে শুধু শখ থেকেই কেক বানাতাম। পরে যখন সবাই প্রশংসা করতে লাগল, তখন মনে হলো এটাকে ছোট একটা উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।’
ধীরে ধীরে জন্মদিন, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা ছোটখাটো আয়োজনের জন্য তার তৈরি কেকের চাহিদা বাড়তে থাকে। সংসারের কাজের ফাঁকেই তিনি অর্ডার অনুযায়ী কেক তৈরি করেন।
তিনি বলেন, ‘সংসারের কাজ সামলে সময় বের করে কেক বানাতে হয়। তবে কাজটা যেহেতু ভালো লাগে, তাই এটাকে কখনো কষ্ট মনে হয় না।’
নারীর ক্ষমতায়ন মানেই উন্নত সমাজ : বিশ্লেষকরা মনে করেন, নারীর ক্ষমতায়ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়; বরং এটি অর্থনীতি ও সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
প্রাইম ব্যাংক পিএলসির এসভিপি ও হেড অব লাইয়াবিলিটি অ্যান্ড উইমেন ব্যাংকিং এবং ডাইভার্সিটি অ্যান্ড ইনক্লুশনের কোর মেম্বার শাইলা আবেদিন বলেন, নারীদের ওপর বিনিয়োগ মানে উদ্ভাবন, দৃঢ়তা এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ করা।
তার মতে, শুধু প্রতীকী উদ্যোগে প্রকৃত পরিবর্তন আসে না। সত্যিকার ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন, নেতৃত্ব বিকাশ এবং এমন একটি কর্মপরিবেশ যেখানে নারীরা কোনো বাধা ছাড়াই নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারেন।
নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারীর শক্তি ও সম্ভাবনা কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। ঘরের ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব, সব জায়গাতেই নারীরা আজ নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। স্বপ্ন, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলা এসব নারীর গল্প শুধু অনুপ্রেরণাই নয়, বরং সমাজের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্তও উন্মোচন করছে।