সাড়া ফেলেছে ‘ব্রেইল’ বই

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা যেন পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং অন্যদের মতো বইয়ের জগতে প্রবেশের সুযোগ পায় এই লক্ষ্যে অমর একুশে বইমেলায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছে ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা’ ও ‘ভিজ্যুয়াল ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোস্যাইটি (ভিপস)’। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তাদের এই উদ্যোগ দৃষ্টিহীন পাঠকদের জন্য তৈরি করেছে স্পর্শের মাধ্যমে পড়ার এক ভিন্ন জগৎ, যেখানে বই শুধু দেখা নয় অনুভব করে পড়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মধ্যে বিষয়টি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

দৃষ্টিহীন মানুষ যেন পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়, তারাও যেন সবার সঙ্গে তাদের পড়ার কাজ চালিয়ে যেতে পারে এই লক্ষ্য নিয়েই বইমেলায় অংশ নিয়েছে ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা’। অন্য প্রকাশনীগুলো যেখানে বই বিক্রির উদ্দেশ্যে মেলায় অংশ নেয়, সেখানে স্পর্শ ব্রেইল মেলায় এসেছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পড়ার সুযোগ করে দিতে।

প্রকাশনাটির স্টলে গিয়ে দেখা যায়, কেউ স্পর্শের মাধ্যমে ব্রেইল বই পড়ছেন, কেউ শুনছেন অন্য কারও কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দ, আবার কেউ আগ্রহী হয়ে ব্রেইল পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। স্টলের কর্মীরা ধৈর্য সহকারে সবার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এবং বই সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন।

জানা যায়, স্পর্শ ফাউন্ডেশনের ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা’ ২০১১ সাল থেকে বইমেলায় বই প্রকাশ করে আসছে। প্রতিবছরই তারা নতুন বই প্রকাশ করে। এ বছর তারা ৬টি বই প্রকাশ করেছে। এগুলোর সবই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য আগ্রহীদের ফ্রিতে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এ বছর স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী নতুন ৬টিসহ মোট ১৬৭টি বই নিয়ে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংখ্যা নিতান্তই কম। নতুন বইগুলো ব্রেইল আকারে প্রকাশ পেলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পাঠের পরিধি আরও বাড়বে। ব্রেইল পদ্ধতির উদ্ভাবক লুই ব্রেইলের হাত ধরে উনিশ শতকে যে স্পর্শলিপির সূচনা হয়েছিল, বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রকাশনা সংস্থাই তা গ্রহণে পিছিয়ে। ফলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা বইমেলার মূল উচ্ছ্বাস থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হচ্ছে।

ব্রেইল পাঠক রিশাদ হাসান বলেন, শুধু পাঠ্যবই নয়, সমকালীন সাহিত্যও আমাদের দরকার। নতুন কবিতার বই, জনপ্রিয় উপন্যাস সবই যদি ব্রেইলে পাওয়া যেত, তাহলে আমরাও আলোচনায় অংশ নিতে পারতাম।

স্পর্শ ফাউন্ডেশনের সদস্য আইরিন সুলতানা বলেন, আমাদের সবাই ‘মার্জিনালাইজড কমিউনিটি’ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে চিন্তা করে। সেটা না করে সহ-নাগরিক ভাবলেই ভালো হয়। অন্যান্য প্রকাশনীতেও যদি লেখাগুলো ব্রেইলে কনভার্ট করা হয়, তাহলে এই ধরনের বইগুলোর দামও কমে এবং চাহিদাসম্পন্নদের জন্য সুবিধাও হয়।

এ বিষয়ে গ্রন্থিক প্রকাশনের বিক্রয়কর্মী সাজ্জাদ বলেন, ব্রেইল অক্ষরে বই ছাপতে পারলে আমাদের জন্যও স্বস্তির ব্যাপার হতো। কিন্তু বইয়ের ব্যবসায় আমাদের খুব একটা লাভ হয় না। সেখানে ব্রেইলের ব্যবস্থা করাটা বেশ খরচসাপেক্ষ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে একটি কেন্দ্রীয় ব্রেইল রূপান্তর সেল গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে প্রকাশকরা সফট কপি জমা দিলে ব্রেইল সংস্করণ তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প যখন আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগোচ্ছে, তখন অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে এটি হতে পারে পরবর্তী জরুরি পদক্ষেপ।

বিক্রেতা রায়হান আলী রাজ বলেন, আমরা মেলায় সবার কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চাই যারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রয়েছে তারাও যেন স্বাভাবিক মানুষের মতো পড়তে পারে এবং চলতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইনজীবী ও লেখক অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন মজুমদার বলেন, লেখক ও প্রকাশকদের কাছে আমাদের অনুরোধ, প্রতিবছর অন্তত ১/২টি করে হলেও বই যেন ব্রেইলে প্রকাশ করা হয়। এতে আমাদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা পড়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

নতুন বই এসেছে ১৮৫টি

গতকাল ৭ মার্চ শনিবার ছিল অমর একুশে বইমেলার ১০ম দিন। মেলা সকাল ১১টায় শুরু হয়ে রাত ৯টায় শেষ হয়। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় ছিল শিশুপ্রহর। গতকাল তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ১৮৫টি। এ নিয়ে ১০দিনে নতুন বই এসেছে ৭৫৮টি।

অমর একুশে উদ্যাপনের অংশ হিসেবে গতকাল বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : নূরজাহান বেগম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশ নেন সোহরাব হাসান। সভাপতিত্ব করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী।

ইসরাইল খান বলেন, বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাময়িক-সাহিত্যের ইতিহাসে নারী-সম্পাদকের নেতৃত্বে সুদীর্ঘকালব্যাপী পরিচালিত ও প্রকাশিত দু’একটি পত্রিকার নাম ইতিহাসে উজ্জ্বলরূপে চিরজাগরূক থাকলেও ‘সাপ্তাহিক বেগম’-এর তুলনা পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি তথা সার্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ও উন্নয়নের ইতিহাসে এই পত্রিকা যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে মহীয়সী নূরজাহান বেগমের নামও সমমর্যাদায় উচ্চারিত হবে। তার বহুমুখী তৎপরতায় নারীর সার্বিক কল্যাণমূলক বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও গড়ে উঠেছিল। শিক্ষিত, সচেতন নারীরা যদি নূরজাহান বেগমকে অনুসরণ করে নারীসমাজের সার্বিক কল্যাণে এগিয়ে আসেন, তবে সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলার নারীদের মুখে অমলিন হাসি ফুটে উঠবে।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন মুস্তাফা মজিদ। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন মিনহাজুল হক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন সাহিদা পারভীন রেখা, আনজুমান আরা এবং আজহারুল ইসলাম রনি। সংগীত পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা, পিয়াল হাসান, নিশাত আহমেদ, মো. ইউসুফ আহমেদ খান, জয় শাহরিয়ার, নির্ঝর চৌধুরী এবং মো. শফিউদ্দিন।

আজকের সময়সূচি 

আজ ৮ মার্চ রবিবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আসাদ চৌধুরী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কুদরত-ই-হুদা। আলোচনায় অংশ নেবেন সৈকত হাবিব। সভাপতিত্ব করবেন সৈয়দ আজিজুল হক। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।