বেপরোয়া যুদ্ধ অসহায় মানুষ

এক অসম যুদ্ধ চলছে। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক শক্তিসহ কোনো বিচারেই ইরান আমেরিকার সমকক্ষ নয়। কিন্তু তারপরও যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশটির ওপর। ইরানের ওপর হামলা এবং তারপর আমেরিকা-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছে বিশ্ব। যুদ্ধের কারণ কী, তা নিয়ে আলোচনা যেমন চলছে, তেমনি যুদ্ধের আঁচ লেগেছে রান্না ঘরের চুলা পর্যন্ত। জ্বালানিনির্ভর বিশ্বে জ্বালানিসমৃদ্ধ এলাকাগুলো আক্রান্ত হলে, কেউ রেহাই পাবে না তার প্রভাব থেকে। এটি যেমন সত্য, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো সম্পদ দখল এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কত নৃশংস হতে পারে, যুদ্ধের আগুনে পুড়িয়ে দিতে পারে এবং নিজেদের মতো করে দুনিয়াকে ভাগ বণ্টন করতে গিয়ে মানবিকতা, গণতন্ত্র সবকিছুকে ধূলিসাৎ করতে পারে তার নিদর্শন দেখা গেছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু, ব্যাপক ধংসযজ্ঞ আর বিশ্ব মানচিত্রের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও যুদ্ধ শেষ হয়নি। সাম্রাজ্যবাদ থাকলে বাজার দখলের যুদ্ধ থাকবেই, লেনিনের এই বিশ্লেষণকে সত্য প্রমাণিত করে যুদ্ধ চালানো হচ্ছে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সামরিক, বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোল মাদুরোকে ধরে আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে বিচারের সম্মুখীন করা আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা এই দুই ঘটনা দুই দেশে এবং দুই অঞ্চলে ঘটলেও একটা প্রশ্ন তৈরি হয়, কেন আমেরিকার এই আক্রমণ? তাহলে কি আন্তর্জাতিক রাজনীতি কি এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তুলনামূলক দুর্বল রাষ্ট্রগুলো আর তার নেতাদের বিপজ্জনক মনে করছে?

ভেনেজুয়েলা দুর্বল, কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ দেশ। জ্বালানি ক্ষুধার্ত বিশ্বে, সর্ব বৃহৎ জ্বালানি তেলের মজুদ যে দেশে তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজর পড়বেই। এর সঙ্গে আছে সোনার ভাণ্ডার, নানা রকম খনিজ পদার্থের বিপুল সম্ভাবনা। ফলে লোভে চোখ যেমন চকচক করেছে, তেমনি আক্রমণের অজুহাত তৈরি করেছে আমেরিকা। আর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাসের রিজার্ভ, পৃথিবীর তেল মজুদের তিন শতাংশ আর তেলবাহী ট্যাংকার যাতায়াতের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি, যার নিয়ন্ত্রণে, সেই দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্য আমেরিকা গোপন করেনি। সঙ্গে নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে তার স্বার্থরক্ষার প্রধান সহচর ইসরায়েলকে আর আক্রমণ চালিয়ে ইরানকে বোঝাতে চাইছে যে, আমেরিকার স্বার্থরক্ষা করেই তাকে চলতে হবে। ইরান তার সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। চলছে এক অসম যুদ্ধ। দুনিয়াতে গণতন্ত্রের চর্চা করার প্রধান প্রশিক্ষক দাবিদার আমেরিকা যে গণতন্ত্রের ধার ধারে না, তা প্রমাণ করেছে বহুবার। বামপন্থিরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে, পুঁজিবাদ কখনই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে না। তার কাছে মানুষের চাইতে মুনাফা বড়। মার্ক্স দেখিয়েছেন, মুনাফার জন্য পুঁজিবাদ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। ফলে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কোনো কিছুই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বহুল কথিত সার্বভৌমত্বের সীমারেখা, প্রতিটি রাষ্ট্রের নাগরিক সিদ্ধান্ত নেবে তাদের দেশ কেমন করে চলবে, নেতাদের অপরাধ থাকলে রাষ্ট্রের ভেতরেই নেতার বিচার হবে এবং বাইরের কেউ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না সেসব কথা এখন মূল্যহীন। সার্বভৌমত্ব এখন ছুড়ে ফেলা হয়েছে সমুদ্রে।

ইরান আক্রমণ করে আমেরিকা এক ঢিলে কয়েকটি পাখি মারতে চেয়েছে। তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সব কটি দেশ আমেরিকার অনুগত, বাকি আছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে সব থেকে বড় সামরিক বাহিনী ইরানের। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রকাশিত ‘মিলিটারি ব্যালান্স ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ইরানের প্রায় ছয় লাখ দশ হাজার সৈন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে। এর মধ্যে সাড়ে তিন লাখ সরাসরি সেনাবাহিনীতে আছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর, যারা নিয়মিত কাজের সঙ্গেই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ আর ড্রোন উৎক্ষেপণের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তাদের সংখ্যা এক লাখ ৯০ হাজার। এর বাইরেও ইরানের কিছু আঞ্চলিক মিত্র আছে, যেমন হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, ইরাকে কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, লেবাননে হেজবুল্লাহ আর গাজা ভূখণ্ডে হামাস। ইরানকে কার্যত ধ্বংস করে আমেরিকার কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা আর ইসরায়েলকে নিরাপদ করা যেমন তার উদ্দেশ্য, তেমনি এই বার্তা দেশে দেশে পৌঁছে দেওয়া যে, আমেরিকা চাইলে পৃথিবীর যেকোনো দেশকে দখল করতে না পারলেও ধ্বংস করতে পারে। তেলের ওপর নির্ভরশীল যে দেশগুলো আমেরিকার বাণিজ্যিক প্রতিপক্ষ, যাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় চীন তাকে জ্বালানি জিম্মি করা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস গাজা থেকে হামলা চালানোর পরে তাকে অজুহাত করে ইসরায়েল যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাতে বিশ্বমানবিকতা বিপন্ন বোধ করলেও ইসরায়েল-আমেরিকার কিছুই আসে-যায়নি। এ অঞ্চলে যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল, তার ফলে ইরানের এই স্বঘোষিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বড়সড় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা আছে ইরানের। সেই ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই ইরান মূলত যুদ্ধ এবং অবরোধের মধ্যেই সময় অতিবাহিত করেছে। ফলে একটা যুদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়েছে এবং যুদ্ধের মধ্যেই তারা সাজিয়ে নিয়েছে তাদের অর্থনীতি আর যুদ্ধ গবেষণা ও পরিকল্পনা। আমেরিকার বিরুদ্ধে ইরান এখন ‘ক্ষয় করার যুদ্ধের’ কৌশল নিয়েছে। সামরিকভাবে এই কৌশলে প্রতিপক্ষের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও লোকবল যাতে কমে এবং যতক্ষণ তাদের লড়াই করার ক্ষমতা কমে না আসে, ততক্ষণ শত্রুপক্ষের লাগাতার ক্ষতিসাধন করে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ে ইরান ক্রমাগত বেসামরিক এলাকাগুলোর দিকে তাদের নজর সরিয়ে এনেছিল। হামলা করে জনগণের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক ভয় আর আতঙ্ক তৈরি করেছিল তারা। যুদ্ধে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারের বড়সড় ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ধারণা করা হয়, মাটির নিচেও তাদের অনেক অস্ত্র মজুদ আছে, আবার নতুন করে অস্ত্র উৎপাদানও করা হয়েছে। যুদ্ধে প্রতিপক্ষের শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতে হয় সবচেয়ে বেশি। ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য যা তারা প্রকাশ করেছে সে অনুযায়ী, ইরানের কাছে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। এর মধ্যে এক হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের স্বল্প দূরত্ব আর এক থেকে তিন হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের মধ্যম দূরত্বের দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই আছে। ইরান বলছে যে, তারা যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, তার মধ্যে যেমন আছে ‘সেজিল’ ক্ষেপণাস্ত্র, যার রেঞ্জ প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার, তেমনই শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিসম্পন্ন ‘ফাতাহ’ ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতেও আক্রমণ চালিয়ে কিছু সাফল্য তারা পেয়েছে। যুদ্ধের ক্ষেত্রে অস্ত্রের ভাণ্ডার আর সরবরাহের ওপরে বিজয় নির্ধারিত হয় না, তবে নিশ্চিতভাবেই অস্ত্রের সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক। যেমন অস্ত্র আর গোলাবারুদের সংখ্যার দিক থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের চাইতে অনেক শক্তিশালী, কিন্তু তবুও চার বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এবারের যুদ্ধে প্রথম থেকেই দুই পক্ষ দ্রুত অস্ত্র ব্যবহার করছে। কিন্তু অস্ত্র তো চাইলেও উৎপাদন করা সম্ভব না। তেল আবিব-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ বা আইএনএসএসের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল ইতোমধ্যেই দুই হাজারেরও বেশি হামলা চালিয়েছে। আর ইরান ৫৭১টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে আর ১৩৯১টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ফলে যুদ্ধ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলে, তাহলে দুপক্ষের জন্যই এই পর্যায়ের লড়াই চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। যুদ্ধের সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের জন্য টাকা দেবে কে? যুদ্ধের খরচ জোগানো, দুর্ভোগ পোহানো সব যে জনগণের কাঁধে সেই জনগণের মতামতেরও তোয়াক্কা করছে না মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে চালানো হামলার বিরুদ্ধে অবস্থা নিয়েছেন বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিক। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসোসের নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বোমা হামলাকে সমর্থন করেছেন মাত্র ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। বিপক্ষে মত দিয়েছেন ৪৩ শতাংশ। সিবিএসের আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কী, তা ট্রাম্প প্রশাসন পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হলে ট্রাম্পের কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন, যা তিনি এখনো নেননি।

এই যুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, কী দেশে কী বিদেশে, কারও কোনো তোয়াক্কা করছে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এর খেসারত দিতে হবে সারা বিশ্বকে। তেলের দাম বাড়ছে ক্রমাগত, জাহাজ চলাচল বন্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত নয় যারা, তারাও আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সে অনুযায়ী মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল/অকটেন, ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটার এবং এসইউভি/মাইক্রোবাসে ২০-২৫ লিটার তেল নিতে পারবে। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও কনটেইনার ট্রাক নিতে পারবে ২০০ থেকে ২২০ লিটার। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দেশের পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে ফলে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়ে যাবে। বৈশ্বিক বাজারে সারের প্রধান কাঁচামাল গ্যাসের সরবরাহ সংকট, জাহাজ সংকট, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি এবং প্রিমিয়াম চার্জ বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক সারের বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব পড়বে চায়ের দোকান থেকে চাষের জমি পর্যন্ত। যুদ্ধ ইরানে হলেও প্রভাব পড়ছে দোকানে। জ্বালানি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি আর প্রবাসী শ্রমিকদের সংকটের কারণে, বাংলাদেশের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

rratan.spb@gmail.com