চলছে যুদ্ধ বসছে সংসদ ডাকছে ঈদ

যুদ্ধ আর রাজনীতিতে কেউ কাউকে ছাড়ে না। অতিরাজনীতি-কূটনীতি-সমরনীতির শিকার দেশ ও মানুষ তা হাড়ে হাড়ে ভোগে। মরে, পঙ্গু হয়, স্বজন হারায়, কাঁদে, বিলাপ, আহাজারি করে। নাজাত পায় না। এ সবের এক নাহালতে গোটা বিশ্ব। ভুগছে বাংলাদেশও। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা যত বাড়ছে, তত প্রশ্ন: এ যুদ্ধ থামবে কবে? বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলো এ যুদ্ধের শরিক না হয়েও ক্ষতিগ্রস্ত। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের জ্বালা এখনো সইতে হচ্ছে। সেই ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের ঘাও যায়নি। কত শ্রমিক চাকরি খুইয়ে ফিরেছে। গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার যে অভিযোগে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেই অভিযোগ পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তাই এখন ইউরোপীয় দেশগুলো যে কোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে আইনি ভিত্তি, স্পষ্ট উদ্দেশ্য এবং বেরিয়ে আসার পথ জানতে চায়। ২ মার্চ রয়টার্সের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইরান প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যাটোর অবস্থান পরিষ্কার না হলে, ইউরোপীয় নেতারা প্রকাশ্যে এগোতে চান না; অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতেই এ অবস্থান। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর, ইউরোপের কৌশল বদলে গেছে; রাশিয়াকে তারা তাৎক্ষণিক হুমকি মনে করে। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে বড় সংঘাতে জড়ালে ইউক্রেন ইস্যুতে মনোযোগ ও সহায়তা সরে যেতে পারে। তাই তারা একসঙ্গে দুই সংকটে ঢুকতে চায় না। ৩ মার্চ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসে (এপি) লর্ন কুক লিখেছেন, ‘ইউরোপ সামরিক ঘাঁটি সুরক্ষা ও নাগরিক সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিতে সক্রিয় থাকলেও সংঘাত বাড়ানোর পথে হাঁটছে না। চলমান ইরান যুদ্ধকে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংঘাত হিসেবে দেখার জো নেই।’

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, ইউরোপের দ্বিধা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে একটি নতুন বৈশ্বিক শক্তির মানচিত্র তৈরি হচ্ছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়াও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিলে তার প্রভাব শুধু সামরিক থাকবে না; জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং বৃহৎ শক্তির কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে তা প্রতিফলিত হবে। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে যেখানে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা ও মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। ফলে আমাদের নিরাপত্তা এখন বন্দর ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ, ট্রেড রুট, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকট সব দিকেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রশ্নও একই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ। আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি সরবরাহশৃঙ্খল, খাদ্য, জ্বালানি ও শ্রমের প্রশ্ন। একে বলা যেতে পারে ‘স্কিল-সিকিউরিটি’, অর্থাৎ দক্ষতা নিজেই একটি নিরাপত্তাসম্পদ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে নির্মাণ খাতে শ্রমের চাহিদা কমবে। আবার খাদ্যনিরাপত্তার চাপে কৃষি খাতে চাহিদা বাড়তে পারে। দক্ষতার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য না থাকলে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স-নির্ভর অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে। সরকারকে এরইমধ্যে বিষয়টি ভাবাচ্ছে। ভাবনাদৃষ্টে কিছু প্রস্তুতিও দেখা যাচ্ছে।

এর সমান্তরালে দেশীয় রাজনীতিতে, হাটে হাঁড়ি ভাঙার হুমকি-ধমকি ব্যাপক। পজিশন-অপজিশন উভয়ই নাছাড়বান্দা। মুখের ভাষা, শরীরের ভাষা মির্জা আব্বাস বা নাসীউদ্দীন পাটোয়ারীর মতো না হলেও ভেতরগত অবস্থা কাছাকাছি। কেউ মিষ্টি করে চিবিয়ে বলছেন। কেউ একটু আউটব্লাস্ট হচ্ছেন। দেখিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি শুরু হয়েছে। বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও স্বস্তিতে নেই। তাদের বেশ ক’জনের আসামির কাঠগড়ায় ওঠার অবস্থা। আর রাজনৈতিক বড় দল ও শক্তির মধ্যে সংসদ ও মাঠ গরম করার জোর প্রস্তুতি। কর্মশালা-ওরিয়েন্টেশনে শান কাজ শেষ হয়েছে দুপক্ষেই। এবার অনেক এমপিই একেবারে নতুন, ফ্রেশ। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা দুজনেই প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের মতোই নির্বাচিত এমপিদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি প্রথমবারের মতো ১২ মার্চ সংসদে বসতে যাচ্ছেন। নতুন সংসদে মোট আটটি দলের প্রতিনিধিত্ব। এর মধ্যে পাঁচটি দলের শীর্ষ নেতারাই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নতুন সংসদের ২৯৭ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ২০৯ জনই (৭০ শতাংশ) প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। ২০৯টি আসনে জয়ী বিএনপির ১৩২ জনই নতুন মুখ। অর্থাৎ দলটির সংসদীয় দলের ৬৩ শতাংশ সদস্য এবারই প্রথম সংসদে ঢুকবেন। বিএনপির তুলনায় জামায়াতে ইসলামীতে নতুন মুখের হার আরও বেশি। দলটির ৬৮ জন সাংসদের মধ্যে ৫৯ জনই (৮৬ শতাংশ) নতুন। ছোট দলগুলোর এমপিদের পুরোটাই নতুন। এনসিপির ছয়জনই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত। একইভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, গণঅধিকার পরিষদ এবং গণসংহতি আন্দোলনের ছয়জনের সবাই নতুন মুখ। সাতজন স্বতন্ত্র সাংসদের মধ্যে ছয়জনই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। পুরনো বা অভিজ্ঞদের অনেকের পারফরম্যান্স অজানা নয়। নানা বাজে কাজ, মুখের বদলে হাত চালানো, কথায় কথায় চড়-থাপ্পড় মেরে তাদের অনেকে পরিচিতি পেয়েছেন। ব্রিটেন, ভারত কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকান পার্লামেন্টে সাংসদদের জন্য আচরণবিধি রয়েছে। এসব দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সাংসদদের সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হয়, কোথাও কোথাও বেতনও কাটা হয়। বাংলাদেশে ২৫ বছর পূর্ণ যে কোনো নাগরিক সাংসদ হতে পারেন এবং ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া নেই। সংসদে আইন পাসের সময় শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলেই কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রাখেন না, তারা স্থায়ী কমিটিতে বসে আইনের উদ্দেশে আনা বিলগুলোর খুঁটিনাটি বিশ্লেষণও করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির জন্য কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের তলব করে নানা ব্যাখ্যা চান। এ জন্য শুধু রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই যথেষ্ট নয়, একাডেমিক জ্ঞানও দরকার। নতুনরা শুরুতে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলতে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। তবে, সদিচ্ছা থাকলে বিপরীত রেকর্ডও গড়তে পারেন। নতুনদের দ্রুত নিয়মকানুন শেখার বহু নজির দেশেই রয়েছে। নতুনরা মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে চাইলে বিতর্ক ও সংলাপে মাত করে দিতে পারবেন। অতীত রেকর্ড বলছে, পুরনো এমপিরাই জাতীয় সংসদকে অকার্যকর বেশি করেছেন।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, অভিজ্ঞ রাজনীতিকরাই সরকার ও বিরোধী দলে দায়িত্বে বেশি  ছিলেন। প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এমপিদের সংখ্যা বৃদ্ধি গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা হচ্ছে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখা। তবে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বের পাশাপাশি আইনগতভাবে আরও অনেক নির্বাহী দায়িত্বও রয়েছে । সংসদীয় আচরণ বলতেও একটা বিষয় রয়েছে। জাতীয় সংসদের অভ্যন্তরে ও বাইরে সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সুশৃঙ্খল, নৈতিক এবং আইনানুগ আচরণবিধিকে বোঝায়। এটি সংসদীয় কার্যক্রমের শালীনতা, জবাবদিহি ও শিষ্টাচার বজায় রাখার পাশাপাশি জনসাধারণের আস্থা ধরে রাখতে কাজ করে। এর মধ্যে আইন প্রণয়ন, বিতর্ক ও ভোটে অংশ নেওয়ার সময় যথাযথ নিয়ম মেনে চলা অন্তর্ভুক্ত। শালীন ভাষা, অঙ্গভঙ্গি, ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য সংসদ সদস্যপদ ব্যবহার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার না করা, জনস্বার্থে কাজ করা তাদের জন্য জরুরি। নানা মন্দ খবরের মধ্যেও সরকারি-বিরোধী দুই শিবিরেই প্রথমবার নির্বাচিতদের সংসদীয় কার্যক্রম, বিল-বাজেট, স্থায়ী কমিটির কাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা দিতে ওরিয়েন্টেশন একটি আশা জাগানিয়া খবর।  অভিজ্ঞ সাবেক আমলা, একাডেমিশিয়ান ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে এমপিদের দায়িত্ব, মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংসদীয় রেওয়াজ ও মন্ত্রণালয় পরিচালনায় দক্ষ করে তুলতে কৌশলগত ভূমিকা কেমন হবে, তা বুঝিয়েছেন বিএনপির এমপি-মন্ত্রীদের। জামায়াতে ইসলামী তা করেছে আরও আগে। অভিজ্ঞ সাবেক আমলা, একাডেমিশিয়ান ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে এমপিদের দায়িত্ব ও বিরোধী দলের কৌশলগত ভূমিকা কেমন হবে, তা তুলে ধরা হয়েছে তাদের কর্মশালায়। লক্ষণ বা প্রস্তুতি হিসেবে অবশ্যই তা ইতিবাচক।

এক বারোতে (ফেব্রুয়ারি) ভোট শেষে আরেক বারোতে (মার্চ) সংসদ বসতে যাচ্ছে। এর পরই ঈদ। এরই মধ্যে ঈদের প্রস্তুতি চলছে যার যার সাধ্যমতো। ঈদ আনন্দের হোক না হোক, এর  অর্থে হেরফের নেই। আনন্দ না মিললেও, ঈদ অর্থ আনন্দ। ঈদের পরিভাষার মধ্যে রয়েছে উৎসব, খুশি, প্রশান্তি, পুনরাবৃত্তি, স্বস্তি, আশা, আশ্বাসসহ আরও অনেক শব্দ। প্রতিটি শব্দই অর্থগতভাবে লোভনীয়। প্রত্যাশিত তথা আকাক্সক্ষারও। প্রায় সব অভিভাবকই ঈদের আগে সন্তানসহ পরিবারের সবাইকে ঈদের আগে কিছু না কিছুর আশ্বাস দেন। সরকার আশ্বাসের প্যাকেজ দেয় জনগণকে। যদিও ঈদে সরকারের কাছে সাধারণ মানুষ কোনো উপঢৌকনের আশা করে না। তাদের মোটা দাগে চাওয়া নির্বিঘœ যাতায়াত, যদ্দুর সম্ভব সাশ্রয়ী কেনাকাটা এবং যার যার সামর্থ্যমতো নিরাপদে ঈদের একটা আমেজের ব্যবস্থা করা। সরকারের দিক থেকে বরাবরই বিশেষ অফারে বলা হয়, এবারের ঈদ হবে স্মরণকালের স্বস্তি ও আনন্দের। সরকারের সংশ্লিষ্টরা তা বলে অভ্যস্ত, মানুষ অভ্যস্ত শুনতে শুনতে। ঈদ যাতায়াতে দুর্ঘটরায় ক’জন মরল বা ঈদের কেনাকাটায় কত ঝক্কি গেল এসব আর তখন বিষয় থাকে না। ঈদের ঢের আগেই প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ভিআইপি প্রটোকল ছাড়া চলাচল করায় রাজধানীর যানবাহনের গতি বেড়েছে প্রায় ১ কিলোমিটার।  রাজধানীতে আগে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ছিল ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার যা কিনা পায়ে হাঁটা গতির সমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্বভার গ্রহণের পর তিনি ভিভিআইপি প্রটোকল কমিয়ে, ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলাচল করছেন। প্রাপ্তি প্রশ্নে বাংলাদেশের জন্য এটি অবশ্যই নতুনত্ব।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

mostofa71@gmail.com