আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ-পরিস্থিতি 

রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে গুরুত্ব দিন

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০২:২০ এএম

দুর্যোগে কিংবা যেকোনো সংকটে আশ্রয়কেন্দ্র কেবল ঝড়-বৃষ্টি বা বিপদের হাত থেকে বাঁচার জায়গাই নয়, এটি মানুষের মানসিক শক্তি, নিরাপত্তা এবং আশা-শক্তিও। মানবতার প্রতীক মাদার তেরেসা বলেছেন, ‘সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো, যখন কেউ কোনো গৃহহীন-আশ্রয়হীন মানুষের মাথার ওপর ছাদ হয়ে দাঁড়াতে পারে কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারে’। কিন্তু দেশের দুর্যোগে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এই নিরিখে বিপন্ন মানুষের কাছে সত্যিকার অর্থে কতটা নিরাপদ আশ্রয়ের ক্ষেত্র হতে পেরেছে এই প্রশ্ন উঠেছে ১২ জুলাই দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ‘আশ্রয় খুঁজছে আশ্রয়কেন্দ্র’ ও ‘দুর্যোগে আশ্রয়কেন্দ্রে ৭৫ শতাংশ নারী-শিশু নিপীড়নের শিকার’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন দুটি আশ্রয়কেন্দ্রের গুরুত্বকেই শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করেনি,এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংস্কারে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতার চিত্রও তুলে ধরেছে।

একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবকাঠামোয় নানা ত্রুটি দেখা দিয়েছে। দেয়ালে ফাটল, প্লাস্টার ক্ষয়, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, ছাদে পানি জমে থাকায় কেন্দ্রগুলো আশ্রয় গ্রহণকারীদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছে। অকেজো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ অতি জরুরি অনেক কিছুই ভেঙে পড়েছে।দেশের বিভিন্ন  এলাকায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের সবগুলোতেই এমন সমস্যা পেয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তারা তাদের মূল্যায়ন সমীক্ষায় এই তথ্য প্রকাশ করে। অন্যদিকে পুলিশের গবেষণা তথ্যের বরাতে ভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগে আশ্রয়কেন্দ্রে ৭৫ শতাংশ নারী-শিশু নিপীড়নের শিকার। পুলিশের তথ্য সাক্ষ্য বহন করে, নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের ঘাটতির ফলে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তার শঙ্কা আশ্রিতদের তাড়া করে।

আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকারী অসহায় মানুষের কোনো ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না, তাদের একমাত্র পরিচয় হলো তারা মানুষ এবং এই নিরিখে সহাবস্থানের যে বিষয়টি সামনে আসে তা বেদনার মধ্যেও শক্তি-সাহস-মানবিকতার বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। বিপদের সময় নিরাপদ আশ্রয় যেহেতু জীবন বাঁচাতে পারে, সেহেতু যেকোনো আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ কিংবা বসবাসের উপযুক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। দেশে প্রয়োজনের তুলনায় দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আশ্রয়কেন্দ্র এমনিতেই অপ্রতুল; এর মধ্যে যা-ও আছে সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ-সংস্কারে গাফিলতি মেনে নেওয়ার নয়। চলমান প্রাকৃতিক দুর্যোগে নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য স্থাপনাকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এটা নুতন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সবগুলোই সমভাবে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে সব কেন্দ্রেরই দিকেই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সমদৃষ্টি দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

আমরা মনে করি, উপকূলীয় এলাকাসহ যেসব এলাকায় বন্যা বেশি হয় কিংবা দুর্যোগের আশঙ্কা থাকে বেশি এবং ঐসব এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যা অনুপাতে আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যাপারে মনোযোগ বাড়ানো দরকার। কিন্তু অভিযোগ আছে, অতীতে যেসব এলাকায় প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বাড়ি, সেসব এলাকায় বেশিসংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এ বৈষম্য নির্মম অনৈতিক বিবেচনা থেকে সৃষ্ট। বিবেচনাটি রাজনৈতিক, যে রাজনীতিতে মানুষের কল্যাণচিন্তা নেই, আছে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থবোধ, তা কখনোই প্রীতিকর কিংবা হিতকর হতে পারে না। আমরা মনে করি, এর পেছনে মূলত কাজ করেছে ভোট আকর্ষণের বিষয়টি, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের দুরভিসন্ধিমূলক অপব্যবহার বৈ কিছু নয় এবং তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দুর্যোগাক্রান্ত মানুষ বা পরিবারগুলোর আশ্রয়ের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত হবে, এটাই স্বাভাবিক এবং এগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ-সংস্কার-নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আমরা অধিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা, ওই এলাকার জনসংখ্যা, যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিবীক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের তাগিদ দিই। উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাসরত মানুষের সুরক্ষায় বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র গড়ার ওপরও  আমরা গুরুত্বারোপ করি। বিদ্যুৎ, প্রাথমিক চিকিৎসা, নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা চাই। আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য সংযোগ সড়কের বিষয়টিও সময় গুরুত্বে আমলে রাখা প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত