ঋতুদের বাস্তবতা বোঝাল উজবেকিস্তান

পিটার বাটলারের শিষ্যরা সাহসী হয়েছেন। তবে সতর্ক হতে পারেননি। তাই স্বপ্নের খুব কাছে গিয়েও তা ছোঁয়া হলো না ঋতুপর্ণা চাকমাদের। অনেক আশা নিয়ে পার্থের র‌্যাকটেঙ্গুলার স্টেডিয়ামে ওমেন্স এশিয়ান কাপের গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। র‌্যাংকিংয়ে ৬৩ ধাপ এগিয়ে থাকা উজবেকিস্তানকে হারালে খুলে যেত অনেক সম্ভাবনার দুয়ার। তবে অভিষেকেই চমকে দেওয়ার মতো তেমন কিছু করতে পারেনি বাটলারের দল। উল্টো তাদের বাস্তবতা বুঝিয়ে ম্যাচটা উজবেকিস্তান জিতেছে ৪-০ ব্যবধানে। তাতে তৃতীয় সেরা দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে মধ্য এশিয়ার দলটির।

আগের দুই ম্যাচে দুই পরাশক্তি চীন ও উত্তর কোরিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হারলেও এই ম্যাচকে ঘিরে একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে অভিষেক ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চীনকে ঘাম ঝরাতে বাধ্য করে বাংলাদেশের মেয়েরা স্বপ্নটা বাড়িয়েছিল। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের ৯-এ থাকা উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে সব পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছিল। কোরিয়ানদের চাপে ভেঙে পড়লেও উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম আশা। এই ম্যাচ জিতলে এশিয়ান কাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০২৭ ফিফা ওমেন্স বিশ্বকাপ এবং ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক গেমসে খেলার সম্ভাবনা তৈরি হতো। অন্তত নিজেদের গোলের সমীকরণে রাখতে পারত। সেটা হয়নি বাটলারের পরিকল্পনার অর্ধেকটা বাস্তবায়িত হওয়ায়। বাটলার প্রতি ম্যাচের আগেই বলেছেন, ‘মেয়েদের সাহসী হতে হবে। খেলতে হবে আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে। তবে একই সঙ্গে বিনয়ী এবং সতর্ক থাকতে হবে।’ পার্থে মেয়েরা সাহসী হয়েছে ঠিক। তবে সেটাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়েছে। হাই-লাইন ডিফেন্স কৌশলে আরেকবার ধরাশায়ী হতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

বাটলারের ভাবনাটা ইতিবাচক। তবে এখনো এই তত্ত্বে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি বাংলাদেশ। তাই প্রথমার্ধে এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পর যখন সুযোগ ছিল ম্যাচে ফেরার, তখন প্রতিপক্ষে গোলের দরজা খুলতে না পারা বাংলাদেশ উল্টো হজম করে আরও তিন গোল। এশিয়ান কাপের প্রস্তুতিতে এই তত্ত্বে খেলে মালয়েশিয়ার কাছে বাজেভাবে হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। তবে একই কৌশলে খেলে ইউরোপের দল আজারবাইজানের ঘাম ঝরাতে বাধ্য করে তারা। একই তত্ত্বে গত জুলাইয়ে এশিয়ান কাপের বাছাই উতরে ছিল বলেই বাটলার মেয়েদের সাহসী ও আক্রমণাত্মক মন্ত্রে দিক্ষিত করেন। তবে ওই যে সতর্ক ও বিনয়ী হতে যে সামর্থ্যটা প্রয়োজন তারুণ্যনির্ভর ও অনভিজ্ঞ ডিফেন্স সেটা এখনো অর্জন করতে পারেনি। তাই আরেকটা ভরাডুবিতে শেষ হয়েছে স্বপ্নযাত্রা।

শারীরিক গঠনের মতো সামর্থ্যওে উজবেকিস্তান অনেক এগিয়ে বাংলাদেশের থেকে। তাদের বিপক্ষে জয়ের বড় স্বপ্ন নিয়ে নামা বাংলাদেশ একাদশে দুটি পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ। কোরিয়ার বিপক্ষে শুরুর একাদশের দুজন ডিফেন্ডার নবীরন খাতুন ও ফরোয়ার্ড শামসুন্নাহার জুনিয়রের বদলে খেলানো হয় সুইডেনপ্রবাসী মিডফিল্ডার আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী ও অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার শিউলি আজিমকে।

উজবেকিস্তান আক্রমণাত্মক খেলে শুরুতেই বাংলাদেশের প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। দুই উইং দিয়ে আক্রমণ গড়ে তারা। পঞ্চম মিনিটে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বক্সে ঢুকে শট নিয়েছিলেন উজবেক অধিনায়ক লুদমিলা কারাচিক। তবে তার শট আটকে দেন বাংলাদেশ কিপার মিলি আক্তার। পরের মিনিটে বক্স থেকে বের হয়ে এসে দিওরাখন খাবিবুল্লায়েভকে রুখতে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখতে হয় মিলিকে। তবে ১০ মিনিটে খাবিবুল্লায়েভকে থামানো যায়নি। নিলুফার কুদরাতোভার থ্রু পাস পেয়ে বক্সে ঢুকে কোনাকুনি শটে দূরের পোস্ট পৌঁছে দেন উজেবক নম্বর ১০। মিলি ঝাঁপিয়ে বলে গ্লাভস ছোঁয়ালেও পারেননি রুখতে। ৩১ মিনিটে ঋতুপর্ণা উজবেক কিপারের পরীক্ষা নেন আরেকটি বাঁ পায়ের দূরপাল্লার ভয়ংকর শটে। ফিরতি বল উমহেলা মারমা পেয়ে আড়াআড়ি বাড়িয়েছিলেন মারিয়া মান্ডাকে। তার দুর্বল শট পেয়ে বাইসাইকেল কিকে চেষ্টা করেন তহুরা। তবে তা লক্ষ্যে ছিল না। ৪২ মিনিটে ভালো সুযোগ ছিল গোলের। তহুরা বক্সে বল পেয়ে গিয়েছিলেন। নিজে শট না নিয়ে বল একটু পেছনে থাকা আনিকাকে দেন। তবে আনিকার ডান পায়ের শট উজবেক ডিফেন্ডার মাফতুনার শরীরে আঘাত করে কর্নার হয়। সেই কর্নার থেকেই বল পেয়ে মারিয়া বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ডানপায়ের জোড়ালো শট নেন, যা পোস্টে বাতাস লাগিয়ে বাইরে যায়।

ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দিয়ে বিরতিতে গিয়েছিল বাংলাদেশ। শুরুতে সেই চাপটা ধরে রাখতে মরিয়া চেষ্টা করতে গিয়েই সর্বনাশ হয়। ম্যাচের ৬২ মিনিটে বাংলাদেশের হাই-লাইন ডিফেন্সের সুযোগে আক্রমণের জায়গা পেয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করে উজবেকিস্তান। সতীর্থের পাস অফসাইডের ফাঁদ ভেঙে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলমুখে আড়াআড়ি ক্রস বাড়ান উদিমা জইরোভা, নিখুঁত টোকায় গোল করেন দিলদোরা নজিমোভা। চার মিনিট পর নজিমোভা ফের লক্ষ্যভেদ করলে আক্ষরিক অর্থে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ। ৭০ মিনিটে বাংলাদেশের জালে আসালখোন আমিনজনোভা বল জড়ালেও ভিএআর প্রযুক্তিতে গোল বাতিল হয়। ম্যাচের শেষ দিকে নিলুফার গোল করে নিজেদের কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন টিকিয়ে রাখেন। আজ অন্য গ্রুপের দুই ম্যাচ শেষেই জানা যাবে উজবেকদের ভবিষ্যৎ।

অথচ সাহসী হয়ে প্রতিপক্ষের জালের দেখা পাওয়ার পাশাপাশি সতর্ক হওয়াটা আত্মস্থ করলে উজবেকদের জায়গায় আজ আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকত বাংলাদেশ।