আমরা রমজানকে বুঝেশুনে ধারণ করি না

মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন খ্যাতিমান আলেম লেখক ও মুহাদ্দিস। খতিব ও আলোচক হিসেবেও পরিচিত। তার লিখিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। ইসলামের মৌলিক বিষয়াদির পাশাপাশি কথাসাহিত্যে রয়েছে তার অবদান। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি লেখালেখি ও শিক্ষকতায় সক্রিয়। পবিত্র রমজান, জাকাত, ইতেকাফসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন দেশ রূপান্তরের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুদ্দীন সাদী

দেশ রূপান্তর : রমজান মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা প্রভাব ফেলে? এই প্রভাব সারা বছর অক্ষুন্ন থাকে না কেন?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : আমার মনে হয়, রমজান মাসকে প্রভাবের জায়গা থেকে দুই ভাগ করা উচিত। নানা আয়োজনের ভেতর দিয়ে রমজান মাস শহুরে মানুষের জীবনে যতটা প্রভাব ফেলে, গ্রামে ঠিক ততটা ফেলে না। গ্রামের মানুষ এই জায়গাটাতে এখনো সম্ভবত পিছিয়ে। শহরে ব্যাপকভাবেই প্রভাব পড়ে। শহরে শিশুরা পর্যন্ত রোজা রাখে। রমজান মাসে বাংলাদেশের সবগুলো শহরের অবস্থাই বোধহয় এমন যে, কোনো মসজিদ এমন থাকে না, যেটা শুক্রবারে জুমার নামাজে আশপাশের রাস্তাসহ ভরে যায় না। তা ছাড়া রমজানের শুরু ও শেষের দিকে তারাবির একটা উৎসব আমরা লক্ষ করি। তো এই যে মসজিদের সঙ্গে মানুষের বিশাল রকমের একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এর একটা প্রভাব আমরা কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চালচলনসহ সবকিছুর মধ্যেই লক্ষ করি। গ্রামে এই পার্থক্যটা তুলনামূলকভাবে কম। সেটা হয়তো এই কারণেও যে, গ্রামের মানুষের জীবন অতটা গোছানো ও পরিকল্পিত নয় এবং সেখানে মানুষ সম্ভবত চিন্তা কম খরচ করে।

কিন্তু এই প্রভাবটা উপলব্ধিগতভাবে হয় না। বুঝেশুনে ধারণ করে এই পরিবর্তনটা হয় না। একটা সময় তো মানুষের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা কম ছিল, ফলে মানুষের মধ্যে উপলব্ধির জায়গাটা দুর্বল ছিল। এখন নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। একটা সময় মানুষ টেলিভিশন দেখে সময় কাটাত। এখন আর কষ্ট করে টেলিভিশনের সামনে যেতে হয় না। প্রত্যেকের হাতে পঞ্চাশটা করে টেলিভিশন। ফলে দেখা যায়, রমজান মাসে যে একটা পরিবর্তন, এই পরিবর্তনটা যুদ্ধ করে রমজানে কোনো রকম টিকে থাকে। রমজানের পরে এই পরিবর্তনটা থাকে না। আমার মনে হয়, সেই প্রভাব অক্ষুণœ না থাকার কারণ হলো, উপলব্ধির ভেতর দিয়ে পরিবর্তনটা আসে না, পরিবর্তনটা আসে পরিবেশের প্রভাবে।

দেশ রূপান্তর : রোজার দাবি কী? একজন রোজাদারের সারা দিন কীভাবে কাটানো উচিত?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : রোজার দাবিটা কোরআন মাজিদে স্পষ্ট বলা আছে, ‘তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ তাকওয়ার মূল অর্থ হলো আল্লাহতায়ালা মানার জন্য যে বিধিবিধান দিয়েছেন, সেগুলো মানা আর যেগুলো থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা। তাকওয়ার উর্দু তরজমা করা হয় পরহেজগারি। এর কাছাকাছি অর্থ হলো সাবধানতা। শরিয়তের আলোকে নিজেকে সাবধান করে গড়ে তোলা, কখনো যেন অবচেতনভাবেও আমি আল্লাহর কোনো বিধান লঙ্ঘন না করি, এটা হলো রোজার দাবি। রোজাদার সারা দিন শুধু না খেয়ে থাকবে এমন না। তার কথা, কাজ, আচরণসহ সবক্ষেত্রে সে সচেতন থাকবে। সাবধান থাকবে যে, আমি আল্লাহর কোনো হুকুম লঙ্ঘন করছি কি না?

দেশ রূপান্তর : ইতেকাফের গুরুত্ব কতটা? আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ এই ইবাদত থেকে বিমুখ কেন?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : আমি শুরুতেই বলেছি, আমরা রমজানটাকে বুঝেশুনে ধারণ করি না। যদি আমরা বুঝেশুনে ধারণ করতাম, তাহলে আমরা প্রথমেই এটা বুঝতাম যে, রমজানুল মোবারকের গুরুত্বের জায়গটা হলো, এই মাসে একটি রাত আছে, যাকে শবে কদর বলা হয়। যেহেতু এই শবে কদরটা রমজানুল মোবারকে, তাই পুরো রমজানের মূল্য বেড়ে যায়। আর এই রাতের মূল্য কেন বেড়ে গেছে? যেহেতু এই রাতে আল্লাহতায়াল কোরআন নাজিল করেছেন। কোরআন নাজিলের কারণে এই রাতের মূল্য বেড়ে গেছে এবং এই রাতের কারণে বাকি ১১ মাস থেকে এই রমজানের মূল্য বেড়ে গেছে। এটা হলো মূল কথা। এখন কেউ যদি এই মূল কথাটা উপলব্ধি করে, তাহলে রমজানের সামগ্রিক কল্যাণকে কীভাবে তুলে আনতে পারে, তার চেষ্টা করবে। যদি আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনটা দেখি তাহলে দেখব আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত ইতেকাফ করতেন। তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর তার স্ত্রীরা ইতেকাফ করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বদর যুদ্ধের বছর ইতেকাফ করতে পারেননি। পরের বছর তিনি বিশ দিন ইতেকাফ করেন। যে বছর তিনি মৃত্যুবরণ করেন, সে বছর তিনি বিশ দিন ইতেকাফ করেন। অর্থাৎ আল্লাহর রাসুলের একটি নিয়মিত সুন্নাহ হলো ইতেকাফ। কারণ ইতেকাফের ভেতর দিয়েই একজন বান্দা সহজে আল্লাহকে পেতে পারে।

দেশ রূপান্তর : রমজানে জাকাত আদায়ের তাৎপর্য কী? জাকাত কাদের দিলে বেশি উপকৃত হওয়া যাবে?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোন দান সবচেয়ে ভালো। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান মাসে যে দান করা হয় সেটা উত্তম। আর যেহেতু অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান মাসে কেউ একটি ফরজ আদায় করলে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায়ের সমান সাওয়াব পাওয়া যায়। জাকাত যেহেতু একটি ফরজ ইবাদত, তাই যদি কোনো ব্যক্তি রমজান মাসে জাকাত আদায় করে, তাহলে সে সত্তরটা জাকাত আদায়ের নেকি পাবে। এই কারণেই মানুষ বিপুল পরিমাণে এই মাসে জাকাত আদায় করার চেষ্টা করে।

জাকাত কাকে দেওয়া উত্তম। মূলত এখানে দুটো জায়গা। কোরআন মাজিদের মধ্যে জাকাতের যে খাতগুলো বলা হয়েছে, তার যে কোনো খাতেই জাকাত দিলে জাকাত আদায় হয়ে যাবে। কিছু কিছু খাত এমন আছে, যে খাতগুলোতে দিলে অতিরিক্ত নেকি পাওয়া যায়। যেমন রমজান মাসে দিলে অতিরিক্ত নেকি পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে কেউ যদি তার গরিব আত্মীয়-স্বজনকে দেয়, তাহলে সে জাকাত আদায়ের নেকি পাবে, সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার নেকি পাবে। যদি কোনো ব্যক্তি দ্বীনি এমন প্রতিষ্ঠানে দেয়, যেখানে জাকাতের হকদারদের জন্য ব্যয় করা হয়, তাহলে ওই ব্যক্তি জাকাত আদায় করার নেকি তো পাবেই, সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনি ইলেম জিন্দা করা, যেটা ছাড়া ইসলাম টিকে থাকবে না, ইসলাম জিন্দা করার নেকিও সে পাবে।

দেশ রূপান্তর : আকাবির মনীষীরা রমজান কীভাবে কাটাতেন? সংক্ষেপে বলবেন কী?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : আকাবির মনীষীদের বিষয়টা যদি আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে দেখি, যেহেতু সেটাই আমাদের শেকড়, তাহলে সেখান থেকে আজ পর্যন্ত আমরা একটা জিনিস পাব। তিনি নবী ছিলেন, শ্রেষ্ঠ স্বামী ছিলেন, শ্রেষ্ঠ বাবা ছিলেন, আবার একই সঙ্গে এক বিশাল রাষ্ট্রের তিনি প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান। এর ভেতরেও রমজানুল মোবারক এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবাদতের মধ্যে ডুবে যেতেন। ভারত উপমহাদেশের অধিবাসী হিসেবে বলি, ওলামায়ে দেওবন্দ, যারা আমাদের কাছাকাছি আকাবির, সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিকসহ যত ব্যস্ততাই থাকুক, তারা রমজানের আগে সব কাজকর্ম গুটিয়ে রমজানকে সামনে রেখে ইবাদতের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা করবার চেষ্টা করেন। ছোট্ট একটি উদাহরণ আমরা নিতে পারি। হজরত মাওলানা সাইয়েদ আসআদ মাদানি (রহ.) ভারতের পঁচিশ বা পঁয়ত্রিশ কোটি মুসলমানের অভিভাবক, আবার একই সঙ্গে তিনি সারা পৃথিবী চষে বেড়াতেন মুসলমানদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করার জন্য। কিন্তু সেই মানুষটাকেও দেখা গেছে, যখন রমজান আসবে তখন কোন রমজান কোন দেশে কাটাবেন এবং একটা মসজিদ আগেই নির্ধারণ করতেন। তিনি এবং তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মানুষ ইতেকাফ করত, রোজা রাখত, তারাবি পড়ত, তাহাজ্জুদ পড়ত। পুরোটা রমজান শুধুমাত্র জিকির-আজকার ও ইবাদত বন্দেগিতে কাটাত। এটা একটা অস্বাভাবিক বিষয়। এই রকমের ব্যস্ত মানুষরাও রমজান মাস এলে তাদের সব রুটিন ভেঙেচুরে আল্লাহমুখী হয়ে যেতেন।

দেশ রূপান্তর : গণমাধ্যমে রমজানের যে আলোচনা হয় তা কতটা ফলপ্রসূ? আলোচনাগুলো আরও ফলপ্রসূ করার উপায় কী বলে আপনি মনে করেন?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : গত পনের-বিশ বছর যাবৎ রমজান এবং ইসলামের নানা রকমের বিষয় বাংলাদেশে যে মাত্রায় চর্চা হয়, গণমাধ্যমে সেই মাত্রায় উঠে আসে। এটা খুবই আনন্দের দিক। আরও আনন্দের দিক হলো, এই কাজগুলো যারা করছেন তারা আমাদের তরুণ আলেম। কাজগুলো সুন্দর হচ্ছে এবং এর ভেতর দিয়ে একটা ইতিবাচক পরিবেশও তৈরি হচ্ছে। আমাদের ধারণা, এই জায়গাতে যারা গণমাধ্যমের মালিক, যারা এর চালক ও তত্ত্বাবধায়ক, তারা যদি এক্ষেত্রে আরেকটু উৎসাহী ও যত্নবান হন তাহলে চিন্তা, আমল, কী করা, কী না করা, এসবের পাশাপাশি সমগ্র দেশকে তুলে আনা যায়। গ্রামে এখনো মানুষ কীভাবে ইফতার করছে, কীভাবে মানুষ তারাবি পড়ছে এবং মানুষ কী কী সুবিধার ভেতরে আছে, কী কী অসুবিধার ভেতরে আছে, যারা অসুবিধায় আছে তারা কতটা কষ্টের ভেতর দিয়ে রমজান পালন করছে। এভাবে যদি সারা দেশের সামগ্রিক চিন্তাগুলোকে তুলে আনা হতো, তাহলে এর ভেতর দিয়ে মানুষের চেতনা আরও শানিত হতো। মানুষ চিন্তার আরও জায়গা পেত এবং রমজান মাসটা আরও অর্থবহ কীভাবে করা যায়, এ বিষয়টা ভাবার জন্য আমাদের সমাজের সচেতন মানুষরা এখান থেকে খোরাক পেত।

দেশ রূপান্তর : রমজানের কোন শিক্ষাগুলোর প্রতিফলন প্রতিটি মুসলিমের জীবনে থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন : রমজানের ভেতর দিয়ে আমরা মূলত দুটো জিনিস পাই। একটা হলো তাকওয়া। একটা মানুষ পরিপূর্ণভাবে আল্লাহকে মানার, মানার ভেতর দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার। একই সঙ্গে রমজানুল মোবারকের এই মাসকে সমবেদনার মাস বলা হয়। অর্থাৎ আমি ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় যে কাতর হচ্ছি, এর ভেতর দিয়ে সারা বছর যারা ক্ষুধায় কষ্ট করে, যাদের জীবন যাপনের জন্য যথাযথ উপকরণের ব্যবস্থা নেই, আমরা যে তাদের কষ্ট উপলব্ধি করলাম, এই উপলব্ধিটার চর্চা যদি বছরব্যাপী হয়, আমাদের দেশে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম মানুষের মধ্যে যদি ব্যাপকভাবে এই চর্চাটাকে ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং সেটাকে যদি আমরা সারা বছর ধরে রাখতে পারি, তাহলে আমাদের বাংলাদেশে গরিব মানুষ থাকার কথা না।