শিশুর নিরাপত্তা মাদ্রাসার অন্যতম দায়িত্ব

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২১ এএম

বাবা-মা কলিজার টুকরা শিশুসন্তানকে হাফেজ-আলেম বানাতে আমানত হিসেবে মাদ্রাসায় দেন। তাই শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মাদ্রাসার অন্যতম প্রধান ও প্রথম দায়িত্ব। সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সুসংগঠিত ব্যবস্থা থাকার পরও কখনো দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একজনের অপরাধে পুরো মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে দোষী করা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে অপরাধ চাপা দেওয়াও অন্যায়। এক্ষেত্রে সত্য উদঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিচার এবং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সন্তান বাবা-মায়ের কাছে কোটি টাকার চেয়েও বেশি মূল্যবান। ব্যাংকে টাকা সংরক্ষণের জন্য যে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিকল্পনা থাকে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও কার্যকর হওয়া উচিত। এই কথার সঙ্গে কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়।

ধরুন, একটি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার কারণে একজন রোগী মারা গেল। তখন কি আমরা বলি সব ডাক্তার খারাপ? হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন? আবার কি আমরা বলি, একজন ডাক্তার ভুল করেছে, তাই এ নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না?

কোনোটিই আমরা বলি না। আমরা চাই সত্য উদঘাটিত হোক। আমরা চাই দায়ীদের বিচার হোক। আবার আমরা চাই প্রতিষ্ঠানটি তার প্রয়োজনীয় সেবা চালিয়ে যাক।

শিশুরা সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণি। তাই শিশুদের শিক্ষা শুধু নিশ্চিত করলেই হবে না, তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সহিহ বুখারি)

একটি শিশু ঝুঁকিতে থাকে, কারণ সে দুর্বল। সে বড়দের মতো নিজের অধিকার আদায় করতে পারে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, অনেক কিছু বুঝতে পারে না, ভয় পায়, লজ্জা পায় এবং অনেক সময় সে ভাষাও খুঁজে পায় না নিজের কষ্ট প্রকাশ করার জন্য। এমনকি অনেক শিশু জানেই না, তার সঙ্গে যা ঘটছে সেটি অন্যায়, সেটি অপরাধ। এই কারণেই শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।

একটি বাস্তব চিত্র কল্পনা করুন। একটি আট বছরের শিশু। বাবা বিদেশে। মা গ্রামে। সে একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকে। মাসে একবার বা দুই মাসে একবার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। তার চারপাশে সবাই তার চেয়ে বয়সে বড়, শক্তিতে বড়, ক্ষমতায় বড়।

এখন তার ওপর যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি চাপ সৃষ্টি করে, ভয় দেখায়, হুমকি দেয় কিংবা তাকে কষ্ট দেয় তাহলে সে কোথায় যাবে? কার কাছে বলবে? কে তার কথা বিশ্বাস করবে? কে তার পাশে দাঁড়াবে? এটাই মূল প্রশ্ন।

ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুদের সুরক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক বা সামাজিক বিষয় নয়। এটি ইমান, আমানত ও জবাবদিহিতার বিষয়। প্রতিটি শিশু তার শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে একটি আমানত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা ৫৮)

একটি শিশু আমানত। আর এতিম শিশু দ্বিগুণ আমানত। হিফজুল কোরআনের একজন ছাত্র আরও বড় আমানত। কারণ তার বাবা-মা শুধু সন্তানকে নয়, নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটিকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।

জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেই হবে। ইসলাম কখনো জুলুমকে আশ্রয় দেয় না। জালেমের পক্ষ নেওয়াকে সমর্থন করে না। অন্যায় চাপা দেওয়াকে সমর্থন করে না। কখনো কখনো মানুষ মনে করে, অপরাধীকে আড়াল করা মানে প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা। বাস্তবে এটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা নয়, বরং জুলুমকে রক্ষা করা।

অপরাধীকে বাঁচানো মানে ভবিষ্যতের আরও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই ইসলামের শিক্ষা হলো, অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে। অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। সত্য উদঘাটনের পথ খুলে দিতে হবে। অপরাধী প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আর নির্দোষ প্রমাণিত হলে তার সঙ্গে ন্যায়বিচার করতে হবে।

কারণ ইসলাম ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর অন্ধ পক্ষপাতিত্ব শেখায় না। ইসলাম শেখায় ন্যায়বিচার। আর ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত হলো, দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কোথায় সংস্কার দরকার? কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রতিবাদ করলেই হবে না। আমাদের দেখতে হবে কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন। কোথায় সংস্কার প্রয়োজন। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তা কেবল ভালো নিয়তের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এর জন্য পরিকল্পনা, নীতিমালা ও জবাবদিহি দরকার। কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হলো।

শিক্ষক নিয়োগে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি : আমরা সাধারণত শিক্ষক নিয়োগের সময় কিতাবি যোগ্যতা দেখি। এটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট নয়। একজন মানুষ ভালো ছাত্র হতে পারেন, কিন্তু ভালো শিক্ষক নাও হতে পারেন। শিশুদের শিক্ষক হওয়ার জন্য বিশেষ কিছু বিষয় জরুরি। তার চরিত্র কেমন? তার পূর্ব ইতিহাস কী? তিনি কতটা আমানতদার? তিনি শিশুদের সঙ্গে আচরণ করতে জানেন কি? তিনি কি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? তিনি কি শিশুদের মানসিক জগৎ বোঝেন? এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশিক্ষণের প্রয়োজন : আমরা অনেক সময় ধরে নিই, একজন মানুষ দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করলেই তিনি শিশুদের নিয়ে কাজ করার জন্য প্রস্তুত। বাস্তবতা সবসময় এমন নয়। অনেক ভালো, সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষও জানেন না কোন আচরণ সীমালঙ্ঘন। কোন আচরণ শিশুর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কোন পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই শিশু সুরক্ষা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দরকার।

শুধু অপরাধীদের ঠেকানোর জন্য নয়, বরং ভালো মানুষদেরও সচেতন করার জন্য। যাতে সবাই জানেন কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোন আচরণ অনুচিত আর কোন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা উচিত।

অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা : একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একটি শিশু যদি সমস্যায় পড়ে, তাহলে সে কার কাছে যাবে? কাকে বলবে? কীভাবে বলবে? তার কথা কে শুনবে? অভিযোগ করার পর কী হবে?

এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে থাকা দরকার। একটি শিশু যেন জানে তার কথা শোনার মানুষ আছে। তার অভিযোগ গুরুত্ব পাবে। সে অভিযোগ করলে তাকে দোষী বানানো হবে না। বরং তাকে নিরাপদ রাখা হবে। যে প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পথ নেই, সেখানে অনেক সমস্যা অদৃশ্য থেকে যায়।

অভিভাবকের দায়িত্ব : অনেক অভিভাবক মনে করেন, মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছি, এখন দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের। মূলত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করার পর অভিভাবকের আসল দায়িত্ব শুরু হয়। একজন সন্তানের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় তার পরিবার। তাই সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে হবে। শুধু পড়াশোনার খবর নয়। তার মন কেমন আছে, সেটাও জানতে হবে। সে খুশি কিনা, সেটাও জানতে হবে। সে কোনো ভয় বা চাপের মধ্যে আছে কিনা, সেটাও জানতে হবে। অনেক সময় সন্তান সরাসরি কিছু বলতে পারে না। কিন্তু তার আচরণ অনেক কিছু বলে দেয়। হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া, কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে না চাওয়া, আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ভয় বা অস্থিরতা, এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সন্তানের ভাষা সবসময় মুখে প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো তার নীরবতাই সবচেয়ে বড় বার্তা হয়ে ওঠে। আর একজন সচেতন মা-বাবা সেই নীরবতার ভাষাও পড়তে শেখেন।

আমরা এমন মাদ্রাসা চাই, যেখানে কোরআনের শিক্ষার সঙ্গে শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভালোবাসা ও আমানতের হেফাজত নিশ্চিত হবে। যেখানে সত্য গোপন নয়, অন্যায়ের সংশোধন হবে। ভবন বা ফলাফলের চেয়ে মানুষের আস্থাই হবে প্রতিষ্ঠানের শক্তি। প্রতিটি শিশু যেন সেখানে শিক্ষা, আদব, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা পায়।

লেখক : মুদাররিস, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, ঢাকা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত