মোবাইল আসক্তি ইবাদতে বড় বাধা

মসজিদে নববির জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. হুসাইন আলে শায়খ মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বন এবং রমজানের শেষ ১০ দিনের ফজিলত কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সময়ের অন্যতম মহিমা হলো শবে কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। তাই মুমিনদের উচিত, এ রাতের ইবাদতে সচেষ্ট হওয়া, তওবা করা এবং নেক আমলে অগ্রসর হওয়া। মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যস্ততা ইবাদতের লক্ষ্যকে ব্যাহত করে বলে তিনি সতর্ক করেন।

শায়খ বলেন, হে মানুষেরা! আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন, তিনি আপনাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, আপনাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং আপনাদের প্রতিদানকে বাড়িয়ে দেবেন। যে ব্যক্তি মহান আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার পাপসমূহ মোচন করেন এবং তাকে বড় পুরস্কার দান করেন।

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহর মহান নেয়ামতসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি আপনানাদের রমজানের শেষ ১০ দিন পাওয়ার তওফিক দিয়েছেন, যার ফজিলত ও ইবাদতের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে বিভিন্ন সুস্পষ্ট দলিল বর্ণিত হয়েছে। রমজানের শেষ ১০ দিনে এমন সব রাত রয়েছে, যেগুলোর একটিকে মহান আল্লাহ কদরের রাত দ্বারা সম্মানিত করেছেন, যা অত্যন্ত মহিমান্বিত ও ফজিলতপূর্ণ।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা কদরে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি কদরের রাতে নাজিল করেছি। আর আপনি কি জানেন কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।’ (সুরা কদর)

এই কারণে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ ১০ দিনে যে পরিমাণ ইবাদত করতেন, তা অন্য কোনো সময়ে করতেন না। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, যখন রমজানের শেষ ১০ দিন আসত, তখন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন, তার পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং শক্তভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ইবাদতে মশগুল হতেন।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ ১০ রাতে কদরের রাত তালাশ করো।’ অন্য বর্ণনায় আছে, ‘তোমরা তা শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতে তালাশ করো।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কদরের রাতের সন্ধানে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! এই লাভের সময় এবং সফলতার সুযোগসমূহকে কাজে লাগান। এই মহিমান্বিত মৌসুম সীমিত সময়ের জন্য, তাই মাসের বাকি সময়টুকুর সদ্ব্যবহার করুন এবং কল্যাণ অর্জন ও নেক আমল হাসিলের মাধ্যমে সফল হতে সচেষ্ট হোন। হে মুসলিমরা! নিশ্চয়ই আমাদের রব মহান ও দয়ালু। যে তার হেদায়েতের আলো পেতে চায়, তিনি তাকে পথ দেখান। যে তার অভিমুখী হয়, তিনি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। যে তার দরজায় আশ্রয় নেয়, তিনি তাকে আশ্রয় দেন। আর যে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তিনি তাকেও আহ্বান করেন।

সুতরাং কল্যাণ অর্জনে সচেষ্ট হোন এবং নেক আমলের দিকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অগ্রসর হোন। পৃথিবী ও আকাশের রবের কাছে তওবা করুন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়াবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’

হে আমার মুসলিম ভাই! তাই মুত্তাকি ও পুণ্যবানদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ময়দানে শামিল হোন। এটি পুণ্যবানদের লাভের ক্ষেত্র, পরকালের জন্য ফসল ফলানোর সুযোগ এবং সেই সফরের পাথেয় সংগ্রহের জায়গা, যে সফর অন্য কোনো সফরের মতো নয়।

আক্ষেপ সেই ব্যক্তির জন্য, যে গাফিলতি ও অবহেলার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করল! আর সেই ব্যক্তির জন্য দুর্ভাগ্য, যে এই ফজিলত ও ঐশী নেয়ামতগুলো নষ্ট করল! একদিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরে আরোহণের সময় বললেন, আমিন। সাহাবিরা এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, জিবরাইল (আ.) আমার কাছে এসে বললেন, সেই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমজান পেল অথচ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না (অর্থাৎ গুনাহ মাফ করাতে পারল না)। আপনি বলুন আমিন। তখন আমি বললাম আমিন।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, রমজান মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে মূলত সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। অন্য বর্ণনায় আছে, হতভাগ্য ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয় না।

হে উচ্চাকাক্সক্ষী ও মহৎ লক্ষ্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা! এই রাতগুলোর অগণিত ফজিলত ও অফুরন্ত সম্মান অর্জনে সচেষ্ট হোন। যে ব্যক্তি জানে সে কী খুঁজছে, তার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার সহজ হয়ে যায়। আপনারা আপনাদের রবের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে ধাবিত হোন, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। হে আল্লাহ! আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের আপনি কদরের রাত পাওয়ার তওফিক দিয়েছেন এবং যারা মহান পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। হে মুসলিমরা! রমজান হলো আল্লাহর নৈকট্য ও ইবাদতের মাস। তাই ইবাদতকারীর জন্য এটা বাঞ্ছনীয় যে, সে যেন মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত থেকে নামাজ ও রোজার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত না হয়। এসবের আসক্তি ইবাদতের পথে বড় বাধা। ইবাদতের স্থানে এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকা শরিয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। মসজিদ তো কেবল নামাজ, জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। হে মুসলিমরা! আল্লাহকে ভয় করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মগ্ন থাকা ইবাদতের মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে অন্তরায়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।’ (সুরা হজ ৩২)

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে আরও বলেছেন, ‘আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের নুর। তার নুরের উপমা একটি তাকের মতোই। তাতে রয়েছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি রয়েছে একটি চিমনির মধ্যে। চিমনিটি উজ্জ্বল তারকার মতোই। প্রদীপটি বরকতময় যাইতুন গাছের তেল দ্বারা জ্বালানো হয়, যা পূর্ব দিকেরও নয় এবং পশ্চিম দিকেরও নয়। এর তেল যেন আলো বিকিরণ করে, যদিও তাতে আগুন স্পর্শ না করে। নুরের ওপর নুর। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত করেন তার নুরের দিকে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমাসমূহ উপস্থাপন করেন। আল্লাহ প্রতিটি বস্তু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। (এ রকম আলো জ্বালানো হয়) সেসব গৃহে (অর্থাৎ মাসজিদে), যেগুলোকে সমুন্নত রাখতে এবং তাতে তার নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলোতে তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হয় সকাল ও সন্ধ্যায় (বারবার)।’ (সুরা নুর ৩৫-৩৬)

হে আল্লাহ, মুসলিম দেশগুলোকে সব অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন। আমরা আপনার কাছে আমাদের দেশ এবং মুসলিম দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তা ও স্থায়ী শান্তি প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! পাপাচারীদের অনিষ্ট, দুষ্টদের ষড়যন্ত্র এবং রাত-দিনের বিপদ-আপদ থেকে আমাদের রক্ষা করুন।

হে আল্লাহ! মুসলিমদের সত্য ও হেদায়েতের ওপর ঐক্যবদ্ধ করুন। তাদের কাতারকে সুসংহত করুন এবং তাদের শক্তি বৃদ্ধি করুন। হে আল্লাহ! আপনি সব মুসলিম শাসককে তাদের নাগরিকদের কল্যাণে কাজ করার তওফিক দিন।

হে আল্লাহ! আমাদের জন্য বৃষ্টি দান করুন, হে অভাবমুক্ত, হে প্রশংসিত, আপনি আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আমাদের এবং মুসলিম জনপদগুলোকে সিক্ত করুন। হে আল্লাহ, আপনার বান্দা ও রাসুল আমাদের নবীজি মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

৬ মার্চ শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান