দেশহীন মানুষের লড়াইয়ের কথকতা

কার্পাসমহল সত্য, মঙ্গল ও সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত সমাজ-জীবনের ত্রমজ শিল্পের লেলিহান ইতিহাস। পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত পাহাড়িদের অস্তিত্বসংকট, দুর্দশা, লড়াইয়ের এমন শৈল্পিক নির্মাণ বাংলা সাহিত্যে হয়নি। আদিবাসীদের দুর্দশা ও প্রান্তিকীকরণের মূল সূচনা মূলত ঔপনিবেশিক আমল (ব্রিটিশ শাসন) থেকে। এ সময়ে তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকার হরণ, বন আইন প্রয়োগ এবং বহিরাগতদের প্রবেশের কারণে আদিবাসীরা নিজ ভূমিতে ভূমিহীন হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে কাপ্তাই লেকের মতো আধুনিক উন্নয়ন প্রকল্প, বাঙালিদের পুনর্বাসন, বনভূমি ধ্বংস এবং রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞায়নে তাদের পরিচয় সংকটের কারণে দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার এবং দাতা সংস্থা ইউএসএইডের সহায়তায় শুরু হয় কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে একটি সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও উচ্চতায় বিশাল এই বাঁধ নির্মাণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বিরাট সমস্যা, বিরাট মানবিক বিপর্যয়। বাঙালির প্রমোদ ভ্রমণের স্থানটি ‘চুয়ান্ন হাজার একর ফসলি জমি ও এক হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা গিলে খেয়ে শুধু নীল কেন, রোদজ্বলা আকাশে রামধনুর সাতরঙা জাদু ফোটালেও লেকটা বাস্তব।’ কাপ্তাই লেক নির্মাণে প্রায় এক লাখ মানুষকে তাদের আবাসভূমি, ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। বাঁধ নির্মাণের সময় আদিবাসীদের মতামতের তোয়াক্কা করেনি পাকিস্তান সরকার। বিশাল এই কর্মযজ্ঞের পরে পুনর্বাসনের জন্য নেওয়া পুরো ব্যবস্থাটিই ছিল ত্রুটিপূর্ণ ও অসন্তোষজনক। ফিলিস্তিনের বাস্তুহারা মুসলিমের মতো, দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া হিন্দুদের মতো তিরুতমা চাকমারা বয়ে নিয়ে বেড়ায় বংশপরম্পরায় বাস করা ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা, প্রতিবেশী হারানোর ক্ষত, স্বজন হারানোর হাহাকার। পরিমচান, গোপীচান, সুবলচান, অরুণা, করুণাদের জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ভিটেমাটি ছেড়ে দূরে দুর্গম পাহাড়ে গিয়ে ওঠে তারা, সেখানে সুবিধা করতে না পেরে ভারতে যায়, সেখানেও চরম দুরবস্থার সম্মুখীন হয়। তবু বাঁচতে হবে। একদিকে ভালোভাবে বাঁচার আশা, অন্যদিকে দেশের প্রতি টান। গোপীচান আর পরিমচান জনমের মতো আলাদা হয়ে যায়। পরিমচানের ছেলেদের উজ্জ্বল জীবন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ভারতের এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীপ্রীতি দেশভাগের সময় ছিল না! নেতাদের স্বার্থপরতা, উচ্চাকাক্সক্ষার কাছে তাদের মতো মানুষ মশা-মাছির সমান। সমতলের দিকে তাকালে মনে হয় তারা ঈশ্বরের অভিশপ্ত সন্তান। দেশে দেশে তাদের কোনো নিজস্ব দেশ নেই। এ ছাড়া দেশভাগের সময় পাহাড়িরা চায় ভারতের অংশ হতে। পরিমচান মানসচক্ষু দেখতে পায়, রাঙামাটি ডিসি অফিসের সামনে উড্ডীন ভারতীয় পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই পাহাড়ি নেতাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি শেখ মুজিব মেনে নেননি। রাষ্ট্র বরং তাদের বাঙালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এসব কারণে আদিবাসীদের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষোভ, বেদনা, অসন্তোষ এবং শান্তিবাহিনী নাম দিয়ে শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রাম। মানবেন্দ্র লারমা, সন্তু লারমার আন্দোলনে ঘৃতদান করেন কল্পনা চাকমারা, বিনিতা চাকমারা আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে চায়, পূর্ণতা আনতে চায়। এখানে জীবন তুচ্ছ, শখ-আহ্লাদ বিলাসিতা, মৃত্যু আরাধ্য জেনেও। ‘গতবার ঢাকায় পল্টনে র‌্যালিতে আনসার-পুলিশ মিলে পিটিয়েছিল। লাঠির বাড়ি আমার পিঠেও পড়েছিল।’ উপন্যাসে বিনিতার এই সংগ্রামে যুক্ত হয়েছে আরও শিক্ষিত আদিবাসী ছেলেমেয়ে, সচেতন ও মঙ্গলকামী বাঙালি সংগঠন। আবার এদের মধ্যেই আছে সুবিধাবাদী, শিকড়ভোলা চাকুরে পাহাড়ি কিংবা এনজিও অ্যাকটিভিস্ট।

বাঙালিরা আদিবাসীদের মানুষ ভাবে না। তারা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাদের উপজাতি নাম দেওয়া হয়। মানে তারা জাতি হওয়ার উপযুক্ত নয়। তাদের ভাষাকে খেয়ে ফেলার জন্য মরিয়া রাষ্ট্র। পাহাড়ে ধর্মান্তর করার সব রকমের কৌশল চলমান এবং সার্থক। সাজেকের পাহাড়চূড়ায় সুরম্য মসজিদ তার প্রমাণ। সেনাবাহিনীতে গিজগিজ করছে সর্বত্র। পাহাড়ি মেয়েদের ধর্ষণ, বর্ণবাদী নিপীড়ন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দোকানে আগুন দিয়ে, লুটপাট করে তাদের উত্তেজিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে শায়েস্তা করার কৌশল বহু পুরনো। রাষ্ট্রযন্ত্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে আয়ত্তে রাখতে বাঙালিদের পুনর্বাসন এবং একটা পর্যায়ে পরস্পরের শত্রুতে রূপান্তর ঘটানো, শান্তিচুক্তির স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো বলবৎ না করে সামাজিক বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে রাজনৈতিক আখ্যা দেওয়া শুরু হয়। জুলাই আন্দোলনে সুযোগ পেয়ে মেট্রোরেলের পিলারে গ্রাফিতিতে হাজির হয় কল্পনা চাকমা। ৩১ বছর আগে তাকে সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। আর ফেরেনি সে ঘরে। পাহাড়িদের কত সৌভাগ্য জমা হলে একজন কল্পনা চাকমা জন্মায়! তাদের উৎসব, ভাষা, ঐতিহ্য হুমকির মুখে, চারদিকে কেবল রাষ্ট্রের চোখ রাঙানি। তাদের কথা একটাই, পাহাড় থেকে সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার করা হোক। বাঙালিদের বহিষ্কার করা হোক। কিন্তু কয়েক পুরুষ ধরে পাহাড়ে বাস করা বাঙালিরা কি বহিরাগত? সব পাহাড়ি কি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছিল? না। কুকি-চিন নামক সন্ত্রাসীরা পাহাড় অস্থিতিশীল করতে চায়। অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বিভেদ পাহাড়ের নিত্যসঙ্গী। নেতা নেই, কিছু সুবিধাভোগী পাহাড়ি পুঁজিপতি বাঙালি ও মিলিটারির সঙ্গে মিশে সর্বনাশ করে দিচ্ছে। মুখোশধারী সেটেলার, বিদেশি ষড়যন্ত্র আর অভ্যন্তরীণ নিপীড়নের দ্বারা সবুজাভ মানুষের অঙ্গহানি করার যে ইতিহাস তা বহুজনের আক্রান্ত নীরবতা আর আক্রমণাত্মক মিথ্যাচারে বিকৃত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শায়লা ও শাহরিয়ার পাহাড় নিয়ে আগ্রহী, সহৃদয় জুটি। তারা পাহাড়ের দুর্দশা, লড়াইকে সেলুলয়েডে বন্দি করে তামাম মানুষকে দেখাতে চায়। সেখানে স্বার্থপরতা নেই, দুরভিসন্ধি বাসনা নেই। ‘শাহরিয়ার অন্যদের থেকে আলাদা মনে হয়, অন্তত তার স্বভাবে ধূর্তামি নেই এ নিয়ে শায়লা নিঃসন্দেহ।’ বরুণ চরিত্রটি প্রেমময়তায়, গভীর ব্যঞ্জনায় উর্বর। সে বিনিতাকে ভালোবাসে, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। পরিমচান, করুণা, অরুণা, গোপীচান চরিত্ররা একেকটা জমাটবদ্ধ দুঃখের মতো, টনটনে ফোড়ার মতো তাদের বেঁচে থাকা। বিশু চরিত্রের এমন টান উপন্যাসের অলংকার বলা যায়। আর ফরহাদরা যেন আবহমান বাঙালি যারা আদিবাসীদের মানুষ মনে করে না, তাদের ন্যূনতম অধিকার দিতেও নারাজ, তাদের নিয়ে কাজ করা মানুষগুলো উন্মাদের মতো। তবে উপন্যাসের গভীর চরিত্র হলো তিরুতমা চাকমা। সে একাই যেন কাপ্তাই লেকের মর্মান্তিক ইতিহাস, লেকপূর্ব রাঙামাটির ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। আর আদিবাসীদের হৃত গৌরব, প্রাপ্য ও ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে বিনিতা চাকমা চরিত্রের গভীরতা ও দীপ্তিময়তা তাক লাগানিয়া। সহৃদয় পাঠকের মনে হবে, বিনিতা মালিবাগ, শান্তিনগর কিংবা আজিমপুরের রাস্তায় চলাচল করা মেয়ে, হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে, তার সঙ্গে আলাপ করার উদগ্র বাসনাও জন্মাবে। সিতারা চরিত্রের একাকিত্ব, যন্ত্রণা, সংবেদনশীলতার মিশেল নজরকাড়া। মোট কথা, আদিবাসীদের নিজেদের মতো বেঁচে থাকার লড়াইয়ের নাম কার্পাসমহল।

উপন্যাসের সর্বত্র মায়া ছড়ানো, শব্দে বাক্যে চরিত্রে চরিত্রে। পার্বত্য এলাকা বিষয় হলেও এখানে সবুজের চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ও মূলোৎপাটনের আতঙ্ক বেশি। উপন্যাসের নির্মাণ কৌশল সুন্দর। আলো-আঁধারি সান্ধ্য রহস্য নেই, সবটাই স্পষ্ট। পাহাড় এখানে নায়ক, গভীরতায় ও মুখরতায়। চরিত্রের অদম্য গতি, পরিমিতিবোধ, কল্পনার শক্তি ও ভাষার স্বচ্ছতা উপন্যাসের প্রাণ। দৃশ্য ও ঘটনার বর্ণনা সাদামাটা, স্পর্শকাতর বিষয় গা ছাড়া, পরিবেশ ও পরিস্থিতি কম দৃষ্টিগ্রাহ্য হলেও প্রেম, অনুভূতি ও যুক্তিবিচারের সমন্বয় লক্ষণীয়। স্বৈরাচার রাষ্ট্রের মুখোশ উন্মোচন, বক্ষনির্ভর না হয়ে বুদ্ধিনির্ভরতায় ভর করে জীবনবোধের প্রাচুর্যকে ধারণ, অধিকারহীন মানুষের পক্ষে কথা বলার সৎসাহসে উপন্যাসটি ঝকঝকে সোনা। জীবনের উত্তেজিত দর্শক, উপস্থাপক ও ভাষ্যকার হিসেবে ওয়াসী আহমেদ সার্থক এবং স্থান, ব্যাপ্তি ও আখ্যান আত্তীকরণে কার্পাসমহল মহাকাব্যিক।