বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্ত, নির্ণয় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি জাতীয় চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি করা হয়েছে। এই চিকিৎসা প্রটোকলটি দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কিডনি রোগ শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুণগত নির্দেশনা দেবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্ব কিডনি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ (এনসিডিসি) একটি অবহিতকরণ সভার এই প্রটোকলটি প্রকাশ করে। এটি বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সায়েন্টিফিক ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ ও আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে তৈরি করেছে।
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি প্রথমদিকে ধরা পড়ে না এবং রোগের অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর শনাক্ত হয়। প্রিভিল্যান্স অব ক্রোনিক কিডনি ডিজিজ ইন বাংলাদেশ : অ্যা সিস্টেমেটিক রিভিউ অ্যান্ড মেটা এনালাইসিস, শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় প্রতি চারজনের মধ্যে একজন কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত, যা বৈশ্বিক গড়ের হার থেকে বেশি। প্রতিবছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষ কিডনি বিকল হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে, যা দেশের সীমিত ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন সুবিধার ওপর বড় চাপ বাড়াচ্ছে।
নতুন এই প্রটোকলের লক্ষ্য হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মধ্যেই কিডনি রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা যুক্ত করা। এই ব্যবস্থায় কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি) কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের প্রাথমিক পরীক্ষা করবেন এবং সন্দেহজনক রোগীদের রেফার করবেন। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকরা নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করে রোগ নির্ণয়, ঝুঁকি নির্ধারণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা করবেন। এই প্রটোকল ধাপে ধাপে সারা দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চালু করা হবে। এর জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. শেখ সাইদুল হক বলেন, ‘এই প্রটোকলটি বাংলাদেশে কিডনি রোগ মোকাবিলার পদ্ধতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই প্রটোকলটির মাধ্যমে কমিউনিটি ও উপজেলাপর্যায়ে আগাম শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে আমরা হাজার হাজার মানুষকে কিডনি রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো থেকে রক্ষা করতে পারব।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং নন-কমিউনিকেবল কন্ট্রোল বিভাগের সাবেক লাইন ডিরেক্টর প্রফেসর ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন (ওএসডি) বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা ইঙ্গিত করে যে আমরা রোগটি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। তাই স্ক্রিনিং ও রোগ নির্ণয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
আইসিডিডিআর,বি সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডা. আলিয়া নাহিদ বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে আগাম হস্তক্ষেপ রোগে মৃত্যুহার এবং চিকিৎসাব্যয় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে আগাম পদক্ষেপ জীবন রক্ষা করে এবং চিকিৎসাব্যয় কমায়। আমরা আশা করি, এই প্রটোকলটি দ্রুত সারা দেশে কার্যকর করা হবে।’
আইসিডিডিআর,বির এনআইএইচআর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ প্রকল্পের আওতায় এ প্রটোকলটি তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আইসিডিডিআর,বি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্মের মধ্যে এই চিকিৎসা প্রটোকলটি যুক্ত করে একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরির কাজও করছে, যাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সহজে এই নির্দেশনা ব্যবহার করতে পারেন।
আইসিডিডিআর,বির গবেষণাটি অর্থায়ন করছে যুক্তরাজ্য সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ (এনআইএইচআর)।
প্রটোকল প্রকাশনা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রখ্যাত কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশীদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কিডনি বিশেষজ্ঞ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।