মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে পাম্পগুলোতে তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পর ডিজেল সংকটে পড়েছেন কৃষক। এ অঞ্চলের যেসব জমি ডিজেলচালিত নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল সেগুলোতে আগামী দিনগুলোতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে কি না, এ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে কৃষকের মধ্যে। আবার কৃষিতে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রও ডিজেলচালিত। সেগুলোও কীভাবে চলবে এ নিয়ে চিন্তার ভাঁজ সংশ্লিষ্টদের। এমন পরিস্থিতিতে জ্বাালানি সংকটের কারণে বোরো ধানের সেচ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হলে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও ব্যাহত হতে পারে বলে শঙ্কা জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ জমিতে বোরোর চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠিত রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অঞ্চলে সেচের প্রয়োজন এমন মোট জমির প্রায় ২১ শতাংশে ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য মতে, চার জেলায় ১১ হাজার ৫৩৫টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎচালিত ১১ হাজার ২২০টি এবং ডিজেলচালিত ৩১৫টি। অগভীর নলকূপ রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৯টি। এর মধ্যে বিদ্যুৎচালিত ২১ হাজার ১৯৫টি এবং ডিজেলচালিত ৮৮ হাজার ২৬৮টি। এ ছাড়া ৮ হাজার ৬৪৭টি লো-লিফ্ট সেচ পাম্প রয়েছে, যার ১ হাজার ১৮৯টি বিদ্যুৎচালিত ও ৭ হাজার ৪৫৮টি ডিজেলচালিত। এর বাইরেও ৯১টি সোলারচালিত সেচ পাম্প রয়েছে।
কৃষকদের দাবি, বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরেও তারা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছেন না। আবার খুচরা বিক্রেতারা তীব্র সংকটের কথা বলে সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা আদায় করছেন। তারা বলছেন, সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকট দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধান চাষে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ জমি প্রস্তুত, সেচ ও ফসল কাটাসহ অধিকাংশ কৃষিকাজেই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। কৃষকরা জানান, বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিজেল সংকটের কারণে সেচের সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে, যা ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার দিয়ারমানিক চর এলাকার কৃষক আবদুল্লাহ বিন সাফি জানান, গত চার দিন ধরে তাদের চরাঞ্চলে ডিজেলের দাম ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় উঠেছে।
তিনি বলেন, জ্বাালানির দাম বাড়ায় সেচ খরচও অনেক বেড়ে যাচ্ছে, যা আগে থেকেই বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ে চাপে থাকা কৃষকদের আরও বিপাকে ফেলছে।
দুর্গাপুর উপজেলার বাজে কলশিপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর জানান, কয়েকটি তেল পাম্পে ঘুরেও ডিজেল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে তিনি প্রতি লিটার ডিজেল ১২০ টাকায় কিনেছেন।
একই উপজেলার ছিদ্রো কলশিপুর গ্রামের কৃষক মো. মোসলেম উদ্দিন জানান, বুধবার স্থানীয় বাজারের সব খুচরা দোকানে ঘুরেও তিনি এক লিটার ডিজেলও সংগ্রহ করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমার বোরো ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। তাই আমি ব্যবসায়ীদের প্রতি লিটার ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে চেয়েছি। তারপরও তারা সংকটের কথা বলে আমাকে ডিজেল দেয়নি।’ এতে কীভাবে ধান বাঁচাবেন তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পাম্পচালকরা জানান, পরিস্থিতির কারণে তাদের সেচের চার্জও বাড়াতে হচ্ছে, ফলে কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সেচ মৌসুমে ডিজেলের সংকট ও অতিরিক্ত দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল উত্তরাঞ্চলে বোরো উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বাালানি তেলের সংকট দেখা দিচ্ছে। এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, যা যৌক্তিক পদক্ষেপ। তবে প্রথমে কোন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘বোরো বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য এবং এটি সেচের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশে বোরো আবাদি জমির প্রায় ৬২ থেকে ৬৫ শতাংশ সেচ দেওয়া হয় ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে। তাই এ সময়ে জ্বাালানি তেল বণ্টনে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
ড. জাহাঙ্গীর আলম খান আরও বলেন, ‘যেভাবে সরকার কৃষিতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়, একইভাবে সেচের জন্য ব্যবহৃত ডিজেলের ক্ষেত্রেও ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন।’
তবে ডিজেল সংকট বা বেশি দামে বিক্রির কোনো অভিযোগ পাননি বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান। সারা দেশে সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলেও দাবি তার।