রাষ্ট্রীয় ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৭ এএম

জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এই ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসিতে। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের প্রশ্নের লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬টি ব্যাংক (অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, বেসিক ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসি) এর ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

মন্ত্রী জানান, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৯০২৯.৬৭ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮৮.৭৯ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮১৩১.০৯ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫৩৯৬.৬৭ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৯২৮১.৭৪ কোটি টাকা ও সোনালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫০৪৮.৩৯ কোটি টাকা।

সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে নেওয়া ঋণের বিশাল দায় বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। ওই সময়ে নেওয়া বিপুল ঋণ দেশের অর্থনীতির ওপর যে চাপ তৈরি করেছে, তা পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।

বিগত সরকারের প্রকল্প গ্রহণের সমালোচনা করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’, ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’, ‘জব ক্রিয়েশন’ এবং ‘এনভায়রনমেন্টাল কনসিডারেশন’ এই চারটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু অধিকাংশ প্রকল্পে এসব বিষয় যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের মাথার ওপর ১৩০০ প্রজেক্ট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পের আলাদা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অনেক প্রকল্পের মূল্যায়ন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মূল্যায়নের মাধ্যমে অনেক প্রকল্প বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে কিছু প্রকল্প এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেগুলো শেষ না করে উপায় নেই। ভবিষ্যতে যেসব বিনিয়োগ করা হবে, তার সুফল বাংলাদেশের মানুষ পাবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজারে যে লুটপাট হয়েছে তার দায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব সব মিলিয়ে দেশ কঠিন সময় পার করছে। তবে সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশাবাদী।

পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে টাস্কফোর্স গঠন : সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক এখন পর্যন্ত দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার সম্পদ শনাক্ত করা হয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর আওতায় ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেস চিহ্নিত করা হয়।

এস আলমের কোম্পানি বন্ধ নয় : এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো কোম্পানির মালিক দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে বিচার হবে। তবে শুধু মালিকের অপরাধের কারণে কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। পরবর্তী তিন মাসে তা আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোম্পানি এবং ব্যক্তির আইনি পরিচয় আলাদা। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে মামলা ও বিচার হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যক্তির মালিকানাধীন কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া হলে সেখানে কর্মরত মানুষের কর্মসংস্থান, ঋণ পরিশোধ এবং অর্থনীতিতে প্রতিষ্ঠানটির অবদানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, আইনে সুযোগ থাকলে কোনো কোম্পানি ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবে। ইমোশনের ওপর অর্থনীতি চলে না। আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে।

মাথাপিছু সরকারি ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা : সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত হিসাবে দেশের মানুষের মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা। ঋণের চাপ কমাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণের প্রয়োজন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

২০১০-২৪ সময়ে বিদেশি ঋণ ৮১.৮৩ বিলিয়ন ডলার : সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশ থেকে মোট ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বিদেশি ঋণের আসল হিসাবে ১৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ হিসেবে ৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

আলাদা হচ্ছে করনীতি ও বাস্তবায়ন : করদাতাদের অডিট-ভীতি ও হয়রানি কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলাদা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আলীমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করের আওতায় আসা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভীতি রয়েছে। শুধু অডিট নয়, করদাতাদের সামনে আরও অনেক বাধা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এনবিআরের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যারা করনীতি প্রণয়ন করবেন এবং যারা তা বাস্তবায়ন করবেন, তাদের আলাদা করা হচ্ছে। অতীতে একই জায়গায় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কারণে দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ ছিল। পৃথকীকরণের মাধ্যমে সেই সুযোগ কমানো হবে।

রাষ্ট্রীয় জাকাত ব্যবস্থায় সংস্কার : চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশে প্রায় ৮০ হাজার কওমি মাদ্রাসা জাকাত সংগ্রহের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখছে। ১৯৮২ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় সরকারি জাকাত ফান্ড বিভাগ কাজ করছে। ২০২৩ সালে জাকাত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। জাকাত ব্যবস্থার উন্নয়নে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি কাজ করছে এবং এর সুপারিশের ভিত্তিতে জাকাত বোর্ড গঠন ও ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ছেঁড়া নোট বিনিময় চলছে : সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান বেলালের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ছেঁড়া, ফাটা ও অপ্রচলনযোগ্য নোট বিনিময় সেবা চালু রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সার্কুলারের মাধ্যমে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে এ সেবা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন নোট মুদ্রণ ও বাজারে প্রচলন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে নতুন নোট মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ছেঁড়া ও ফাটা নোট বদলও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ।

২০২৪ সালে ইন্টারনেট বন্ধে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতি : সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের উত্তরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ১৮-২৩ জুলাই এবং ৫ আগস্ট সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, জনসাধারণের আর্থিক লেনদেন থেকে শুরু করে জীবনযাত্রায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকার ফলে বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক বা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনাকারী বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা ও নারীকর্মী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এছাড়াও ই-কমার্স ব্যবসা, অনলাইন টিকেটিং, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট কার্যক্রম, অনলাইনভিত্তিক ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত