গাড়ি উঠলেই কেঁপে ওঠে সেতু

বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝালকাঠির বাস-া নদীর ওপর নির্মিত বাস-া বেইলি সেতুটি নব্বই দশকে নির্মিত হয়। এরপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর সেতুটি দিয়ে নিরাপদভাবে যানবাহন চলাচল করেছে। কিন্তু লোহার স্থায়িত্ব কমে যাওয়া ও সেতুর উপরের পাটাতন ফেটে যাওয়ায় ২০১৭ সালে ঝালকাঠি সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এরপর ৯ বছর কেটে গেলেও নতুন করে শুরু হয়নি সেতু নির্মাণের কাজ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে যানবাহন চলতে থাকলে যেকোনো সময়ে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

ঝালকাঠি পৌরশহরের সরকারি কলেজসংলগ্ন মহাসড়কের বাস-া নদীর ওপর ১৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে বেইলি সেতুটিতে দীর্ঘদিন ধরে যানবাহন চলাচল করলেও বর্তমানে এর অবস্থা নড়বড়ে। লক্কড়ঝক্কড় অবস্থার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও নতুন সেতু নির্মাণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সড়ক ও সেতু বিভাগ। বরং প্রতি বছর সেতু সংস্কারে ব্যয় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

জানা গেছে, চলাচলে প্রায় অযোগ্য এ সেতুটি ঝালকাঠি সড়ক ও জনপথ বিভাগ দরপত্র ছাড়াই ২০ বছর ধরে জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখার চেষ্টা করছে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের যোগাযোগের অন্য কোনো মাধ্যম না থাকায় এ সড়কের সেতুর ওপর দিয়ে যান চলাচল করে। সেতুর ওপর কোনো ট্রাক-বাস উঠলে শব্দ করে কাঁপতে থাকে। ব্রিজের মাঝখানে কোনো সড়ক বাতি না থাকায় রাতের আঁধারে পথচারীরা চলাচলের সময় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ক্ষতিগ্রস্ত পাটাতনের নতুন পাত ঝালাই দিয়ে আটকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এলাকাবাসী শিগগির ক্ষতিগ্রস্ত বেইলি সেতু অপসারণ করে গার্ডার সেতু নির্মাণ করার দাবি জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাত টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন সেতুটিতে প্রতিদিন উঠছে ৭০-৮০ টন ওজনের যান। সড়ক বিভাগের নোটিসে অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে সেতু পারাপারে নিষেধের তোয়াক্কা নেই কারও। এ অবস্থায় ৪ লেন সড়ক নির্মাণের প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় সেতুটি সড়ক বিভাগের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটের যানজট নিরসন এবং বাস-া নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণের জন্য এই ৪ লেন সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণের সমীক্ষা চলছে। তবে কবে নাগাদ এই প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে এমন তথ্য জানাতে পারেনি সড়ক বিভাগ। এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ বাস-া সেতুতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়েই চলছে। তাই প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনসাধারণ এবং যান চলাচলে নিরাপত্তার স্বার্থে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা দরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭ টনের বেশি অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে যানবাহন যাতে সেতুতে উঠতে না পারে সেজন্য আগেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা দরকার। একবার জরিমানা করা হলে দ্বিতীয়বার অতিরিক্ত বোঝাই করে কোনো যান সেতুতে উঠবে না। এতে একদিকে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে, অন্যদিকে সরকার পাবে রাজস্ব।

বরিশাল থেকে বেনাপোলগামী বিআরটিসি বাসচালক বাবুল তালুকদার বলেন, ‘গাড়ি নিয়ে যখন সেতুতে উঠি, তখন ভয় লাগে। প্রচ- শব্দে বুক ধরফর করে। কখন ভেঙে পড়ে সেই ভয়ে থাকি সবসময়।’

বাস-া সেতু হয়ে ঢাকাগামী লাবিবা পরিবহনের চালক সোহেল খান বলেন, ‘সেতুতে উঠলে যে পরিমাণ শব্দ হয়, তাতে মনে হয় গাড়ি ভাইঙ্গা-চুইরা গেছে। তাছাড়া অতিরিক্ত লোডের কারণে পাটাতনের জয়েন্ট প্রায়ই খুলে যায়। এ সেতু মেরামতে আর কাজ হবে না। শিগগিরই এখানে নতুন সেতু তৈরি না করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা আছে।’

সেতুর পশ্চিম পাশে কেফায়েতনগর এলাকার বাসিন্দা রাজু খান বলেন, ‘সেতুর ওপর যানবাহন উঠলে বিকট শব্দ হয়। দিনের বেলা কোনোভাবে কাটলেও রাতের বেলা স্থানীয়রা শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। বিকট শব্দে ভয় পেয়ে বাচ্চারা জেগে ওঠে, কান্নাকাটি করে।’

ঝালকাঠি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার শরীফ খান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমরা নতুন সেতু নির্মাণের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করে বিস্তারিত তথ্যসহ ঢাকায় প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে পাঠিয়েছি। ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালকের কাছে সম্ভাব্য সেতুর যে তালিকা চূড়ান্ত করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে বাস-া সেতুরও নাম রয়েছে। অনুমোদন পেলে নতুন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।’