বাংলাদেশে তো বটেই, সারা দুনিয়ার মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এখন ইরান। কীভাবে ইরান মোকাবিলা করছে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ, কোথায় বোমা পড়ছে এবং কোথায় ড্রোন হামলা করছে তা নিয়ে পত্রিকার পাতা এবং চায়ের দোকান সরগরম। মানুষ যুদ্ধকে অপছন্দ করে। কিন্তু যুদ্ধের খবরে তাদের ভীষণ আগ্রহ। যুদ্ধের প্রকৃত কারণ এবং সত্যিকারের ফলাফল কী, তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান না করলেও যুদ্ধে কে জিতছে, কে হারছে সেটাই তাদের প্রধান বিষয়। যেকোনো যুদ্ধের প্রধান আঘাত কাদের ওপর পড়ে, শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষ এর ভুক্তভোগী হন কীভাবে, নারীদের ওপর যুদ্ধের ফলাফল কী, শিশুরা কোন মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে, বৃদ্ধরা তাদের জীবনকে কীভাবে সমাপ্ত করবেন আর যুবকদের ভবিষ্যৎ কী উত্তেজনার সময় এসব ভাবনাতেই আসে না। যুদ্ধে নজর থাকে সৈন্য এবং অস্ত্রের দিকে। কিন্তু যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধের পর মানুষ কী খাবে, কীভাবে বেঁচে থাকবে সেই আলোচনা থাকে আড়ালে। অথচ যুদ্ধ থামলেও, মানুষের প্রয়োজন কখনো থামবে না। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান সংঘাত তীব্র হয়েছে এবং এর ফলে জ্বালানি বাজার অস্থির। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ টানা কয়েক বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে অস্থির করে রেখেছে। এই সংঘাতগুলোকে আঞ্চলিক সামরিক দ্বন্দ্ব হিসেবে ভাবার কোনো কারণ নেই। এর প্রভাব এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ থেকে আকাশ পথে ৩৭০০ এবং সমুদ্রপথে ৬০০০ কিলোমিটারের দূরত্বে ইরান কিংবা আকাশ পথে ৬০০০ কিলোমিটার দূরে ইউক্রেন। কিন্তু দুই কিলোমিটার দূরের কাঁচাবাজারেও, এই যুদ্ধের প্রভাব পড়ে।
দূরের যুদ্ধে সবচেয়ে আগে যেটা অস্থির হয়ে ওঠে, সেটা হলো জ্বালানি তেলের বাজার। বিশ^বাজারে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। আর বাংলাদেশ তো জ্বালানি তেল আমদানির ওপর পুরোটাই নির্ভরশীল। ফলে আমাদের দেশে ডিজেল, পেট্রোল, সারের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের খাবারের পাতে আর সংসারে। খাদ্য আসবে কৃষি থেকে আর কৃষি উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো পানি এবং সার। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি, সারের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থা আরও কয়েক দিন চললে, আসন্ন মৌসুমে ফসল উৎপাদন ব্যাহত ও পণ্যের দাম অবশ্যম্ভাবীভাবে বৃদ্ধি পাবে। এ আশঙ্কা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে। কারণ বিশ্বে সার তৈরির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কাঁচামাল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে গত কয়েক দিন ধরে কৃত্রিম সারের প্রধান উপাদান অ্যামোনিয়া ও নাইট্রোজেন পরিবহন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হয়, বিশ্বের মোট খাদ্য উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই নির্ভর করে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের ওপর। সার সরবরাহ কমলে, ফসলের উৎপাদন কমে যাবে। এর ফলে অঞ্চলভেদে আলু, রুটি ও পাস্তার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। শুধু মানুষের খাদ্য নয়, পশুখাদ্যের খরচও বেড়ে যাবে। রাশিয়া, মিসর ও সৌদি আরবের পর ইরান বিশ্বে ইউরিয়া রপ্তানিতে চতুর্থ বৃহত্তম দেশ। ইউরিয়া হলো, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাইট্রোজেনভিত্তিক সার। নাইট্রোজেন জাতীয় সার তৈরির মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যয় হয় জীবাশ্ম গ্যাসের পেছনে। উপসাগরীয় অঞ্চলে জীবাশ্ম গ্যাসভিত্তিক কয়েকটি প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক নাইট্রোজেন সরবরাহ প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে। ফলে বিশ^বাজারে সারের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় হামলা চালানোর পরও ঘটনা ঘটেছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে মিসরের ইউরিয়ার দামকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ধরা হয়। সেটি বর্তমানে ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টন ইউরিয়ার দাম বর্তমানে ৬২৫ ডলার। গত সপ্তাহে যা ছিল ৪৮৪ থেকে ৪৯০ ডলারের মধ্যে। শুধু নাইট্রোজেন নয়, বৈশি^ক সালফার বাণিজ্যের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এটি সার উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। পাশাপাশি বিভিন্ন ধাতু ও শিল্প রাসায়নিকের বড় একটি অংশও এ অঞ্চল থেকে সরবরাহ হয়। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল দুই সপ্তাহের বেশি বন্ধ থাকলে সরবরাহ ও চাহিদার শৃঙ্খল ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে। সাধারণত ফসল বপন মৌসুমের আগে সারের কেনাবেচা বেড়ে যায়। যদি সময়মতো সার সরবরাহ না হয়, বেশি দামের জন্য জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার দেওয়া হয় তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ফসল উৎপাদনের ওপর। এর ফলে কৃষক শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাই নয়, খাদ্য সংকটে পড়বে সারা বিশ্ব। কারণ নাইট্রোজেনের ব্যবহার সামান্য কমলেও ফলনে তার প্রভাব কম হবে না। বিশ্ব জুড়ে কয়েক মিলিয়ন টন ফসল উৎপাদন কমে যাবে। ফলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে। যেমন- পশুখাদ্যের বাজার, গবাদিপশু উৎপাদন, বায়োফুয়েল শিল্প এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দামে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত তাদের ইউরিয়া কারখানাগুলো চালাতে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ব্রাজিল সয়াবিন ও ভুট্টা উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে নাইট্রোজেন ও ফসফেট আমদানি করে। এমনকি বিশ্বের অন্যতম বড় সার উৎপাদনকারী যুক্তরাষ্ট্রও আঞ্চলিক চাহিদা মেটাতে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া আমদানি করে। ফলে প্রভাব পড়বে সারা দুনিয়ার ফসল উৎপাদনে। তবে সার সংকটের ধাক্কা তেলের দামের মতো তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। পেট্রোলের দামের প্রভাব সরাসরি বোঝা যায়, কিন্তু ফসলের উৎপাদনে প্রভাব দেখা যায় কয়েক মাস পর। ফলে হরমুজের মতো সরু প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পারস্য উপসাগরের গণ্ডি ছাড়িয়ে, বিশ্ব জুড়ে জীবনযাত্রায় এক ব্যাপক আঘাত হানবে।
বাংলাদেশের কথা বিবেচনা করা যাক। ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের প্রধান সার কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি হয়ে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিতে সরকার শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো হলো ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), যমুনা সার কারখানা, আশুগঞ্জ সার কারখানা, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)। বর্তমানে কেবল শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি উৎপাদন চালু রেখেছে। ১৮ কোটি মানুষের দেশে, ভাতের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা বছরে প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন। তার মধ্যে সিইউএফএলসহ বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন কারখানাগুলো প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করে। অবশিষ্ট ১৬ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হয়। এর পাশাপাশি সেচের জন্য নির্ভরশীল ডিজেলচালিত সেচপাম্প আর চাষের জন্য নির্ভরশীল ট্রাক্টরের ওপর। এখন বোরো মৌসুমে ফসল মাড়াই করার জন্যও যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়ে গেলে সেচ, চাষ আর মাড়াই খরচ বেড়ে যাবে। তার ওপর যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়বে। ফলে জমিতে চাষ করতে কৃষকের খরচ বাড়বে। এই বাড়তি খরচ কি কৃষক বহন করতে পারবেন? ফলে উৎপাদন কমবে, দাম বাড়বে এবং কৃষক শুধু নয়, ভোক্তাও পড়বেন দুর্ভোগে।
দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শহরের শ্রমজীবী বা নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের আয় বাড়বে না, কিন্তু খরচ বাড়বে অনেক গুণ। ফসলের ক্ষেত থেকে তাদের পাতে খাবার আসতে অনেক ধাপ পার হতে হয়। তাদের খাবার টেবিলে চাল-ডাল-সবজি আসে কীভাবে? আসে ট্রাক, লঞ্চ, জাহাজ, ট্রেন আর বিমানে করে। এসবই চলে জ¦ালানি তেলে। যখন তেলের দাম বেড়ে যায়, তখন পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। পাইকারি থেকে খুচরা, সব জায়গায় পণ্য পৌঁছানোর খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চাল-ডাল সবকিছুর দাম চড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসায়ীদের মুনাফা লিপ্সা। এসবের মিলিত প্রভাবে সাধারণ মানুষের প্রধান প্রয়োজন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। এর সরল অর্থ এবং বিপজ্জনক প্রভাব নিয়ে কি আমরা সচেতন আছি? দূর দেশের যুদ্ধ হাজার মাইল দূরে থাকলেও, তার প্রভাব পড়বে পাড়ার বাজারে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য খাবার কেনাটাই যেন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। চাল, ডাল, তেল, সবজি, ডিম দিন এনে দিন খায় এমন মানুষের জন্য এই জিনিসগুলোর দাম একটু বেড়ে গেলেই তাদের খাবারের পাতে টান পড়ে। যে রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, কিংবা গৃহ শ্রমিক যদি ১০০ টাকায় ২ কেজি চাল কিনতেন, তাকে সেই একই চালের দাম ১২০ টাকায় কিনতে হলে বাড়তি ২০ টাকা জোগাড় করবেন কীভাবে? আয় বাড়বে না কিন্তু ব্যয় বাড়বে এর প্রভাব পাত থেকে পেটে গিয়ে আঘাত হানবে। যুদ্ধ বিমানের শব্দ, বোমার আওয়াজ আমরা শুনব না, কিন্তু যুদ্ধের খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। যুদ্ধ কেড়ে নেবে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা আর জীবনযাত্রার মান। কৃষিতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এ যেন যুদ্ধ শৃঙ্খলের অংশ। ফলে দূরের যুদ্ধটা শুধু খবরের কাগজের খবর হয়ে থাকবে না। সেটা দৃশ্যমান হবে কৃষকের ঘরে, ফসলের মাঠে, শহরের বস্তিতে আর সাধারণ মানুষের খাবারের পাতে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা আছেন, তারা এই বিষয়টা যেন উপেক্ষা না করেন।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratan.spb@gmail.com