জনপ্রশাসন সংস্কার

আপাতত প্রশাসনে বড় সংস্কার হচ্ছে না। সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও, সংসদে বিতর্ক না হওয়া পর্যন্ত, কোনো গতি হবে না। সরকারের বয়স মাসের গ-ি পেরোয়নি। তবু প্রশাসন সংস্কারের ব্যাপারে সংসদে আলোচনা প্রয়োজন। আমলাতন্ত্রের কাঠামো পরিবর্তন করতে হলে জনপ্রতিনিধিদের আলোচনা, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা একটি জনমুখী প্রশাসন বিনির্মাণের পাথেয় হতে পারে। যে আকাক্সক্ষার জন্ম নিয়েছিল ১৯৭২ সালে, স্বাধীন দেশের জন্য উপযুক্ত জনপ্রশাসন প্রয়োজন ছিল। তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল সেই সরকার। কিন্তু পরবর্তী সব সরকার নিজেদের প্রয়োজনে টুকটাক সংস্কার ও কিছু জুড়ে দিয়ে কাজ চালায়। শহীদ জিয়া সুপিরিয়র সার্ভিস পুল (এসএসপি) গড়ে নিয়ে উপসচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যন্ত পদোন্নতির একটি কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন। এরশাদ এসে সেই ব্যবস্থা বাতিল করেন, প্রশাসনের আমলাদের ক্ষমতায়নে অংশীদার করে। এতে প্রকৃত প্রস্তাবে ক্ষমতায় বসে থাকে আমলাতন্ত্র।

হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে, ওই আমলাদের নিজের দলের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। প্রশাসন নির্বাচন কমিশনকে তাদের দখলে নিয়ে, ওই ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে দেয়। ভোটারবিহীন নির্বাচন ও ভোট আগের রাতে সম্পন্ন করে তারা হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হতে দুঃসাহস জোগায়। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ওই আমলাদের আওয়ামী অংশ, ‘জনতার মঞ্চ’ নির্মাণ করে রাজনৈতিক সরকারকে কোণঠাসা করে। সেই সময় রাজনৈতিক সরকার যদি ম.খা. আলমগীরের অবৈধ তৎপরতার বিচার করত, তাহলে আজকের প্রশাসন এতটা উদ্ধত হতে পারত না। তিনজন আমলা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের চেয়ে আমলাতন্ত্র ভয়ংকর। এখানে যে কৌশলী ফাঁদ পাতা আছে, সেটা প্রধানমন্ত্রীকে উপলব্ধি করতে হবে। তাহলেই তিনি ভালো ফল পেতে পারেন। জনগণের কল্যাণে প্রশাসন তৈরি করতে হলে, কঠোর মনিটরিং জরুরি। দক্ষ ও কর্মপ্রবণ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো, রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ গৃহীত হলে, ভালো ফল পেতে পারে বর্তমান সরকার। দলীয় পরিচয় নয়, কর্মদক্ষতা ও নিবেদিতপ্রাণ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যেমন থাকা জরুরি, তেমনি দেশপ্রেম ও জনগণমুখিতা তাদের পদোন্নতির সোপান হতে পারে।

আমরা লক্ষ করছি, তারেক রহমানের সরকার পুরনো ধারায় শাসন চালাচ্ছে। সংস্কার করে প্রশাসনের আমলাতান্ত্রিক ফাঁদগুলোকে নস্যাৎ করতে হবে। অবসর থেকে ডেকে না এনে, যোগ্য-দক্ষদের পদোন্নতি দিয়ে কর্মগতি বাড়ানো উচিত যতদিন না নয়া প্রশাসনিক সংস্কার করা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রশাসনিক সংস্কারের যে ২০৮টি সুপারিশ, এ-বিষয়ে সরকারকে আলো দেখাতে পারে। জনআকাক্সক্ষাকে সামনে রেখে ওই সুপারিশগুলো করা হয়েছিল। আমরা ধারণা করি, ব্রিটিশদের তৈরি প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কৃত হলে সুশাসনের দুয়ার উন্মুক্ত হতে পারে। কেবল কাগজ-কলম ও সংবিধানে তার রূপায়ণ ধারা থাকলেই হবে না, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দেখাতে হবে। আর সেটা তখনই বুঝতে পারব, যখন দেখব প্রশাসনে ‘স্যার’ হয়ে উঠেছেন জনগণের সেবক হিসেবে। তাদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি যখন জনকল্যাণে নিয়োজিত হবে, তখনই সরকারপ্রধান যে সেবা দিতে চান, তা ফলপ্রসূ হয়ে উঠতে শুরু করবে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। তারা যেন এটা না ভাবতে পারেন যে, তারা দেশের মালিক। দেশের মালিক যে জনগণ, তা প্রমাণ করতে হবে। তখনই জনসেবা নিশ্চিত করা যাবে।