পাঠকখরা ও হতাশায় সমাপ্তি

মাসজুড়ে পাঠকের খরা কাটিয়ে অবশেষে পর্দা নামল অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর। শেষ দিনের তাগিদে বইমেলায় ছুটে এলেও উপস্থিতি ছিল একেবারে নগণ্য। দেশের সবচেয়ে বড় এই বই উৎসবকে ঘিরে প্রতিবারই লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে। তবে এবারের চিত্র ছিল ভিন্ন। যে মেলা প্রতিবছর শেষ দিনে পাঠকের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে, প্রকাশকদের মুখে ফুটে ওঠে হাসি, এবার সেখানে ছিল নিরুৎসাহ আর হতাশার ছাপ। শেষ বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের আনাগোনা কিছুটা বাড়লেও স্টলের সামনে অপেক্ষায় থাকা বিক্রেতাদের চোখে ছিল অপূর্ণ আশা, আর প্রকাশকদের কণ্ঠে হতাশা ও আক্ষেপ। প্রকাশকদের মতে, আকাক্সক্ষা প্রত্যাশা আর বাস্তবতার বিস্তর ফারাক নিয়ে শেষ হলো এবারের অমর একুশে বইমেলা। তাদের চোখে-মুখে ছিল প্রশ্ন, আগামী বছর কি আবার আগের সেই প্রাণবন্ত বইমেলা ফিরে আসবে?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের কারণে পিছিয়ে যাওয়া এবারের অমর একুশে বইমেলা ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে শেষ হয়েছে মাত্র ১৮ দিনে। শেষ দিনে দুপুর ২টায় মেলা শুরু হয়ে চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়ে ২৩৬টি। এ নিয়ে সর্বমোট নতুন বই এসেছে ২০০৭টি। অথচ, ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৯৯। মেলায় অংশ নেওয়া ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। 

গত বছরের তুলনায় এবার বই বিক্রি ও নতুন বই প্রকাশের সংখ্যা দুটোই কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানে মেলা, দিন কমে যাওয়া, প্যাভিলিয়ন না থাকা এবং শুরু থেকেই দর্শনার্থীর উপস্থিতি কম থাকায় বিক্রিতে বড় প্রভাব পড়েছে।

রবিবার মেলার মূল মঞ্চে সমাপনী প্রতিবেদন পাঠ করেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৬৯টি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮ কোটি টাকা। গড় হিসাবে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে ১৭ লাখ ৪ হাজার ৬২৯ টাকার বই বিক্রি করেছে। ২০২৪ সালে মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৬০ কোটি টাকার এবং ২০২৩ সালে বিক্রি হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকার। গত বছর মেলায় ৭০৩টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও এবার সে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭০-এ। মেলার তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ১৪ মার্চ পর্যন্ত নতুন বই জমা পড়েছে ১ হাজার ৭৭টি। তবে অনেক প্রকাশক বই জমা না দেওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবার মোট ২৫২টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।

এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলার উদ্বোধন করেছিলেন। মেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মোট ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ৬৮টি ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে এবার কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি এবং স্টল ভাড়াও নেওয়া হয়নি।

এ বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা কম থাকায় পুরো মেলা জুড়েই ছিল নিরাশার আবহ। অনেকেই আশা করেছিলেন শেষ দিন অন্তত পাঠকের ঢল নামবে, কিন্তু সেই আশাও পূরণ হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসান তারিক বলেন, ‘প্রতিবছর ৮-১০ দিন বইমেলায় আসা হয়, বইও কেনা হয় অনেক। কিন্তু এবার সে আগ্রহ পাইনি। দুদিন এসেছি, বই কিনেছি মাত্র ১টি। ভেবেছিলাম শেষ দিন প্রচুর পাঠক আসবেন কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে মাত্র শুরু হচ্ছে মেলা।’

হাওলাদার প্রকাশনীর দুই বিক্রয়কর্মী জানান, বিক্রি নেই বললেই চলে। মাস জুড়ে খুব একটা ক্রেতা আসেননি। আজ মেলার শেষ দিন, কিন্তু দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে।’

অনিন্দ্য প্রকাশের বিক্রয়কর্মীরাও একই ধরনের হতাশার কথা জানান। তারা বলেন, ‘অন্যান্য বছর এরচেয়ে কয়েকগুণ বেশি বিক্রি হতো। অন্তত দর্শনার্থীদের পদভারে মুখর থাকত বইমেলা প্রাঙ্গণ। কিন্তু এবার বইমেলা ছিল অনেকটাই নিষ্প্রাণ। আমরা অনেকটাই হতাশ।’

বুনন প্রকাশনীর প্রকাশক মো. খালেদ উদ্দিন বলেন, ‘এ বছর বইমেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে বিক্রিও হয়েছে কম। স্টল তৈরির খরচ, দুজন কর্মীর বেতন সব মিলিয়ে মূল খরচই ওঠেনি। অথচ অন্যান্য বছর শেষ দিনেই ১৫ দিনের সমান বিক্রি হতো।’

ঐতিহ্য প্রকাশনীর কর্ণধার আরিফুর রহমান নাঈম বলেন, ‘দীর্ঘ ৩২-৩৩ বছরে রোজার মধ্যে মেলা করার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। দিনসংখ্যা কম হওয়াটাও প্রভাব ফেলেছে। গত এক বছরের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষের হাতে টাকা কম ছিল, যা বিক্রিতে প্রভাব ফেলেছে।’

সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘সবার আন্তরিক সহযোগিতায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ সফল করা সম্ভব হয়েছে। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের সামষ্টিক উদযাপনে আগামীর বইমেলা নতুনরূপে আশা জাগাবে বলে আমরা মনে করতে পারি।’ 

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি বলেন, ‘আমরা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই যেখানে বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য আমাদের সন্তানদের আবার বইয়ের জগতে নিয়ে যেতে হবে। সারা দেশে জেলা ও উপজেলায় পাঠাগার ও জ্ঞান প্রসারের জন্য আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, যে বই পাঠককে মনের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগ্রত করে এবং রাষ্ট্র গঠনে ও উন্নত চিন্তা-চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে সেটিই মানসম্পন্ন বই। একটি জাতির কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ পাঠাভ্যাস দ্বারা নির্ণিত হয়। কাজেই পাঠকদের হাতে ভালো ও মানসম্পন্ন বই তুলে দেওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।’  

গুণিজন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার লাভ করে কথাপ্রকাশ, মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পায় ঐতিহ্য, প্রথমা প্রকাশন এবং দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লি.। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার পায় পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার পায় সহজ প্রকাশ, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পায় ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স, মাত্রা প্রকাশ ও বেঙ্গল বুকস।

১৮ কোটি টাকার তথ্য প্রত্যাখ্যান প্রকাশক ঐক্যের : অমর একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমি ঘোষিত ১৮ কোটি টাকার তথ্য প্রত্যাখ্যান করছে ‘প্রকাশক ঐক্য’।

প্রকাশকরা বলেছেন, কিসের ভিত্তিতে রমজান মাসের একুশে বইমেলার বই বিক্রির এই তথ্য প্রদান করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা চাই আমরা। আমরা তথ্যের পূর্ণ বিবরণ দাবি করছি এবং এই তথ্যকে সর্বৈব মিথ্যা দাবি করে একে প্রত্যাখ্যান করছি। প্রকাশক ঐক্যের পক্ষে ব্যাখ্যা দাবি করেন মাহরুখ মহিউদ্দিন, ইউপিএ; মুনিরুল হক, অনন্যা; সৈয়দ জাকির হোসাইন, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন; গফুর হোসেন, রিদম প্রকাশনী; এ কে নাছির আহমদ সেলিম, কাকলী; মিলন কান্তি নাথ, অনুপম; মাহবুবুর রহমান, আদর্শসহ প্রকাশক ঐক্যের পক্ষে প্রকাশকরা।