ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এবারকার যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছাড়াও ইউরোপসহ অনেক দেশের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে ওঠেছে ‘হরমুজ প্রণালি’। বিশ্বজুড়ে তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি ইরান বন্ধ ঘোষণার কারণে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় খোদ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌঅভিযানের অজুহাতে ন্যাটোসহ বিভিন্ন দেশকে এ যুদ্ধে ট্রাম্প জড়াতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের এতে মোটেই আগ্রহ নেই।
তবে হরমুজ নিয়ে অচলাবস্থা কী করে কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নিয়ে আলোচনার কথা বলছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্য।
ন্যাটোকে ট্রাম্পের সতর্কবার্তা : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্ররা সাহায্য করতে ব্যর্থ হলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্প সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, চলমান এই যুদ্ধে মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হলে ন্যাটোর সামনে ‘খুবই খারাপ ভবিষ্যৎ’ অপেক্ষা করছে। যারা এই প্রণালির সুবিধাভোগী, তাদেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। আর যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপ ও চীন উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
ব্রিটিশদেরও অনাগ্রহ : যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষাপ্রধান জেনারেল স্যার নিক কার্টার গতকাল সোমবার বলেন, ন্যাটো এমন কোনো জোট নয় যা কোনো মিত্রের জন্য তৈরি হয়েছিল যাতে তারা নিজের ইচ্ছেমতো যুুদ্ধে যায় এবং পরে অন্য সবাইকে তা অনুসরণ করতে বাধ্য করে। বিবিসি রেডিও ফোরের এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। নিক কার্টারের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত কি না জানতে চাওয়া হলে যুক্তরাজ্যের কর্ম ও পেনশনমন্ত্রী প্যাট মেকফেডান বলেছেন, জেনারেল কার্টার ‘সঠিক।’ বর্তমান যুদ্ধকে মেকফেডান ‘ন্যাটো যুদ্ধ নয়’ বরং ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে ব্রিটিশদের সহায়তা চেয়েছেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারও সাফ বলে দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বড় ধরনের যুদ্ধে যুক্তরাজ্য অংশ নেবে না। তবে স্টারমার বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য একটি কার্যকর পরিকল্পনা করতে মিত্রদের সঙ্গে কাজ করছে যুক্তরাজ্য। তিনি বলেন, এই যুদ্ধের পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের ক্ষমতা সীমিত করতে ও জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি ‘আলোচনাভিত্তিক চুক্তির’ প্রয়োজন হবে।
ন্যাটোভুক্ত আরও দুই দেশ জার্মানি ও গ্রিসের মুখপাত্ররা গতকাল আলাদাভাবে বলেছেন, দেশ দুটি মনে করে যুদ্ধের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই। দেশ দুটি যুদ্ধ বা সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার কোনো চেষ্টায় যোগ দেবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ১২টি দেশ নিয়ে গঠিত ন্যাটোর মূলনীতিগুলোর একটি হলো, জোটভুক্ত কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে হামলার অর্থ সবার বিরুদ্ধেই হামলা।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মিত্র অস্ট্রেলিয়ার পরিবহনমন্ত্রী ক্যাথরিন কিং হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
এর আগে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য ট্রাম্পের প্রস্তাবে ‘না’ বলেছে। ফলে অবস্থাদৃষ্টে বলা যায়, ইরান যুদ্ধে ক্রমশ একা হয়ে পড়ছেন ট্রাম্প।
ইইউ হরমুজ নিয়ে আলোচনায় : ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে ইউরোপের পক্ষ থেকে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে সদস্য দেশগুলো আলোচনা করবে। বিবিসি জানায়, ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে তিনি এ কথা বলেন। কালাস বলেন, ‘আমাদের নিজেদের স্বার্থেই হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা প্রয়োজন।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার পর এই প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়। বিশে^র মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ইরানের হামলা চলছে : চলমান এই যুদ্ধের ১৭তম দিন আজ মঙ্গলবার। ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনে গতকাল সোমবারও হামলা হয়েছে। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে দেড় ঘণ্টায় ৩৭টি ড্রোন ধেয়ে গেছে। এসব ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলায় গত রবিবার মধ্যরাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বিমানবন্দরে জ্বালানি ট্যাংকে বড় ধরনের অগ্নিকা- হয়েছে। আগুন লাগার পর অস্থায়ীভাবে সব ফ্লাইট বাতিল করে দেয় কর্তৃপক্ষ। অবশ্য ইরান এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। অপরদিকে ক্ষেপণাস্ত্র আবুধাবিতে একটি গাড়িতে আঘাত হানলে এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে গত রবিবার শব্দের চেয়ে ১৩ গুণ বেশি গতির ‘সেজিল’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের আইআরজিসি। দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, এই ক্ষেপণাস্ত্র দিক পরিবর্তনে সক্ষম। পাশাপাশি এটি ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের বিস্তৃত অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে।
ইরান লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডকে সহায়তাকারীদের নিশানা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের এক মুখপাত্র বলেন, এ বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনকে ইরান নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। রণতরীটিকে সহায়তা প্রদানকারী সব ধরনের লজিস্টিক ও সেবা স্থাপনা ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গতকাল বলছেন, তাদের দেশ যতদিন প্রয়োজন ততদিন লড়াই করতে প্রস্তুত এবং সক্ষম। অবশ্য ওয়াশিংটনের অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের এমন অবস্থান মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার একটি কৌশল। যদি হোয়াইট হাউজ তাদের ‘স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের’ বয়ান টিকিয়ে রাখতে না পারে, তবে স্বাভাবিকভাবে ওয়াশিংটন আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে এবং একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে বাধ্য হতে পারে।
খামেনির উড়োজাহাজ ধ্বংস : ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে। দেশটি দাবি করেছে, তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে একটি ‘নির্ভুল হামলা’ চালিয়ে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ব্যবহৃত উড়োজাহাজটি ধ্বংস করা হয়েছে। টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই উড়োজাহাজটি ধ্বংস করার ফলে ইরানের মিত্র অক্ষভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ইরানি নেতৃত্বের সমন্বয় করার সক্ষমতা, দেশটির সামরিক শক্তি বাড়ানোর প্রচেষ্টা ও নিজেদের সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষমতা বিঘ্নিত হবে।