প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, ২১ মে বৃহস্পতিবার রাতে আপনি যখন রাজধানীর পল্লবীতে রামিসাদের ছোট্ট ঘরটিতে ঢুকছিলেন, তখন হয়তো রাষ্ট্রের সব শব্দ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল। টেবিলের পাশে হয়তো রাখা ছিল একটি স্কুলব্যাগ, খোলা খাতার ভাঁজে রয়ে গিয়েছিল অসমাপ্ত কিছু লেখা, বিছানায় কয়েকটি পুতুল, চুলের ফিতা-ক্লিপ। আর সেই ঘরের বাতাসে তখনো হয়তো ভাসছিল এক বাবার অসহায় উচ্চারণ, ‘আমি বিচার চাই না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।’
একটি রাষ্ট্রের জন্য, একটি সমাজের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর বাক্য আর কী হতে পারে তা আমাদের জানা নেই। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরালের এই সময়ে একই সঙ্গে অনেকগুলো ঘটনাই সামনে আসে। আমরা দেখতে থাকি, শখের শাড়ি কিংবা স্কুলড্রেস পরা রামিসার হাসিমুখ চেয়ে চেয়ে বিদ্রুপ করছে। বাকরুদ্ধ আমরা সেদিক থেকে চোখ নামিয়ে নিচ্ছি। কী এক অন্ধকার সময়ে বসবাস করছি, আমাদের সন্তানদের দিকে, ছোট্ট স্বজনের দিকেও তাকাতে পারছি না। প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি আমরা। রামিসা আমাদের শান্তি কেড়ে নিয়েছে, ঘুম কেড়ে নিয়েছে, টের পাই আপনারও নিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী। তাইতো আপনি সব প্রটোকল ভেঙে দুইজন সিনিয়র মন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শিশুটির বাসায় ছুটে যান। পরম মমতায় তার বড় বোনের মাথায় হাত রাখেন। তার বাবা-মায়ের পাশে বসেন। দ্রুত বিচার শেষ করার নির্দেশ দেন। মানুষ সেই দৃশ্য দেখে। আর একই সঙ্গে দেখে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া আরও একটি ছবিও যেখানে আপনার কাঁধে ছোট্ট জাইমা রহমান। এই ছবিটি তোলার সময়ে বাবা হিসেবে আপনার মুখে তখন যে কোমলতা ছিল, তার পেছনে কোনো রাজনীতি ছিল না, ছিল সন্তানকে রক্ষার দায়িত্ব। আজ দেশের মানুষ আপনাকে সেই ছবিটিই মনে করিয়ে দিতে চায়। কারণ রামিসাও তো কারও জাইমা ছিল। আছিয়াও ছিল, লামিয়া-ফাহিমাও ছিল। এই দেশের প্রতিটি শিশুই আসলে কোনো না কোনো বাবার কাঁধে চড়া ছোট্ট পৃথিবী, ছোট্ট জাইমা। কিন্তু তার ভেতরে লুকানো স্বপ্ন অনেক বড়।
কী কাকতালীয় ঘটনা! এর মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হলো পুরনো একটি গান
‘আজ যে শিশু
পৃথিবীর আলোয় এসেছে
আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই’
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, সম্ভবত ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদের এক অনুষ্ঠানে রেনেসাঁ ব্যান্ড দলের সঙ্গে তাদের এ গানটি গেয়েছিলেন কলিম শরাফী, নিলুফার ইয়াসমিন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাসহ খ্যাতিমান শিল্পীরা। সব শিশুর জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আকুতি ছিল গানটিতে। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় পরও আমরা শিশুদের জন্য সেই ভবিষ্যৎ গড়তে পারিনি। আমাদের শিশুরা বিকশিত হওয়ার আগেই ধর্ষিত হচ্ছে, খুন হচ্ছে, অকালে ঝরে যাচ্ছে। এজন্য কাকে দোষ দেব, কাকে দায়ী করব আমরা?
প্রধানমন্ত্রী, আপনি মাত্র কয়েক মাস হয় দায়িত্ব নিয়েছেন। আমরা আপনার চোখে অনেক স্বপ্ন দেখছি। অনেক উদ্যমী আর ব্যতিক্রমী কাজও করে যাচ্ছেন। চাইলেই পারেন, এই দেশটাকে শিশুদের জন্য একটু নিরাপদ করতে। এজন্য খুব বেশি কিছুর দরকার নেই। শুধু দরকার শক্ত সিদ্ধান্তের। দেশেতো অনেক আইন আছে। বিচারব্যবস্থা আছে। কিন্তু মানুষ কেন বিশ্বাস হারায়? কেন একটি শিশু হত্যার পর তার বাবা বিচার চাইতে ভয় পান? কারণ তিনি দেখেছেন অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, অনেক খুনি আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে, অনেক কান্না সময়ের ভিড়ে হারিয়ে যায়। এই ভয় শুধু একজন বাবার নয়, একটি পরিবারের নয়; এটি এখন পুরো সমাজের, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের।
রামিসার ঘটনাটি আমাদের সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটিকেই সবার সামনে তুলে ধরেছে। একটি আট বছরের শিশু, যে সকালে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল, তাকে পাশের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করা হলো। তার কাটা মাথা বালতিতে, আর দেহ পড়ে থাকল মেঝেতে। এই বীভৎসতা শুধু একজন, দুজন বিকৃত মানুষের নয়; এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়েরও নির্মম এক চিত্র।
প্রধানমন্ত্রী, আপনার নির্দেশেই দ্রুততর সময়ে তৈরি হয়েছে রামিসা হত্যা মামলার চার্জশিট। নিম্ন আদালতে বিচারও দ্রুত শেষ হবে এই ধারণা করি। কিন্তু অতীত বলে, উচ্চ আদালতে বিচারের সেই গতি ধরে রাখা যায় না। ফলে আপনার হাতে এখন শুধু একটি মামলার চার্জশিট নয়, একটি নৈতিক দায়ও এসে পড়েছে। মানুষ দ্রুতবিচার চায় নিম্ন আদালত, উচ্চ আদালত সবখানেই। আরেকটি কথা, শুধু বিচার হলেই হবে না, মানুষ বিশ্বাস করতে চায় রাষ্ট্র সত্যিই শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এমন একটি পরিবেশ দরকার, যেখানে একটি শিশু স্কুলে গেলে মা-বাবা তটস্থ থাকবে না সে নিরাপদে আছে কি না এই ভেবে। যেখানে প্রতিবেশী মানে আতঙ্কের কারণ হবে না, যেখানে স্কুল, মাদ্রাসা, বাসা, রাস্তা সব জায়গাই শিশুর জন্য নিরাপদ হবে, শিশুবান্ধব হবে।
আপনি চাইলে কয়েকটি কাজ এখনই শুরু হতে পারে শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলার জন্য আলাদা দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায় বাস্তবায়ন, যৌন অপরাধীদের জাতীয় ডাটাবেজ, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা সেল এবং সমাজব্যাপী নৈতিক ও সামাজিক জাগরণ। শুধু আইন দিয়ে সব অপরাধ থামানো যায় না, রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আজ মানুষ শুধু খুনি বা ধর্ষকদের শাস্তি চায় না, তারা জানতে চায় রাষ্ট্র আসলে কোন পক্ষের শিশুদের, নাকি বিচারহীনতার?
আপনার কাঁধে চড়া ছোট্ট জাইমার ছবিটি সবার মনে ধরেছে, কারণ সেখানে একজন রাজনীতিকের চেয়ে একজন বাবাকে বেশি দেখা যায়, অনুভব করা যায়। আজ দেশের মানুষ আপনাকে সেই বাবার জায়গা থেকেই ডাকছে। বলছে, নিজের কন্যার মতোই দেশের সব শিশুকে রক্ষা করেন। আপনি চাইলে সেটা অবশ্যই সম্ভব।
আর শেষে আরেকটি কথা। আমাদের শিশুরা কিন্তু শুধু ধর্ষক-খুনির হাতে মরছে না; তারা মারা যাচ্ছে অবহেলাতেও। হাম আবার ফিরে এসেছে অবহেলার জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে। হাসপাতালের বিছানায় ছোট ছোট শিশু জ্বর, শ্বাসকষ্ট আর ফুসকুড়িতে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। যেসব শিশু সময়মতো টিকা পেলে বেঁচে যেতে পারত, তারাও এখন সংখ্যায় পরিণত হচ্ছে। ৪৯৯, ৫০০ এভাবে মৃতের হিসাব বাড়ছে। একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই শুধু পরিসংখ্যান নয়। সে একটি ভবিষ্যৎ, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন। তার চলে যাওয়া মানে একটি মায়ের বুকের ভেতর জেঁকে বসা চিরস্থায়ী শূন্যতা।
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, এই দেশের শিশুরা যেন আর লাশ হয়ে ফিরে না আসে না কোনো বালতির ভেতর, না কোনো হাসপাতালের বিছানায়। ইতিহাস একদিন আপনাকে এই প্রশ্নই করবে, আপনি কি তাদের রক্ষা করেছিলেন? আপনি যদি সত্যিই এই সময়কে বদলাতে চান, তাহলে শিশুদের দিয়েই শুরু করেন। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলেন, যেখানে কোনো বাবা আর সন্তানের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে আর বলতে বাধ্য হবে না ‘আমি বিচার চাই না।’ আপনাকে সেটা পারতেই হবে।
লেখক : সম্পাদক, দেশ রূপান্তর
