জাতীয় সংসদ কখনো পুরোপুরিভাবে আমাদের ছিল না। আমাদের মানে, আম-জনতার। তাদের জন্যই নির্মিত হয়েছিল সংসদ ভবন। কিন্তু কখনো সেই জনগণ সেই ভবনের ধারেকাছে যেতে পারেনি। যারা ভবনের ভেতরে গেছেন বা যান, তারা আমাদের প্রতিনিধি। ভোটের মাধ্যমে যারা নির্বাচিত হয়ে আসেন, তারাই জনগণের প্রতিনিধি। মূলত প্রতিনিধিরাই সরকারের মালিক। বিরোধীরা তাদের ছায়া। এই সংসদকে তাই জনগণের ‘ছায়া সংসদ’ বলা যেতে পারে। জনগণ যা চান বা যা চাইতে পারেন, যা তাদের দরকার, সেগুলোই সাংসদরা সংসদে তোলেন। সেই তোলা বিষয়টি যদি যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয়, তাহলে সংসদ তা পাস করে তারা আইনে রূপান্তরিত করেন। আর নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে তা ছেড়ে দেন প্রশাসনের হাতে। আমলারা সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। সাদাসিধাভাবে এই হলো সংসদের কাজ। কিন্তু এই সাদাসিধা কাজই সবচেয়ে জটিল ও দুর্গম। কাজী নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো কঠিন। আমরা সহজে তা পেরোতে পারি না।
সংসদ সম্পর্কে শিক্ষিত প্রজ্ঞাবানদের জ্ঞান নখদর্পণে। তাদের চেষ্টা করতে হয় না। আপ সে আপ আসে। ‘পার্লামেন্টারিয়ান’ শব্দটি তাদের জন্য প্রস্তুত হয়েছে সেটি নাড়িভুঁড়ির মতো জটিল কিংবা মগজের মতোই নিিদ্র। এই সংসদ নিয়ে তাই আমাদের মতো লোকেদের নাড়াচাড়া করা যৌক্তিক না। এবারের সংসদের কথাই বলি। এই সংসদের যিনি স্পিকার, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। করতালি দেওয়ার মতো ঘটনা। তক্কের খাতিরে বলি, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাশাসকদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘মিসক্রিয়েন্ট’ হিসেবে। আর তারা জাতি ধ্বংসকারী ভারতীয় চর। পাকিস্তানি সেনা সরকারের কাছে, কিছু বেসরকারি রাজনৈতিক লোক দলের পরিচয়ে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-নেতা। তারা পাকিস্তান রক্ষার জন্য মিসক্রিয়েন্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে। যদি তারা জিতে যেতেন, তাহলে আজকের মুক্তিযোদ্ধারা হতেন ‘মিসক্রিয়েন্ট’। কিন্তু জিতে যাওয়ায় তারা হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা। তারা কেবল দেশপ্রেমিকই নন, তাদের সহ্যের সীমা আকাশ সমান। আর পাকিস্তান হেরে যাওয়ায় রাজাকার, আল বদর, আল শামসরা হয়ে গেছেন দেশদ্রোহী, গাদ্দার। ওই ভালো ভালো নামগুলোর মানে দাঁড়িয়েছে, ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে। তারা বাংলাদেশ স্বাধীন হোক, তা চাননি। তারা চেয়েছেন পাকিস্তান। পাকিস্তান অটুট থাকলে যাকে আমরা ‘বাংলাদেশ’ বলছি, তা পূর্ব পাকিস্তানই থাকত। অর্থাৎ পাকিস্তানের পূর্বাংশ। এই পূর্বাংশ ভেঙে নতুন বাংলাদেশ করার পর আমরা জানতে ও বুঝতে পারলাম মিথ কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যায় নির্মিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর মওলানা ভাসানী কেন গর্জন করে উঠেছিলেন, ভারত আমাদের বন্ধু নয়, শত্রু। আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, অখ- ভারতের কথা তখন মিথের রূপটা বোঝা যায়। তার এখন প্রধান প্রকল্প অখ- ভারত রচনা। এই রচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গ্রাস করাই হলো প্রধান কাজ। সেটা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। কিন্তু মোদির মতো প্রকাশ্যে কেউ বলেনি। তার না বলা কথাও যে বলার চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে, তা আমরা গত ৫৪ বছর ধরে ভারতের আচরণ থেকেই দেখে আসছি।
প্রায় নিয়মিত বাংলাদেশের ভূখ-ে কৃষকরা ক্ষেতে কাজ করতে গেলে, বিএসএফের গুলির শিকার হন। এতে আজ পর্যন্ত কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, তার পরিসংখ্যান জরুরি না। জরুরি হচ্ছে, প্রায় প্রতিদিনই যে আমাদের ওপর রাইফেলের গুলি চলছে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া। ভারত মনে করে, তারা বাংলাদেশ স্বাধীন করে বাংলাদেশের নেতাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। তারা প্রকাশ্যে এখন সেটা বলছে এবং পালন করছে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। আমরাও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের গৌরবকে ধারণ করে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। এত করে একটা কন্ট্র্রাড্রিকশন জন্ম নিয়েছে যে, ভারত কি সত্যিই আমাদের স্বাধীনতা উপহার দিয়েছিল? বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের ৩ তারিখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ভারত। ঢাকাসহ কয়েকটি বড় শহর বাদে সব এলাকা মুক্ত করেছিল মুক্তিবাহিনী। ওই বাকি অংশও ভারতীয় বাহিনী মুক্ত করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায়। অথচ ভারতীয় বাহিনী কলকাতা থেকে দলিল তৈরি করে নিয়ে আসে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের। স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তারা চলে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থসহ বিভিন্ন সম্পদ কি লুট করে নেয়নি তারা? আমাদের চোখের সামনেই পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক অস্ত্র সরঞ্জাম ও সরকারি অফিস-আদালতের ফার্নিচারসহ সব কিছু তারা লুটে নেয়। সেগুলো সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল আটক করলে, পরবর্তী সময়ে তিনি শেখ মুজিব কর্র্তৃক ভর্ৎসিত হন। হারান পদ ও পদবি। তার মৃত্যুর পর, বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে তিনি মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। পুনর্বাসিত হয়েছেন জাতির চেতনায়। তিনি জানতে পারুন আর নাই পারুন, আমরা তো জানলাম আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করল। সে জন্য অবশ্যই বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ধন্যবাদার্হ হলেন। জামায়াত মনে করে, ২০২৪-এর ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান তারা ও তাদের তরুণরা করেছে। সেটা ভুল বা শুদ্ধ কি-না, সে বিবেচনা পরে করা যাবে। গণঅভ্যুত্থান কখনোই প্রচলিত শাসন মেনে হয় না। তাকে উৎখাত করেই তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। কিন্তু তরুণদের নেতৃত্বে যে অভ্যুত্থান হলো, সেখানে কি সেই বিস্ফোরণের জন-জোগান ছিল তাদের? ছিল না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল তরুণ তুর্কিরা, যাদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন ছিল। তারা বলেনি যে, তারা ছাত্রদল বা ছাত্রশিবির বা ছাত্রমৈত্রী বা ছাত্রদের অন্য সংগঠন করত। তারা রাজনীতিনিরপেক্ষ। তারা যোগ দিয়েছিল ফ্যাসিস্ট উৎখাতের একটি সুবর্ণ সুযোগকে ব্যবহার করতে। বিএনপি ১৭/১৮ বছর টানা আন্দোলন করেও হাসিনার মতো শিখ-ী ভারতীয় এজেন্টকে উৎখাত করতে পারেনি। সেটা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের কারণ। তারা বিপ্লবী দল নয়, ফলে অন্যরকম সিদ্ধান্তও নিতে পারেনি। সে-জন্য দরকার ছিল চরমপন্থার, গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাতের। বিএপির লক্ষ্য ছিল একটাই, তাহলো স্বৈরশাসক হাসিনা সরকারের পতন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ছিল চাকরি ক্ষেত্রে কোটার সংস্কারের বিষয়ে। এটুকুই তাদের রাজনৈতিক চিন্তা ছিল। কিন্তু হাসিনার ভুল ধীরে ধীরে সেই দাবি পরিণত হয় গণবিক্ষোভে। পরবর্তী সময়ে মানুষ হাসিনার নৃশংসতার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। পতন হয় ফ্যাসিস্টের। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী নেতৃত্ব রাষ্ট্রক্ষমতা দখল না করে, হাসিনার নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতির কাছে অন্তবর্তী সরকার শপথ নিল। ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের ইমেজ গড়ে নিলেন। আজ যখন সংসদে তাদের অনেকে এমপি হয়েছেন, তখনো তারা ভাবেননি যে, জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এটা রেওয়াজি ভাষণ। অথচ সেই ভাষণ শুনবেন না। কিন্তু তারা কি ভুলে গেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর এই রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথবাক্য উচ্চারণ করেছেন? এই রাষ্ট্রপতির কাছেই সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সাংসদরা শপথ নিয়েছেন? তাহলে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ তারা কোন যুক্তিতে পরিহার করলেন, ওয়াকআউট করলেন? সেটা কি এ-কারণে যে, রাষ্ট্রপতির ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়া, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হবে, সেই কারণে? রেওয়াজি ভাষণে রাষ্ট্রপতি যে কথাগুলো উচ্চারণ করেছেন তা মূলত সরকারের লিখে দেওয়া কথামালা। এর আগে তিনি হাসিনার নেতৃত্বাধীন সংসদেও হাসিনার লিখে দেওয়া ভাষণ পাঠ করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচত হওয়ার পর, সেই ব্যক্তির কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না। তিনি হয়ে পড়েন নিরপেক্ষ একজন মানুষ, মানে নো-ম্যানস ল্যান্ডের বাসিন্দা। তার কোনো পক্ষে যাওয়ার সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা তার নিশ্চয়ই আছে, তবে উচ্চারণ করতে পারেন না। তিনি কেন ২৪-এর গণহত্যা থামাতে পারেননি, সেই অপরাধে তাকে দোষারোপ না করাই ভালো। সে-ক্ষমতা তার নেই।
এই সব টুকরো-টাকরা কথাবার্তা যত হবে, ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে প্রশাসনে আমলাকুল। যারা যে কোনো রকম সংঘবদ্ধ দলের চেয়েও ভয়ংকর। ব্রিটিশদের তৈরি এই প্রশাসনিক স্ট্রাকচারের কোনো রদবদল হয়নি। টুকটাক জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে, নিজেদের শাসনের স্বার্থে। সংস্কারের একটা ভালো উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার রাজনৈতিক ভিশনারি ৩১ দফা জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন ২০২৩ সালে। সেখানে সংবিধান সংশোধন, প্রশাসনিক সংশোধনসহ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় যাবতীয় বিষয় তিনি সংক্ষেপে তুলে ধরেছিলেন। এসব সংশোধনসহ রাষ্ট্রব্যবস্থার কিছু সংস্কার না হলে বা করা না হলে যে প্রকৃত প্রস্তাবে জনগণের শাসন কায়েম করা যাবে না, সেই ধারণাই সেখানে আমরা পেয়েছিলাম। জনগণের শাসন মানে জনপ্রতিনিধিদের শাসন কায়েম করতে হলে, সব কিছুর আগে আমলাতন্ত্রে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের না-হক অধিকার খর্ব করতে হবে। তাদের প্যাচগুলো গভীরভাবে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে হবে। মূলত প্রশাসনের রাজনৈতিক স্ট্রাকচার পাল্টে দিতে হবে। সেটা কীভাবে করবে বর্তমান সরকার, সেটা ভেবে দেখতে হবে। প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, প্রভুর প্র্যাকটিস থেকে সেবকের আচরণে নামিয়ে আনতে হবে। সাংস্কৃতিকভাবে তাদের শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করতে হবে। আমরা ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণার স্যুটেড-বুটেড আমলা চাই না। আমরা চাই, জনগণের প্রকৃত সেবক যারা জনগণের দেওয়া ট্যাক্সের টাকায় বেতনভাতা পান। তারা যে রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা পান, তা উন্নয়নশীল দেশের জন্য কোনোভাবেই বহন করার মতো নয়। এসব প্রশ্নে আশা করতে চাই সরকারি ও বিরোধী দল তর্কে মাতুক, যুক্তিতে যুক্তিতে মুখরিত হোক শ্বেতপাথরে নির্মিত সংসদ ভবন। জনগণ কান পেতে আছে, কখন তাদের প্রতিনিধিরা তাদের আশার পতাকা তুলে ধরবেন জাতির সামনে।
এবার গপ্পো করতে পারেন, চায়ের টেবিল বা ফুটপাতের খোলা চায়ের দোকানে গরম গরম চা হাতে নিয়ে। শাক-সবজির দাম কতটা বাড়ল, কতটা কমল তা নিয়ে বাহাস হতে পারে। হতে পারে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট নিয়ে। কেন তারা এতটা লোভী। গরিব মানুষের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে তাদের এই যে মুনাফাখোরী, তার জন্য তো আখেরাতে লানত পাবেন তারা। শোনা গপ্পো বলি একটা। একজন শিল্পপতি ব্যবসায়ী, তিনি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক ছিলেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মরো মরো। তার সহযোগীদের বলেছিলেন যত টাকা লাগুক, আমাকে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার স্বাভাবিকতা এনে দাও আমি বাঁচতে চাই। তার সহযোগীরা কী বলেছিলেন, তা জানি না। তবে শুনেছি তিনি আল্লাহর সাহায্য চাননি। আল্লাহ তার জন্য কোনো শ্বাস-প্রশ্বাস বরাদ্দ করেননি। এ-কথা বললাম এ জন্য যে, ব্যবসায়ীরা যেন নিজেদের লোভের জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করেন।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও চিন্তক
mahboob.hasan08@gmail.com