বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তায় সতর্কতা

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি ও কৃষিব্যবস্থার ওপর নতুন অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এই পরিবেশে জ্বালানি ও কৃষি খাত ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানে সামরিক হামলা এবং তার  জেরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে শুধু তেল বা গ্যাস নয়, বিশ্ব জুড়ে সার সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালিটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ। এই পথে সামান্য অচলাবস্থা দ্রুত বৈশ্বিক বাজারে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে,  এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং খাদ্য মূল্যের ওপর। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে বিবেচিত। এই সরু জলপথ দিয়ে  প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস এবং রাসায়নিক কাঁচামাল পরিবহন হয়। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের একটি বড় অংশও এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

মধ্যপ্রাচ্যের বহু সার উৎপাদনকারী দেশের রপ্তানি এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। বিভিন্ন গবেষণা ও বাণিজ্যিক তথ্য অনুযায়ী,  বিশে^ বাণিজ্যে সারের কাঁচামালের প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ এই প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিক চলাচলে সামান্য বিঘ্ন  ঘটলেও, তার প্রভাব দ্রুত বিশ্ববাজারে প্রতিফলিত হয় এবং জ্বালানি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট পণ্যের দামে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশ্ব কৃষি আজ যে পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, তার নেপথ্যে কৃত্রিম সারের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে নাইট্রোজেনভিত্তিক সার আধুনিক কৃষিব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। কারণ উচ্চ ফলনশীল ফসল উৎপাদনে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই নির্ভর করে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কাতার, সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান বিশ্বে ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া ও সালফারের বড় রপ্তানিকারক। এই অঞ্চল থেকে প্রতি বছর কয়েক কোটি টন ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া বিশ্ববাজারে যায়, যা বহু দেশের কৃষি উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। ইরান থেকেও প্রায় ৫ মিলিয়ন টন ইউরিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয় এবং সৌদি আরব থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নাইট্রোজেনভিত্তিক সার বিশ্ববাজারে যায়।

বৈশি^ক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সালফার বাণিজ্যের প্রায় ৪৪ শতাংশ, ইউরিয়া বাণিজ্যের প্রায় ৩১ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়া বাণিজ্যের প্রায় ১৮ শতাংশ এই অঞ্চলের বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরগুলো বৈশ্বিক সার সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে এবং আন্তর্জাতিক কৃষি অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই হরমুজ প্রণালির মতো একটি সরু করিডরে সামান্য অচলাবস্থা, বিশ্বব্যাপী সার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে এবং কৃষিনির্ভর বহু দেশের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনার সময় সামুদ্রিক বাণিজ্যে সাধারণত কয়েকটি বড় সমস্যা দেখা দেয়, যা দ্রুত আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজ এই পথে চলাচল বন্ধ করে দেয় অথবা বিকল্প দীর্ঘ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। ফলে পণ্য পরিবহনের সময়ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধঝুঁকির কারণে জাহাজ বীমার খরচ হঠাৎ বাড়ে এবং শিপিং কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যে প্রভাব পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বন্দরের কার্যক্রম সীমিত হয়, জাহাজ ওঠানামা কমে যায় এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানাগুলোও উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু গ্যাসভিত্তিক সার কারখানা ইতিমধ্যে উৎপাদন কমিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নাইট্রোজেন সার তৈরির মূল কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস, যার উৎপাদন খরচের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহে বিঘœ ঘটলে সারের উৎপাদন দ্রুত কমে এবং বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দেয়। আবার জাহাজ চলাচল সীমিত হলে কাতার, সৌদি আরব বা ইরানের মতো দেশের উৎপাদিত সার বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প স্থলপথ না থাকায় সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয়। সংঘাত শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে এবং পণ্যবাজার বিশ্লেষকরা এ প্রবণতাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। বিশেষ করে, মিসরের ইউরিয়া আন্তর্জাতিক বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বহু দেশ এই মূল্য অনুসরণ করে নিজেদের আমদানি চুক্তি নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে এর দাম ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি টন প্রায় ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক সারবাজারে দ্রুত পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। কয়েক সপ্তাহ আগেও দাম ছিল প্রায় ৪৮৪ থেকে ৪৯০ ডলারের মধ্যে।  ফলে অল্প সময়ে এই হঠাৎ বৃদ্ধি বাজারের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দাম আরও বাড়তে পারে। তেলের মতো সারের ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাপী বড় কোনো কৌশলগত মজুদ নেই। ফলে সরবরাহ সামান্য কমলেই দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু সারের বাজারে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি করিডর। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, অর্থাৎ বিশ্বে সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই করিডরের ওপর নির্ভরশীল।

সরবরাহ পথ বন্ধ বা সীমিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং তার প্রভাব পড়ে কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেল, সেচ যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর। ফলে কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়ে এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতি অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়বে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি আরও বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদন সরাসরি বৈশি^ক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ছয় থেকে সাত মিলিয়ন টন অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে যা শিল্প খাত, কৃষি উৎপাদন, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার থেকে।  যা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো বাধা দেখা দিলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন, সেচ ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন খাতে, ফলে দেশের অর্থনীতি এবং কৃষিনির্ভর খাতের কার্যক্রম অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে পারে। একইভাবে বাংলাদেশের কৃষি খাতেও সারের আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য। দেশে প্রতি বছর প্রায় ছয় থেকে সাত মিলিয়ন টন বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি এবং এমওপি উল্লেখযোগ্য। যদিও দেশে কয়েকটি ইউরিয়া কারখানা রয়েছে, তবুও চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সার ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এর ফলে কৃষকরা কোন ফসল চাষ করবেন তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য হন। গবেষকদের মতে, নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার সামান্য কমলেও ফসলের ফলনে তুলনামূলকভাবে বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে। এতে বিশ্ব জুড়ে কয়েক মিলিয়ন টন খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে এর প্রভাব ধীরে ধীরে পশুখাদ্য বাজার, গবাদিপশু উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা খাদ্যপণ্যের দামে গিয়ে পড়ে।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে, বিশ্ববাজারে খাদ্য ও সারের বড় সংকট তৈরি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বিশ্লেষকের কাছে সেই সংকটের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। কারণ এবার সংঘাত এমন একটি অঞ্চলে ঘটছে,  যেখান থেকে বিশ্বে জ্বালানি ও সারের বড় অংশ সরবরাহ করা হয়। যদি হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকে তাহলে শুধু তেলের দাম নয় সার, রাসায়নিক কাঁচামাল এবং কৃষি উৎপাদনের ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের মূল্যে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়বে। গ্যাস ও তেলের দাম বাড়লে সারের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে সারের ঘাটতি হলে খাদ্য উৎপাদন কমে। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা শুধু ভূরাজনৈতিক সংকট নয়, এটি বৈশি^ক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বিশ্বের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৌশলগত মজুদ বাড়ানো এবং কৃষি উৎপাদনকে স্থিতিশীল করার পথ খুঁজে বের করা। কারণ জ্বালানি ও সারের সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেখা দিলে,  তার শেষ অভিঘাত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের খাদ্যের ওপর।

লেখক:  সিনিয়র কৃষিবিদ  অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা  চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন

rssarker69@gmail.com