বইমেলার ভবিষ্যৎ বইয়ের ভবিষ্যৎ

অমর একুশে বইমেলা শেষ হওয়ার পর এবার একটি অদ্ভুত দ্বৈত চিত্র সামনে এসেছে। একদিকে মেলা পরিচালনা কমিটির হিসাবে বলা হচ্ছে১৭ দিনে প্রায় ১৭ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে প্রকাশকদের একটি অংশ বলছেন, বাস্তবে বিক্রি এতটা হয়নি; বরং পরিস্থিতি ‘কোভিডের সময়ের চেয়েও খারাপ’। প্রকাশকদের সংগঠন প্রকাশক ঐক্য দাবি করেছে, গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। দুটি পরিসংখ্যানের মধ্যে এই বিপুল ফারাক শুধু হিসাবের পার্থক্য নয়; এটি আমাদের বই পাঠাভ্যাস সংস্কৃতির এক গভীর সংকেত। ফলে প্রশ্নটি শুধু বইমেলার নয় প্রশ্নটি বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বইমেলা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্র্ণ  ঘটনা। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি থেকে জন্ম নেওয়া এই আয়োজন দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির উৎসব হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বইমেলার পরিবেশে একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। মেলায় বইয়ের চেয়ে কখনো কখনো আলোচনায় চলে আসে ভিড়, খাবারের স্টল, সেলফি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতি। বইমেলা যেন ধীরে ধীরে বইয়ের বাজারের পাশাপাশি এক ধরনের

সাংস্কৃতিক মেলামেশার জায়গায় পরিণত হয়েছে। এদিকে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি পাঠাভ্যাসের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের যুগে মনোযোগের সময় ক্রমশ কমে যাচ্ছে। গবেষণা বলছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানুষের মনোযোগ এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার যে ধৈর্য দরকার, তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগের মতো তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে, বইয়ের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে ই-বুক, অডিওবুক এবং নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। অধিকাংশ তরুণ বই পড়ার বদলে, গল্প শোনে বা ভিডিও দেখে। আমাজনের অডিওবুক প্রতিষ্ঠার অঁফরনষব কিংবা স্থানীয় বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে বই এখন শোনাও যায়। ফলে পাঠের মাধ্যম বদলে যাচ্ছে, যদিও গল্প বা জ্ঞানের প্রতি মানুষের আকর্ষণ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এই পরিবর্তনকে অনেকেই ‘পোস্ট-লিটারেট সমাজ’-এর সূচনা বলে ব্যাখ্যা করছেন। যেটি এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ লিখতে-পড়তে জানে, কিন্তু নিয়মিত পাঠচর্চা করে না। ফলে বইয়ের জায়গা দখল করে নেয়,  দ্রুত উপভোগ্য দৃশ্য-শব্দের কনটেন্ট। 

ইতিহাস আমাদের ভিন্ন কথা শেখায়। প্রযুক্তি যতবার এসেছে, ততবারই বইয়ের মৃত্যু ঘোষণা করা হয়েছে। রেডিও এলে বলা হয়েছিল, বই শেষ। টেলিভিশন আসার পর বলা হয়েছিল, মানুষ আর পড়বে না। এরপর ইন্টারনেট এলে একই কথা শোনা গেল। কিন্তু বাস্তবে বই হারিয়ে যায়নি। বরং নতুন রূপে, নতুন মাধ্যমে ফিরে এসেছে। সমস্যা আসলে বইয়ের অস্তিত্বে নয়, পাঠাভ্যাসে। বই পড়া একটি সামাজিক অভ্যাস। পরিবারে যদি বইয়ের উপস্থিতি না থাকে, যদি শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়া না হয়, তবে পাঠের সংস্কৃতি তৈরি হয় না। একসময় বাঙালি সমাজে বই ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় উপহার। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা উৎসব প্রত্যেক জায়গায় বইয়ের উপস্থিতি ছিল। সেই সামাজিক অভ্যাস আজ দুর্বল হয়ে পড়েছে। আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। বইয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে লেখক হওয়ার আকাক্সক্ষাও। চেক বংশোদ্ভূত লেখক মিলান কুন্ডেরা তার এক উপন্যাসে এই প্রবণতাকে ‘গ্রাফোম্যানিয়া’ নামে অভিহিত করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে, এআইয়ের যুগে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। আমরা লিখছি, বলছি; কিন্তু পড়ছি কতটা? সেদিন এক লেখককে বললাম, আপনার লেখাটা বড় হয়ে গিয়েছিল। তাই এআই দিয়ে সামারি করে পড়ছি। বোঝার চেষ্টা করেছি, কী বলা হয়েছে। পরক্ষণে তিনি হেসে বললেন এভাবেই চলছে, কেউ কারও লেখা পড়ে না। আগামীতে সবাই সামারি করে করে পড়বে। লেখা থাকবে নামে মাত্র। বইমেলার ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর। যদি পাঠক কমে যায়, তাহলে বইমেলা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে যেখানে বই থাকবে, কিন্তু পাঠকের আকুলতা থাকবে না। কিন্তু হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ বইয়ের শক্তি অন্য যে কোনো মাধ্যমের চেয়ে গভীর।

চলচ্চিত্র, ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুহূর্তের বিনোদন দিতে পারে, কিন্তু চিন্তার দীর্ঘ ও সুসংবদ্ধ যাত্রা সম্ভব হয় বইয়ের মধ্য দিয়ে। মানবসভ্যতার বড় বড় ধারণা দর্শন, বিজ্ঞান কিংবা রাজনীতি সবকিছু মূলত বইয়ের পাতাতেই গড়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় বইয়ের ভবিষ্যৎ হয়তো একমুখী নয়। সামনে সম্ভবত একটি সংকর জগৎ তৈরি হবে যেখানে মুদ্রিত বই, ই-বুক এবং অডিওবুক একসঙ্গে থাকবে। পাঠের মাধ্যম বদলাবে, কিন্তু গল্প ও জ্ঞানের প্রয়োজন শেষ হবে না। শেষ পর্যন্ত বই টিকে থাকবে কি না এই প্রশ্নের উত্তরও জটিল নয়। বই বাঁচে পাঠকের ভেতরে। যদি পাঠকের মন জেগে থাকে, তবে বইও জেগে

থাকবে। আর বই জেগে থাকলে, বইমেলাও তার অর্থ হারাবে না। ফরাসি দার্শনিক রোলা বার্ত এক সময় বলেছিলেন ‘লেখকের মৃত্যু ঘটতে পারে, কিন্তু পাঠের অর্থ কখনো মরে না।’ অর্থাৎ, বইয়ের প্রকৃত জীবন লেখকের হাতে নয় পাঠকের মনে। যতদিন পাঠক থাকবে, ততদিন বইও নতুন অর্থে পুনর্জন্ম নেবে।  অন্যদিকে ইতালীয় চিন্তক উমবার্তো ইকো বলেছিলেন, বই হলো চামচ বা কাঁচির মতো। একবার আবিষ্কার হলে, আর কখনো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। প্রযুক্তি বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু মানুষের চিন্তার গভীরতা অর্জনের জন্য বইয়ের বিকল্প খুব কমই আছে। ফলে প্রশ্নটা আসলে বই থাকবে কি না, বইমেলা থাকবে কি থাকবে না সেটা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা পাঠক হিসেবে কেমন সমাজ গড়ে তুলছি? যদি পরিবার, বিদ্যালয় ও সংস্কৃতির ভেতরে পাঠের অভ্যাস বাঁচিয়ে রাখা যায়, তবে বই শুধু টিকে থাকবে না নতুন রূপে ফিরে আসবে। শেষ পর্যন্ত বইয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করবে পাঠকের হৃদয়। যদি মানুষের ভেতরে জিজ্ঞাসা, বিস্ময় ও চিন্তার তৃষ্ণা জেগে থাকে, তবে বই কখনো নিঃশেষ হবে না আর বইমেলাও কেবল একটি উৎসব নয়, একটি সভ্যতার স্মৃতি হয়ে টিকে থাকবে।

লেখক : গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

anarjomurshid@gmail.com