এয়ারলাইনস ব্যবসা খাদের কিনারে

বিশ্ব রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ অ্যাভিয়েশন শিল্পেও। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত পথপরিক্রমার কারণে খরচের বোঝা সামলাতে না পেরে খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের বহু নামি এয়ারলাইনস। এর ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের বিমান চলাচলেও।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আয় আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। যাত্রীদের জন্য আকাশপথ এখন এতটাই ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যগামী অনেক যাত্রী বাসে করে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।

বেবিচক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিনই ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সহস্রাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে বেশ কিছু এয়ারলাইন কোম্পানি ফ্লাইট চালু করলেও ঘুরপথে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। তাদের খরচ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি বিমানের জ্বালানির দামও বেড়েছে। বলা যায়, রাহুর কবলে পড়েছে এয়ারলাইনস কোম্পানি। তারপরও বেবিচক ও উড়োজাহাজ কোম্পানিগুলো যাত্রীসেবা দিতে নানা পরিকল্পনা করেছে। শ্রমিক ও অন্য যাত্রীদের জেদ্দায় নিয়ে বাসে করে অন্য দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে এয়ারলাইনগুলো। কুয়েত এয়ারলাইনস বেবিচককে বলেছে, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যাওয়া বাংলাদেশিদের তারা সড়কপথে কুয়েত নিয়ে যাবে। অন্য এয়ারলাইনগুলোও একই পদ্ধতি নিতে যাচ্ছে।

অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এয়ারলাইনগুলো ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলা করছে। প্রতিদিনই ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে।

তেলের দামও বেড়েছে। এভাবে সমস্যা বাড়তে থাকলে কিছু এয়ারলাইনস দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতিতে ফ্লাইট বাতিলের ফলে অ্যাভিয়েশন খাতে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তার জন্য ফ্লাইট স্থগিত রাখা হলেও এ ক্ষতি মেটাতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনগুলো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। বিদেশির পাশাপাশি দেশি এয়ারলাইনসও আর্থিক সংকটে পড়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস বাংলাসহ সাতটি উড়োজাহাজ সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করছে। মধ্যপ্রাচ্য রুটে সর্বনিম্ন ১৬২ ও সর্বোচ্চ ৪১৯ আসনের চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান। ইউএস বাংলার রয়েছে তিনটি আলাদা ফ্লাইট। এসব এখন স্থগিত। গত অর্থবছরে ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকার রেকর্ড পরিমাণ আয় করেছে বিমান; এবার সংকটে পড়তে পারে বলছে কর্তৃপক্ষ। ইউএস বাংলারও একই পরিস্থিতি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রলয়ংকরী প্রভাব : ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা আকাশপথের মানচিত্রকে ওলটপালট করে দিয়েছে। জর্ডান, ইরাক, সিরিয়া এবং ইরানের আকাশপথ বন্ধ হওয়ায় এশীয় ও ইউরোপীয় এয়ারলাইনগুলো তাদের রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। গত দুই দশকে অ্যাভিয়েশন খাত এমন সংকটে পড়েনি। বড় বড় কোম্পানি তাদের বহর কমিয়ে ফেলছে এবং অনেক রুট বন্ধ করে দিয়েছে। আগে ঢাকা থেকে ইউরোপে যেতে যে সময় লাগত, আকাশপথ পরিবর্তনের কারণে এখন দুই-তিন ঘণ্টা বেশি সময় লাগছে। ফলে সামগ্রিক খরচ বেড়েছে। পর্যটনমূলক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণও অনেক কমেছে।

জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম : আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের মতো বেড়েছে। এয়ারলাইনগুলোর পরিচালনা ব্যয়ের ৩৫-৪০ শতাংশই হয় জ্বালানি খাতে। এ আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে মুনাফা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গত ৮ মার্চ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে; গত মাসে ছিল ৯৫ টাকা ১২ পয়সা। লিটারপ্রতি ১৭ টাকা ২৯ পয়সা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জ্বালানির দামও বেড়েছে। প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য শূন্য দশমিক ৬২৫৭ ডলার থেকে বেড়ে শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার হয়েছে।

চরম সংকটের কথা বললেন কর্তৃপক্ষ : ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কার্যক্রম বন্ধ থাকলে আয় হয় না, তবে বাকি সব খরচ বহাল থাকে। এয়ারলাইনসকে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত অপারেশন থাকতে হয়। অপারেশন না থাকলেই সংকট। বন্ধ হয়ে যেতে পারে এয়ারলাইনস।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম বলেন, ‘ফ্লাইটগুলো বসে আছে। ফ্লাইট যাচ্ছে না মানে আমাদের ইনকাম নেই। বিশাল ক্ষতি হচ্ছে আমাদের।’

আয় কমে গেছে বেবিচকের : বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আয়ের বড় উৎস ওভারফ্লাইং চার্জ ও ল্যান্ডিং ফি। মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যকার রুটে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার কমে যাওয়ায় সংস্থাটির রাজস্বে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক বিদেশি এয়ারলাইনস এখন দক্ষিণ এশীয় রুট এড়িয়ে বিকল্প পথে চলায় বেবিচকের মাসিক আয় ২০-২৫ শতাংশ কমেছে। তৃতীয় টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য যে পরিমাণ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, তা অর্জন করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ এবং পার্কিং ফি থেকেও আয় কমেছে।

আকাশপথের বিকল্পপথ ব্যবহারের পরিকল্পনা : পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি ও এয়ারলাইনস জোট নতুন এয়ার করিডরের পরিকল্পনা করছে। ইরান বা ইসরায়েলের আকাশসীমা এড়িয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার রুটগুলো এখন জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এ রুটগুলো দীর্ঘ হওয়ায় খরচ কমছে না। খরচ বাঁচাতে অনেক এয়ারলাইনস এখন ‘ফ্লাইট অপ্টিমাইজেশন সফটওয়্যার’ ব্যবহার করছে।

বাসে করে কুয়েত, চরম বাস্তবতায় অভিবাসী শ্রমিকরা : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নিরাপত্তাজনিত অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশি যাত্রীদের ওপর। কুয়েতসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, আটকে পড়ছেন হাজারো প্রবাসী। এ অবস্থায় বেবিচককে বিকল্প পথের প্রস্তাব দিয়েছে কুয়েত এয়ারওয়েজ। তারা বলেছে, বাংলাদেশে আটকে পড়া যাত্রীদের সৌদি আরবের যাওয়ার পর সড়কপথে কুয়েতে নিয়ে যাওয়া হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে কুয়েত তাদের আকাশসীমা ও কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা চালু রাখতে চায় তারা। প্রস্তাবটি বাস্তবসম্মত কি না, বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বেবিচক কর্মকর্তারা।

সংযোগ ফ্লাইটেও বিড়ম্বনা : উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম বড় বিমান ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করে, যেখানে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে যাতায়াতকারী যাত্রীরা সংযোগ ফ্লাইট নেন। আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের বড় একটি অংশ সংযোগ ফ্লাইটের জন্য এমিরেটস, কাতার, ইতিহাদ ও সাউদিয়া এয়ারলাইনসের মতো উপসাগরীয় বিমান সংস্থার ওপর নির্ভর করেন। এখন সংযোগ ফ্লাইটেও বিড়ম্বনা চলছে।

সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে এসেছে : শাহজালালে সাধারণত প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে এবং ৪৫ হাজারের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। সংঘাত শুরুর পর প্রতিদিন গড়ে ৪২টি ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। ফলে অবতরণ ও পার্কিং ফি, নেভিগেশন চার্জ, যাত্রীসেবা ফি, নিরাপত্তা ফি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ থেকে আয় কমে গেছে। বাংলাদেশে সব বিদেশি এয়ারলাইনসকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সংস্থাটি সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়েছে। ফলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে গেছে।

ফ্লাইট স্থগিতে চাপ বেড়েছে বিদেশি এয়ারলাইনসে : যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আসা-যাওয়া করতে পারছেন না যাত্রীরা। যারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হয়ে ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোতে যাওয়ার টিকিট কেটেছিলেন, তারাও ভ্রমণ করতে পারছেন না। যাদের জরুরি ভ্রমণ দরকার হচ্ছে, তাদের কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়ে বিকল্প পথের এয়ারলাইনস বেছে নিতে হচ্ছে।

ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপ-আমেরিকার গন্তব্যের যাত্রীদের প্রচুর চাপ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলোতে অন্যান্য এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্থগিতের কারণে চাপ বেড়েছে।’

টার্কিশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এড়িয়ে ঢাকা-ইস্তাম্বুল যাত্রী পরিবহন করে টার্কিশ এয়ারলাইনস। ফ্লাইট পরিচালনায় জ্বালানি খরচ বেড়েছে।’

বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবের জেদ্দা, মদিনা, রিয়াদ, দাম্মামের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছিল। পরদিন দাম্মাম বাদে অন্য বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট চলাচল করে। সাউদিয়া এয়ারলাইনসের ইউরোপ-আমেরিকাগামী ফ্লাইটগুলো সীমিত আকারে চলছে। শুরু থেকেই কুয়েত, শারজাহ, বাহরাইন, কাতার, দুবাইয়ের অধিকাংশ ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে।’