অবশেষে থামল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর কাব্য। বিশ্ব ফুটবলের রাজপুত্র, আলবিসেলেস্তেদের হৃৎস্পন্দন লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানালেন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের নীল-সাদা জার্সি গায়ে আর কখনো উইং ধরে প্রতিপক্ষের রক্ষণ চিরে কিংবা দূরপাল্লার জাদুকরী শটে সমর্থকদের উন্মাদনায় ভাসাতে দেখা যাবে না ১০ নম্বর জার্সির এই জাদুকরকে। এক আবেগঘন বার্তায় ও বিদায়ী ভিডিও প্রকাশ করে নিজের দুই যুগের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন বিশ্বকাপজয়ী এই অধিনায়ক।
মেসি জানান, স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল হারার ঠিক দুদিন পর, গত ২১ জুলাইতেই তিনি বিদায়ের সিদ্ধান্তটি লিখে রেখেছিলেন। সম্প্রতি তার প্রিয় বাবার আকস্মিক প্রয়াণের পর এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে তিনি আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। শেষ মুহূর্তে ইন্টার মায়ামির হয়ে এক ম্যাচে ৪ গোল করে নিজের চিরাচরিত ক্ষুরধার ফর্ম দেখালেও, জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি এই মহাতারকা।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত বার্তায় মেসি তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেন এভাবে, ‘ফাইনালের পর এতদিন ধরে অনেক ভেবেচিন্তে আমি জানাচ্ছি যে, জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি। সিদ্ধান্তটি নিতে গিয়ে আমার হৃদয় ফেটে যাচ্ছিল, এখনো ভীষণ কষ্ট হচ্ছে; তবে আমি বুঝতে পারছি, এটাই থেমে যাওয়ার সঠিক সময়।’
তিনি বলেন, ‘ঈশ্বর সাক্ষী, আমি সবসময় নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছি। শুধু শেষ কয়েক বছরে যখন আমরা সবকিছু জিতলাম তখন নয় তার আগেও কঠিন সময়ে সবসময় লড়াই করেছি। এই জার্সির জন্য, আপনাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এবং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত করার জন্য নিজের সবটুকু দিয়েছি।’
তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা দলকে নেতৃত্ব দেওয়া মেসি লিখেন, ‘একটি সুন্দর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে, যা আমাকে ভীষণ বেদনাহত করে। আমি জাতীয় দলকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি এবং সারা জীবন বেসে যাব। তবে আমি নিজেকে একদম খালি করে দিয়েছি, আমার আর দেওয়ার কিছু নেই। তা ছাড়া পেছনে অনেক অসাধারণ তরুণ খেলোয়াড় উঠে এসেছে, যারা এই জায়গায় খেলার সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।’
সমর্থকদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘গত ২০ বছরের ভালোবাসার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। মাঠের ভেতর থেকে আপনাদের গর্জন আর চিৎকার মিস করব। এখন থেকে আমিও আপনাদের মতো গ্যালারিতে বা বাইরে থেকে দলের সমর্থনে গলা ফাটাব ভালো এবং খারাপ, সব সময়েই।’
পরিবার, সতীর্থ, কোচ ও কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেসি লেখেন, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন বানিয়ে জন্ম দেওয়ার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আপনাদের সঙ্গে কাটানো এই রূপকথার মতো সময়গুলোর জন্য গর্বিত। ‘ভামোস আর্জেন্টিনা’!
ক্যারিয়ারের শুরু ও প্রাথমিক সাফল্য
২০০৫ : অভিষেক ও লাল কার্ড : হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে আন্তর্জাতিক অভিষেক। মাঠে নামার মাত্র ৪৩ সেকেন্ডের মধ্যে লাল কার্ড দেখেন।
২০০৬ : প্রথম বিশ্বকাপ : সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিরুদ্ধে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপে প্রথম গোল।
২০০৮ : অলিম্পিক সোনা : বেইজিং অলিম্পিকে আর্জেন্টিনাকে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে স্বর্ণপদক এনে দেন।
২০১৪ : বিশ্বকাপ ফাইনাল : মারাকানায় জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হার। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল লাভ।
২০১৬ : প্রথম অবসর : তীব্র হতাশায় মাত্র ২৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা। কয়েক মাস পর ভক্ত ও দেশের টানে আবার ফিরে আসা।
২০২১ : প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি : ফাইনালে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়। দেশের হয়ে মেসির প্রথম বড় শিরোপা।
২০২২ : ফিনালিসিমা : ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে ফিনালিসিমা ট্রফি অর্জন।
২০২২ : কাতার বিশ্বকাপ জয় : ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার বহু আকাক্সিক্ষত বিশ্বকাপ জয়। মেসি ৭ গোল করে টুর্নামেন্টের সেরা (গোল্ডেন বল) হন।
২০২৪ : ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকা : কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন।*
২০২৬ : ষষ্ঠ বিশ্বকাপ রেকর্ড : ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড ৬টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৩৪টি ম্যাচ খেলা এবং আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৮টি গোলের রেকর্ড। ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ে ১-০ ব্যবধানে হার।
মোট ম্যাচ ২০৭, গোল ১২৫, অ্যাসিস্ট ৬৮, মোট গোল অবদান ১৯৩, হ্যাটট্রিক ১০।