দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম হঠাৎ করে বড় পরিমাণে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গতকাল মঙ্গলবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ নতুন মূল্যহার ঘোষণা করা হয়, যা একই দিন মধ্যরাত থেকে কার্যকর হবে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে একলাফে বেড়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে লিটারপ্রতি দাম বেড়েছে ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ০.৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার প্রায় ৭৯ শতাংশ। বিইআরসি জানিয়েছে, বিদ্যমান বাজার পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন এ দর আগামী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেট ফুয়েলের এ বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি বিমান ভাড়ায় পড়তে পারে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রুটে ভাড়া বাড়ার সম্ভাবনা বেশি, যা যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে।
সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি এওএবির : দেশে জেট ফুয়েলের দামে একলাফে প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি)। সংগঠনটি বলছে, এ সিদ্ধান্ত দেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এওএবি জানায়, বিইআরসি জেট এ-১ জ্বালানির মূল্য হঠাৎ করে বড় পরিসরে বাড়িয়েছে, যা বর্তমান বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিইআরসি ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত সভায় ৫ থেকে ২২ মার্চ সময়ের প্ল্যাটস রেটের গড়, জানুয়ারি-জুন সময়ের পরিবর্তিত প্রিমিয়াম, ডলারের বিনিময় হার এবং ডিজেলের মূল্য অপরিবর্তিত ধরে জেট ফুয়েলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বেড়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা হয়েছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার মূল্য ০.৭৩৮৫ থেকে বেড়ে ১.৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এওএবির সেক্রেটারি জেনারেল মফিজুর রহমান বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জানিয়েছে। গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ দেশে এসেছে এবং এসব তেল আগের নির্ধারিত দামেই কেনা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সাম্প্রতিককালে তেলের দাম কমতির দিকে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাকে ভিত্তি করে এত বড় বৃদ্ধি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তিনি আরও বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এই মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে বেশি। যেখানে ভারত ও নেপাল জেট ফুয়েলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে, সেখানে পাকিস্তানে ২৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তুলনায় বাংলাদেশে প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি অত্যন্ত উচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়।
এওএবি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, নতুন এ মূল্য কার্যকর হলে দেশের এয়ারলাইনসগুলো মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়বে। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের ওপর, বাড়বে বিমান ভাড়া। একই সঙ্গে জেট ফুয়েলের ওপর কর বৃদ্ধির কারণে পরিচালন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যা পুরো অ্যাভিয়েশন খাতের টেকসই উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সংগঠনটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে এওএবি বলেছে, বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা জরুরি।