স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়নি। মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আদর্শও অক্ষুণœ থাকেনি। রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদসহ বিশিষ্টজনের দাবি, রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষা খাতে সুদীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ যতটা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল, বাস্তবে তা ব্যাহত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতাকে বড় করে দেখে বিশিষ্টজনরা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ৫৫ বছরের বাংলাদেশে সুশাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি মানবেতর অবস্থার ভেতর দিয়ে গেছে। নারী অগ্রগতি ঘটলেও নারীদের অংশীদারত্বের উন্নয়ন ঘটেনি। শ্রমিক কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে পরিচিতি পায়নি, অতিসম্প্রতি কূটনীতিক সম্পর্ক বিনষ্ট হয়েছে। বাণিজ্য পরিস্থিতির রুগ্্ণদশা। কোনো সূচকেই কল্যাণকর রাষ্ট্রের ভূমিকায় নেই ৫৫ বছরের বাংলাদেশ।
অর্থনীতিবিদ ড. আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মধ্য দিয়ে দেশের সব মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। পাকিস্তানের মতো হবে না বাংলাদেশ। ২২ পরিবার থাকবে না। সামরিকীকরণ হবে না। এসব প্রত্যাশা ভাঙতে শুরু করেছে স্বাধীনতার পর থেকে। খুব দ্রুত প্রত্যাশা ভঙ্গ হয়েছে। সামরিক সরকারে ঢুকে গেছি আমরা। বৈষম্য বেড়ে গেছে।’
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘অর্থনীতির আয়তন বেড়েছে। জিডিপিতে উল্লম্ফন ঘটেছে। রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদনমুখী শিল্পের প্রসার ঘটেছে। কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। ৫৫ বছরের পুরনো বাংলাদেশে উৎপাদনশিল্প যেভাবে বেড়েছে, তাতে নিরাপদ খাদ্য পাওয়া মুশকিল হয়ে উঠেছে। নিরাপদ পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবেশগত সমস্যা প্রবল হয়ে উঠেছে। খাল-বিল, নদী-নালা, স্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার ক্ষতি অনেক বেড়েছে। নদী-বন নষ্ট করে, খাল-বিল দখল করে অতীতের বিভিন্ন সরকারের সময় বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। চোরাই টাকার অর্থনীতির দাপট বেড়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি করেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিকাশ ঘটেছে। প্রাণ-প্রকৃতি ঝুঁকিতে পড়েছে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অতীতের সরকারগুলো শুধু মুনাফামুখী অর্থনীতির তৎপরতার প্রতি অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে পুঁজিপতি লুটেরা ধনিকশ্রেণি তৈরি হয়েছে। ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই উন্নয়ন নীতিমালায় মনোযোগী ছিল না অতীতের সরকারগুলো। গোষ্ঠীস্বার্থ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করতে গেলে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ৫৫ বছরের বাংলাদেশে জিডিপি বেড়েছে, কিন্তু দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়েই আছে। ৫৫ বছরের বাংলাদেশে শিক্ষা ও চিকিৎসা জনগণের জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অথচ এ দুটি খাতই জনগণের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা ও চিকিৎসা দুটি খাতই বাণিজ্যিকীকরণ ও নৈরাজ্যকীকরণ বেড়েছে। ৫৫ বছরের বাংলাদেশে অতিসম্প্রতি যেসব চুক্তি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদি বিপদে ফেলবে বাংলাদেশকে দাবি করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ড. রাশেদা কে চৌধূরী এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরের বাংলাদেশে নারীরা এখনো অংশীদারত্বের জায়গায় আসতে পারেনি। কিন্তু সব সেক্টরে নারীশ্রম অর্থনৈতিক জায়গাকে সচল রেখেছে। তার দাবি, বাংলাদেশ যে কারণে এগিয়েছে, যতটাই এগিয়েছে, তার পরতে পরতে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা খাত, শ্রমন্নোয়নসহ সব সেক্টরের উন্নয়নে নারীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু নীতিনির্ধারণী জায়গায় নারীর অংশীদারত্ব কোথায়? ফাঁকা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীকে কীভাবে যেন টেনে ধরা হয়।
তিনি আরও বলেন, নারীর ক্ষেত্রে মনে হয় অলিখিত একটা নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক হও, মালিক হওয়া যাবে না। প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ৫৫ বছরের বাংলাদেশে তাৎপর্যপূর্ণভাবে কতটুকু এগিয়েছে নারী? কিন্তু বাংলাদেশ যতটুকু এগিয়েছে, যেটা নারীর কারণে। বাংলাদেশের চালিকাশক্তিই নারী।
রাশেদা কে চৌধূরী দুঃখ করে বলেন, এবার একটি বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ রাখেনি। অন্যরা মাত্র ৪ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছে। তাহলে দেখেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীকে কীভাবে টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের গোড়াপত্তন থেকে শিক্ষা খাতে অত এগোতে পারিনি। শুরুর দিকটা পেরেছি। ধীরে ধীরে পিছিয়েছি। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পার করলেও শিক্ষাব্যবস্থা ইউনিফাইড জায়গায় আনতে পারিনি। একটা শিক্ষা আইন করতে ব্যর্থ হয়েছি। শিক্ষা খাতে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো নেই। দুঃখজনক ব্যাপার হলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত মাতামাতি, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা-সমতা-ন্যায্যতা ও মানবতায় আমরা হোঁচট খেয়েছি। নতুন এ সরকারের মূল কাজ হবে, নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালিত করতে হবে। শিক্ষা খাতকে ইউনিফাইড জায়গায় নিয়ে আসতে হবে।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মেহাম্মদ শাহ আলম বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা-আদর্শ নিয়ে বিনির্মাণ হয়েছিল, তা বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যে আদর্শে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এবং ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় এসেছিল, ১৯৭৫ সালের পর তা রিভার্স হয়ে গেছে।
৫৫ বছর পরে এসেও বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকরূপ পায়নি। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আদর্শের রাজনীতি হোঁচট খেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে।
অধ্যাপক মাহাবুব উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা পতাকা, ভূখ- ছাড়া বেশি কিছু পাইনি। ৫৫ বছরের বাংলাদেশে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার বিরাট ফারাক। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সমতা-ন্যায্যতা ও মানবতার মন্ত্রে। এ তিনটি মূল লক্ষ্য ৫৫ বছরের বাংলাদেশে বহুদূরে চলে গেছে। বৈষম্য বিরাট আকার ধারণ করেছে। বৈষম্য থাকলে সাম্য নিশ্চিত হবে না। স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না। ৫৫ বছরের বাংলাদেশে বেকারত্ব, দুর্নীতি, অনিয়ম লুটপাট বেড়েই চলেছে। শিক্ষা-চিকিৎসায় নৈরাজ্যকরণ বেড়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা নেই। পাহাড়ে শান্তি নেই, বিদ্রোহ চলছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমরা কী আমাদের বাংলাদেশ বলতে পারি? পারি না।’
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘যে স্বপ্নদিনে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, ৫৫ বছরের বাংলাদেশ সেখান থেকে অনেক দূর পিছিয়ে আছে। দেশে গণতন্ত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, সমতা-ন্যায্যতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে ৫৫ বছরের বাংলাদেশে। ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ জিও পলিটিকসের স্বীকার হবে। বিভিন্ন সেক্টরে নড়বড়ে হয়ে আছে বাংলাদেশ। সবাইকে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’