ঢাকায়ও সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অনেক হাসপাতাল আছে। তারপরও বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, নানা কারণে। মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা সহনীয় মূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া মানুষদের দেশের চিকিৎসায় আস্থা ফেরানোর প্রত্যাশা নিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর গ্রিনরোডে যাত্রা শুরু করে ইউনিকো হাসপাতাল। দেশ রূপান্তরের নির্বাহী সম্পাদক সাহিদুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এমন প্রত্যাশার কথা জানান ইউনিকো হসপিটালস-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আর্দ্রা কুড়িয়েন। ভারতের কেরালার মানুষ আর্দ্রা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তিনি জানান, ২৫০ শয্যার ইউনিকো হাসপাতালে ১২ হাজারের বেশি মানুষ গত এক বছরে বিভিন্ন ধরনের সেবা নিয়েছেন। তাদের নেওয়া সেবার বেশিরভাগ বহির্বিভাগে দেওয়া (্ওপিডি) সেবা হিসেবে গণ্য হতে পারে। যিনিই এসেছেন, তাকেই একজন কনসালটেন্ট দেখে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়েছেন। এর বাইরে, এখন পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ১০০ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা নিয়েছেন
ইউনিকো হাসপাতালের কী বিশেষত্ব আছে?
আর্দ্রা কুড়িয়েন : সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গড়তে হলে অসুস্থ হয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে শুরুতেই রোগপ্রতিরোধে জোর দেওয়া দরকার। মানুষের আয়ুষ্কাল বাড়ছে। সব মিলিয়ে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কমিউনিটিভিত্তিক হলে ভালো সুফল পাওয়া যায়। এই দিকটি বিবেচনায় রেখে এখানে প্রিভেনটিভ কেয়ারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হৃদরোগে ন্যূনতম, না হলেই নয়, এমন কাটাছেঁড়াযুক্ত (মিনিমালি ইনভেসিভ) সেবা, নারীদের মা হওয়ার পুরো যাত্রাটি নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ করা, ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি, বয়ষ্ক মানুষকে বাসায় গিয়ে বার্ধক্যজনিত জটিলতাসহ মানুষের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া হয়।
হাসপাতালে ভালো সেবা দিতে হলে অনেক বিষয়ে নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা দরকার হয়। এটা কি নিশ্চিত করা হয়েছে?
আর্দ্রা কুড়িয়েন : হাসপাতাল মানে কেবল বড় ভবন, কিছু যন্ত্রপাতি আর চিকিৎসক থাকা নয়। প্রতিটি বিভাগে কেপিআই (কি-পয়েন্ট-ইন্ডিকেটরস) বজায় রাখতে হয়। এই হাসপাতালটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেবার উন্নত মান বজায় রাখার জন্য স্থানীয় নিয়মকানুন মেনে চলার পাশাপাশি (কেরালায় অবস্থিত) রাজগিরি হাসপাতাল এবং সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা নেওয়া হয়েছে। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার পাশাপাশি হাসপাতালের ভেতর থেকে রোগ সংক্রমণ যাতে না হয়, সে দিকগুলো বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তা প্রটোকল নিশ্চিত করা হয়েছে।
বায়োমেডিকেল আবর্জনার ব্যবস্থাপনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিক। কীভাবে আপনারা এটা করছেন?
আর্দ্রা কুড়িয়েন : বাংলাদেশে বায়োমেডিকেল আবর্জনা ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে ভালোভাবে বড় ইনসিনারেটরে করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট। এরপরই এমন আবর্জনা ব্যবস্থাপনা আমার জানামতে সম্ভবত সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা, তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের হলেও নিজস্ব ইনসিনাটেরে করে ইউনিকো হাসপাতালে।
গুলশান, বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায় বড় হাসপাতাল করার প্রবণতা আছে। ইউনিকো হাসপাতালের জন্য কেন গ্রিন রোড এলাকাকে বেছে নেওয়া হলো।
আর্দ্রা কুড়িয়েন : ইউনিকো হাসপাতাল কোনো একক মালিকানাধীন করপোরেট গ্রুপের নয়। সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত প্রায় ১২০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন, যাদের অনেকে চিকিৎসক। আয়-নির্বিশেষে কমিউনিটি ভিত্তিতে মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য এটি এই এলাকায় করা হয়েছে।
আপনাদের হাসপাতালটি কীভাবে অন্য হাসপাতালগুলো থেকে আলাদা?
আর্দ্রা কুড়িয়েন : আগেই বলেছি, বড় ভবন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও দামি যন্ত্রপাতি থাকলেই ভালো হাসপাতাল হয় না। শুধু ভালো ডাক্তার, দক্ষ টেকনিশিয়ান থাকলেও হয় না। সবমিলিয়ে বহুমাত্রিক (মাল্টিডিসিপ্লিনারি) সেবা ব্যবস্থাসহ মানুষের ভরসা করার মতো পরিবেশ গড়ে তুলতে হয়। মানুষকে হাসিমুখে সেবা দিতে হয়। অনেক ডাক্তারের একজন রোগীকে দেওয়ার মতো যথেষ্ট সময় নেই। এটা হতে পারে না। প্রতিটি রোগী আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে। তাই প্রতিটি রোগীর কথা মন দিয়ে শোনা, তার আবেগ বোঝা, শুধু বোঝা নয়, তাকে এমনভাবে আশ^স্ত করা যে, তার সবকিছু গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হচ্ছে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে শুনতে হবে। রোগী বা তার স্বজন যদি ক্ষুব্ধ আচরণ করেন, হাসপাতাল কর্মীদের এটা বুঝতে হবে কেন মানুষটি এমন করছেন?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সবার আর্থিক অবস্থা হয়তো ভালো থাকে না। কিন্তু এ ধরনের মানুষকে কী করে সেবা দেওয়া যায়, ভালো হাসপাতাল হতে হলে তাও ভাবতে হয়। সুযোগ তৈরি করতে হয়। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। আমরা সেবার মাধ্যমে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছি।
এখানে ডাক্তারদের ওপর ল্যাবরেটরি টেস্ট দেওয়া বা রোগী ভর্তি করাসহ কোনো বিষয়েই কোনো চাপ নেই। কোনো টার্গেট দেওয়া নেই। তারা নির্ভার হয়ে যেভাবে রোগীর জন্য ভালো হয়, সে রকম পরামর্শ দিতে পারেন।
রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখার কোনো বিষয় আছে কি? কীভাবে?
আর্দ্রা কুড়িয়েন : খরচ অনেক হবে, এই আশঙ্কায় অনেকে হাসপাতালে যান না। অনেক পরিবারে টানা অনেকদিন ধরে (ক্রনিক রোগে) ভুগছেন। চিকিৎসা নেন না। বয়স্ক অনেকেও এমনটি করেন। ৬০ বছরের বেশি বয়সের যেকোনো ব্যক্তি ইউনিকোতে ৪০ শতাংশ কম খরচে সব সেবা পাচ্ছেন। অতি সীমিত আয়ের রোগীদের জন্য মঙ্গলবার ও শুক্রবার অর্ধেক খরচে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
হেপাটাইটিস রোগীদের জন্য লিভার ও অন্য সংক্রান্ত কী ধরনের সেবা এ হাসপাতালে আছে?
আর্দ্রা কুড়িয়েন : হেপাটাইটিস চিকিৎসার অতি দরকারি দিক হলো রোগটি যাতে অন্যদের মধ্যে, যেমন রোগীর স্বজন, ডাক্তার, নার্সসহ অন্যদের মধ্যে না ছড়ায়, তেমন নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। ডাক্তার ও প্রযুক্তিবিদ নিয়ে বহুমাত্রিক টিম এমন রোগীকে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে থাকেন। জটিলতা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তো আছেনই।
বাংলাদেশে হাসপাতালে ভালো সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
আর্দ্রা কুড়িয়েন : চিকিৎসা মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সেবার সংস্কৃতি ও মনমানসিকতা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিকোর উদ্যোক্তারা এক্ষেত্রে বেশ কঠোর। তারা বলেন রোগীকে বুঝতে হবে, বুঝে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু চিকিৎসা দিতে হবে। রোগীকে বোঝা (ইমপ্যাথি) আর সহানুভূতি জানানো (সিমপ্যাথি) এ দুটো আলাদা বিষয়; এক করে দেখলে চলবে না। তাকে কেন, কী পরামর্শ বা সেবা দেওয়া হচ্ছে, তার পেছনে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি অবশ্যই থাকতে হবে।
ডাক্তার, নার্স ও প্রযুক্তিবিদ সবাইকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য এখানে সবাইকে উৎসাহিত করা হয়। এমনকি নিরাপত্তাকর্মীরও প্রশিক্ষণ থাকতে হবে, যাতে তারা সবার সঙ্গে শান্ত ও সংযত আচরণ করেন।
বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক জায়গায় মানুষ দল বেঁধে রোগী দেখতে হাসপাতালে যায়, যেন কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে। এটা যে রোগীর নিজের জন্য, যারা দেখতে যায় তাদের জন্য এবং যারা হাসপাতালে সেবা দেয় তাদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে, এটা অনেকে ভাবেন না। ইউনিকোতে চাইলেই সবাই এবং একসঙ্গে ঢুকতে পারবেন না।
বাংলাদেশ থেকে অনেক মানুষ নানা কারণে চিকিৎসা নিতে বিদেশে যান। আমাদের আশা, একদিন তারা বিদেশে নয়, নিজ দেশের চিকিৎসায় ভরসা পাবেন; বিদেশের চিকিৎসা ছেড়ে দেশে ফিরবেন।
