ছবিতে কেঁপে ওঠে শাসকের ভিত

একাত্তরের উত্তাল মার্চ। অসহযোগের এই টালমাটাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত মাঠে সামরিক কায়দায় অস্ত্রের প্রশিক্ষণ চলছে। দীর্ঘদেহী একজনের হাতে রাইফেল তাক করা। তার সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী। তাদের হাতেও রাইফেল। দেখে মনে হয় যেন মুখোমুখি যুদ্ধ চলছে। গণআন্দোলনের চতুর্দশ দিনে ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ এই ঐতিহাসিক ছবিটা তুললেন দৈনিক সংবাদের নিজস্ব আলোকচিত্রী রশীদ তালুকদার। বক্স ক্যামেরার সাদাকালো ফিল্মে একটু নিচু অ্যাঙ্গেল থেকে তিনি ছবিটা তুললেন। বিস্তীর্ণ আকাশটাকে ধরলেন ব্যাকগ্রাউন্ডে। দূরে দেখা যায় ঊর্ধ্বমুখী একটি নারকেলগাছসহ কয়েকটি গাছের চূড়া। সামরিক প্রশিক্ষণের ছবিটা পরের দিন ছাপা হয় দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায়। ক্যাপশনে লেখা হয় ‘ছাত্র ইউনিয়নকর্মীদের রাইফেল ট্রেনিংয়ের দৃশ্য সংবাদ।’

পত্রিকায় ছবি দেখে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের ভিত কেঁপে ওঠে। ক্যান্টনমেন্টে শুরু হয় অস্বস্তি। সেনাবাহিনীর ইন্টেলিজেন্সরা ছবিটিকে নানাভাবে পরীক্ষা করে দেখে। তাদের প্রশ্ন ছবির মানুষগুলো কারা? রাইফেলগুলো কোথা থেকে এলো? ক্যান্টনমেন্ট থেকে এই অস্ত্রধারীদের ধরপাকড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু অসহযোগের উত্তাল গণজোয়ারের কারণে তাদের এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। অন্যদিকে এই ছবি সারা দেশের মানুষের মধ্যে একটা জাগরণ তৈরি করে। বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় ছাত্রছাত্রীদের যে অস্ত্র প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তার মূলেও ছিল এই ছবি। এই ছবি দেখেই মানুষ বুঝতে পারে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য। দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ছবিটি দেখে আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। ছবির এই দুঃসাহসী মানুষটির পরিচয় জানতে আকুলতা অনুভব করি। ওই সময়ে পত্রপত্রিকা ঘেঁটে জানতে পারি, এই প্রশিক্ষণদাতার নাম আবুল কাশেম মিয়া। একাত্তর সালে তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্র ইউনিয়নের একজন নিবেদিত কর্মী। গত বছরের নভেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকের কাছে জানতে চাই আবুল কাশেম বেঁচে আছেন কি না? মফিদুল হক জানালেন, আবুল কাশেম তারই ঢাকা কলেজের সহপাঠী। পুরো নাম অধ্যাপক ডা. আবুল কাশেম মিয়া। তিনি একজন নামকরা কার্ডিওলজিস্ট। দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। এখন অনেকটা নিভৃতে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। মফিদুল হকের কাছে আবুল কাশেমের ফোন নম্বর চাইলাম। মফিদুল হক বললেন, ফোন নম্বর খুঁজে পেলে আমাকে পাঠাবেন। কয়েক দিন পর আমার হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে তিনি আবুল কাশেমের ফোন নম্বর পাঠালেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে সেই নম্বরে ফোন করি। ভারী কণ্ঠস্বর। জানালেন, গতকাল জ্বর থেকে উঠেছেন। আমার আগ্রহের কথা শুনে তিনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হলেন। বললেন, আগামীকাল সকালে বেঙ্গল ক্যাফেতে বসে নাশতা খেতে খেতে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন।

২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর। সকাল সাড়ে ৮টায় হাজির হলাম ধানম-ির বেঙ্গল ক্যাফেতে। মোবাইল ফোনের রেকর্ডার অন করে আবুল কাশেমের কাছে জানতে চাইলাম তার দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প। তিনি বলতে শুরু করলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের সঙ্গে তিনিও রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে হাজির হন। লাখ লাখ জনতার কাতারে মঞ্চের খুব কাছে বসে তিনি সেই ভাষণ শোনেন। ভাষণের সময় মাথার ওপর উড়ছে গানশিপ হেলিকপ্টার। ভাষণ শুনে তার রক্ত টগবগ করে ওঠে। ভাষণ শেষে মানুষ উত্তাল স্রোতের মতো মিছিল নিয়ে এদিক-ওদিক চলে যায়। আর ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ কর্মীরা গিয়ে জড়ো হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে। ক্যান্টিনের সামনে একটি তাৎক্ষণিক সভা হয়। সবার একই কথা এখন কী করণীয়?

আবুল কাশেম বললেন, ‘আজকে যে ভাষণটা শুনলাম, তা বিশ্লেষণ করলে খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারা যায় যে, বঙ্গবন্ধু কিন্তু সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। ফলে যুদ্ধ অবধারিত এবং এখনই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।’ ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বললেন, ‘আমরা যে প্রস্তুতি নেব, তা কী করে নেব?’ আবুল কাশেম বললেন, ‘ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আমরা একটা সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করতে পারি।’

পরের দিন ৮ মার্চ সকালে ছাত্র ইউনিয়নের দুই শতাধিক কর্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে জমায়েত হলেন। প্রশিক্ষণের জন্য অস্ত্র দরকার। এখন অস্ত্র পাওয়া যাবে কোথায়? অস্ত্র আছে টিএসসির সুইমিং পুল লাগোয়া ইউটিসি বিল্ডিংয়ে। সুরক্ষিত ইউটিসি বিল্ডিং ভেঙে অস্ত্র আনা দুঃসাধ্য ব্যাপার। ছাত্র ইউনিয়নের এক কর্মী বললেন, ‘আরমানিটোলা স্কুলে ক্যাডেট ক্রপসদের ডামি রাইফেল আছে।’ সেই কর্মী কয়েকজনকে নিয়ে রাতের বেলা গেলেন আরমানিটোলা স্কুলে। তালা ভেঙে বের করলেন অস্ত্র। পরের দিন চার-পাঁচ বস্তা রাইফেল নিয়ে মাঠে এলেন। ডামি রাইফেল হলেও এগুলো দেখতে আসল রাইফেলের মতো!

পঁয়ষট্টি সালের দিকে ফরিদপুর জিলা স্কুলে পড়ার সময় ইউটিসি থেকে চার বছরের সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন আবুল কাশেম। ওটাকে পুঁজি করেই তিনি এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেন। প্রশিক্ষণের দুটি ভাগ। একটি রাজনৈতিক দর্শন, আরেকটি ফিল্ড প্রশিক্ষণ। প্রতিদিন সকাল ৮টায় শুরু হতো রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোচনা। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেন। ৯টায় শুরু হতো সামরিক প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হলো। একটি ছেলেদের, আরেকটি মেয়েদের। আবুল কাশেমের সঙ্গে সহযোগী প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন খন্দকার মনিরুজ্জামান [পরবর্তী সময়ে দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক], মুজিবুর রহমান, স্বপন দত্ত ও মঞ্জুর। মেয়েদের গ্রুপটা দেখভাল করতেন মুজিবুর ও মঞ্জুর।

১৫ মার্চ অস্ত্র প্রশিক্ষণের ছবিটি দৈনিক সংবাদের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত পাকিস্তানি আর্মিদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ছবি দেখে তারা আবুল কাশেমকে চিহ্নিত করেন। তাকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই খবর জানাজানি হয়ে গেলে আবুল কাশেম হোস্টেল ছেড়ে রাতে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আর পার্টির কর্মীদের বাসায় গিয়ে রাত কাটাতেন। সকালে আসতেন মাঠে। তখন খেলার মাঠটা বেশ খোলা ছিল। ডানদিকে ছিল বাস্কেট বলের হল ও জিমনেশিয়াম। আর সঙ্গে লাগোয়া একটা গ্যালারির মতো। বাউন্ডারি ওয়াল ছিল পাঁচ-ছয় ফুটের মতো। বিপদ হলো এ সময় প্রচুর বহিরাগত এসে মাঠে ভিড় করত। ফাঁকা গ্যালারিতে এসে বসে থাকত। কে বন্ধু, কে শত্রু, কে গোয়েন্দা চেনা দায়। মাঠে কেউ তার ইন্টারভিউ নিতে চাইলে তিনি নুরুল ইসলাম নাহিদ ও মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে দেখিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘এরা হচ্ছে পার্টির আসল মানুষ। আর আমি হচ্ছি একজন নিবেদিতপ্রাণ সাধারণ কর্মী।’ প্রতিদিন ট্রেনিং শেষে রাইফেলগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে নিয়ে রাখা হতো। রিকশাওয়ালারা বিনাপয়সায় অস্ত্রগুলো হোস্টেলে পৌঁছে দিতেন। পয়সা সাধলে তারা বলতেন, ‘আমরা কী দেশের জন্য এটুকু করতে পারি না?’

কয়েক দিন প্রশিক্ষণের পর আবুল কাশেমের মাথায় একটাই চিন্তা কী করে এই প্রস্তুতি পর্বের মহড়া দৃশ্যমান করা যায়। তিনি জানেন এই কয়েকশ ছাত্রছাত্রীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পাকিস্তান আর্মিদের সঙ্গে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই প্রশিক্ষণের ছবি প্রতীকী অর্থে ছাপা হলে গ্রাম-গঞ্জের মানুষ অনুপ্রাণিত হবে। ২০ মার্চ ছাত্র ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক কর্মী রাইফেল কাঁধে মার্চপাস্ট করে রাজপথে বেরিয়ে এলে এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা হয়। রাজপথের হাজার হাজার জনতার মধ্যে এই প্যারেড যথেষ্ট উৎসাহের সঞ্চার করে। রাজপথ পরিক্রমকালে রাস্তার দুই পাশে রিকশাচালক, চাকরিজীবী, দোকানদার, পুলিশ, ফেরিওয়ালাসহ বিপুলসংখ্যক জনতা স্বাধীনতার পক্ষে সেøাগান দেয়। হাইকোর্ট, তোপখানা, বায়তুল মোকাররম ও গুলিস্তান পরিক্রমণ শেষে বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে গিয়ে প্যারেড সমাপ্ত হয়। প্যারেডের অগ্রভাগে থাকা ছাত্রীদের ছবি পরদিন সব পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয়। এই ছবি দেখে শাসকের দল আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলে এই প্রশিক্ষণ। ওইদিন দুপুরে খবর আসে, ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাংক রোল করা হচ্ছে। সেই ট্যাংক শহরের দিকে আসছে...।