চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ, প্রত্যাশায় নতুন বাংলাদেশ

দেশের ইতিহাসে ২৬ মার্চ শুধু একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার সূচনা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি যে আত্মত্যাগ, সাহস এবং ঐক্যের নজির স্থাপন করেছে, তা আজও বাঙালি জাতির পথচলার প্রেরণা।

দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা শুধু ভৌগোলিক মুক্তি নয় এটি ছিল ন্যায়, সাম্য, মানবিকতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ উন্নয়নের নানা ধাপ অতিক্রম করলেও, মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনা ও আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নটি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়, বরং দায়িত্ব ও প্রত্যয়ের প্রতীক। স্বাধীনতার ৫ দশক পর দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্ম কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা ও চেতনাকে নিজেদের ভাবনায় ধারণ করছে তা উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও উপলব্ধির ভেতর দিয়ে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রতœতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী পুলক আহমেদ মনে করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন হওয়া এবং সমন্বিত ঐক্যবদ্ধ শক্তির ওপর বিশ্বাস রাখা। ১৯৭১ সালে সাধারণ মানুষের অদম্য ঐক্য প্রমাণ করেছে যে, লক্ষ্য যদি অটল থাকে, তবে যেকোনো অপশক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব। আজকের তরুণদের জন্য এই শিক্ষাটি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক; যেন আমরা দেশপ্রেম ও মেধা দিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার মশাল বহন করতে পারি।’

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধরে রাখতে সমাজে অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে ধর্ম নয়, মানুষ-ই প্রধান পরিচয় বলছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগের শিক্ষার্থী মিরাজুল ইসলাম।

তার ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী ন্যায়, সমতা ও মানবিকতা চর্চা করতে হবে। রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা রেখে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা, রাজনীতি ও সামাজিক আচরণে সহনশীলতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করলেই এই আদর্শ বাস্তবায়ন সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আমার কাছে “স্বাধীনতা” মানে শুধু ভৌগোলিক সীমানার মুক্তি নয়, বরং একটি মানুষের চিন্তা, বিবেক ও মর্যাদার পূর্ণ বিকাশের সুযোগ। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে স্বাধীনতা মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, নিজের অধিকার আদায়ে সচেতনতা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।’

‘এই স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সমাজে বৈষম্য কমে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারে। তাই আমার কাছে স্বাধীনতা মানে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে, দুর্নীতি, অন্যায় দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে পারে এবং দেশকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে উন্নয়ন ও মানবিকতার পথে এগিয়ে নিতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।

আর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী সামুয়েল সরকার বলেন, ‘স্বাধীনতা মানে শুধু একটি মানচিত্র নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের নির্ভয়ে সত্য বলার অধিকার এবং বৈষম্যহীনভাবে মেধার বিকাশ ঘটানোর অবারিত সুযোগ। এটি এমন এক দায়বদ্ধতা, যা আমাদের আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে শেখায় এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান জানিয়ে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রেরণা দেয়।’

আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান দুর্জয় বলেন, স্বাধীনতা মানে নতুন একটি দেশ, একটি নতুন স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্য করে যাওয়া লড়াই।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ অনুযায়ী দেশ এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান ঐশী। এর সপক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শই ছিল গণতন্ত্র, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার। অর্থনৈতিক কিছুটা উন্নয়ন হলেও দেশে ন্যায়বিচারের অভাব বিদ্যমান। চারদিকে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি, অরাজকতা বেড়ে চলছে। মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা গণতন্ত্রের আদর্শ পূরণে প্রথম বাধা। এ ছাড়া রয়েছে দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব।

তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মুসান্না তাহসিন মনে করেন, ‘আংশিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশ গঠন হয়েছে। এখনো তা পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। উন্নয়ন, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও ন্যায়, সাম্য, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। তাই বলা যায়, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কাক্সিক্ষত আদর্শে পৌঁছাতে এখনো সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।’

তার ভাষায় এই অগ্রযাত্রাকে আরও অর্থবহ করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা-সাম্য, মানবিকতা ও জবাবদিহি বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্ম যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখে, তবে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশকে কোন জায়গায় দেখতে চান তা জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী হাবিবুর রনি বলছিলেন, ‘আমি বাংলাদেশকে একটি দক্ষ, সুশাসিত ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই, যেখানে উন্নয়ন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই। শিক্ষাব্যবস্থা হবে গবেষণাভিত্তিক ও যুগোপযোগী, যাতে তরুণরা শুধু ডিগ্রি নয়, বাস্তব দক্ষতা অর্জন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। দুর্নীতি ও বৈষম্য কমে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে এটাই প্রত্যাশা। কৃষি, শিল্প ও স্টার্টআপ খাতে উদ্ভাবন বাড়বে, যা অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে। পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিম-লে আরও শক্তিশালী এবং মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করবে।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া দেওয়ান কেয়া বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে আমি বাংলাদেশকে এমন একটি দেশে দেখতে চাই, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন হবে এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পরিবারের মানুষ যেন শুধু মেধার ভিত্তিতেই সরকারি চাকরি পায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

দুর্নীতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ন্যায়বিচারের ঘাটতি বর্তমান সমাজে স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে জানান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন রায়হান।

পাশাপাশি অসহিষ্ণুতা, স্বদেশীয় বিষয়ে বিদেশি প্রভাবের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, রাষ্ট্রের স্বাধীন ও সার্বভৌম অর্গানগুলোকে রাজনীতিকরণ, বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিবর্তে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে অবমূল্যায়ন করা স্বাধীনতার মূল আদর্শকে দুর্বল করে বলেও মনে করেন তিনি।