মন্ত্রিপরিষদ সচিব বললেন

৩০ দিনের তেলের মজুদ রয়েছে

দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ পর্যাপ্ত রয়েছে, এটি আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেছেন, ‘সাধারণত দেশে জ্বালানি তেলের ১৫ দিনের মজুদ থাকে, কিন্তু বর্তমানে এক মাসের মজুদ রয়েছে।’ গতকাল বুধবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান তিনি।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠক সাধারণত বৃহস্পতিবার হলেও মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি থাকায় গতকাল বুধবার এ বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে পাঁচটি আইন চূড়ান্ত আকারে অনুমোদন হয়েছে। এর সবকটিই অর্থ-সংক্রান্ত। এর মধ্যে অন্যতম হলো, মূসক ও সম্পূরক শুল্ক-সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালা, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অর্থ আইন ও আবগারি শুল্ক নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া সংশোধন অধ্যাদেশ চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে আজকের (গতকাল) বৈঠকে।’ সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আজ (গতকাল) দিনভর ব্যস্ত ছিলেন। সকালে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে একটা বৈঠক হয়েছে, যেখানে অর্থমন্ত্রী ও জ্বালানি মন্ত্রী ছিলেন। আন্তর্জাতিক যে ক্রাইসিস আমরা জানি সরকার আসলে কী ভাবছে? প্রধানমন্ত্রী আসলে কী বলছেন?’ সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি রিভিউ করার জন্য সরকারি যত সামর্থ্য আছে, সব কিছু যাচাই করেছেন। তিনি দেখেছেন যে কীভাবে চলছে, কাজ কী কী অগ্রসর হয়েছে, মন্ত্রণালয় কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আমাদের কী অবস্থা আছে। আমি জাস্ট সংক্ষেপে এটুকু বলতে পারি, আমাদের এর আগে জেনারেলি (সাধারণত) ১৫ দিনের একটা মজুদ থাকত। তো এখন পর্যন্ত রিজার্ভ সাফিশিয়েন্ট (পর্যাপ্ত) রয়েছে।’

মানুষ আতঙ্কে তেল কিনছে জানিয়ে নাসিমুল গনি বলেন, ‘জ্বালানি তেল তো অতিরিক্ত কিনলে নষ্টই হবে বলে মনে হয়। তো এগুলো হচ্ছে কিছু। তো সেটা হয়তো আর কয়েক দিন পর কেটে যাবে মানুষের মধ্যে আস্থা ফেরত এলে। সরকার থেকে আগামীতে শিগগির যে প্ল্যান নেওয়া হয়েছে, তাতে এই রিজার্ভটা আরও বড় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

কত দিনের মজুদ আসলে আছে, ১৫ দিনের কি না,  জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এখন এক মাসের এক মাসের মতো আছে আমার কাছে।’

‘জেট ফুয়েলের যেহেতু দাম বেড়েছে, সে ক্ষেত্রে কি মানুষ প্যানিকড হচ্ছে যে তেলের দাম বাড়তে পারে?’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘না, জেট ফুয়েলের দাম সবকিছুরই তো বাইরে দাম বেড়েছে না? এখন জেট ফুয়েলের দাম যদি আমরা... এটার কতগুলা ব্যাপার আছে। না হলে এখানে তো অন্য দেশের এয়ারলাইনসও আসে। আসে না বাংলাদেশে? তারা তেল ফুরিয়ে গেলে কি ভারত থেকে তেল নিয়ে আসে? তা তো করে না, এখান থেকে কেনে। তখন আমরা লসে পড়ে যাই। সেজন্য বিমানের তো ব্যবসা আন্তর্জাতিক যে রেট আছে সেই রেটে চলছে।’

এক মাসের মজুদ কোন কোন তেলের আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব তেলেরই আছে।’ ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে দুই কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

তিনি বলেন, ‘যেগুলো মিস করছি (চুক্তির পরও পাওয়া যাচ্ছে না) আমরা, এগুলো স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হয়। এটা যখন আসে, সিদ্ধান্তটা দিতে হয় তাদের ১০ ঘণ্টার মধ্যে। ফলে এগুলো ইয়ে করার পর ঝট করে মিটিংটা করতে হয়। এলে আমরা খুব বেশি সময় পাই না এটার জন্য।’

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর গুজব শোনা যাচ্ছে এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ সম্বন্ধে আমি অবগত নই এবং এ রকম কোনো লক্ষণও দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে তো প্রথম দিকেই করতে পারত।’ তেলের মজুদ বাড়াতে বিভিন্ন উৎস থেকে তেল কেনা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন নাসিমুল গনি।

এর আগে সকালে সচিবালয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন, এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা।

পরে সচিবালয়ে সরকারের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালী ঘিরে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী হয়ে আসায় বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখন অস্থিতিশীল। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা মেটাতে দেশকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আগের সরকারের আমলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এখন তুলনামূলক কম রয়েছে। তারেক রহমানের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খাতটি পরিচালনা করছেন।’

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং খাতটিকে একটি স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। এই মুহূর্তে দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জ্বালানির দামে এখনো বেশ পার্থক্য রয়েছে।’

আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি আহ্বান জানান তথ্যমন্ত্রী। সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি পরিকল্পিত কৌশল অনুযায়ী এগোতে পারি, তবে কোনো সংকটই আমাদের প্রভাবিত করতে পারবে না।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি; তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়) জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের খুবই দুর্ভাগ্য, আমাদের জাতিরও দুর্ভাগ্য যে, আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটা গ্লোবাল ক্রাইসিসে পড়েছি। এমনকি ধনী দেশগুলো পর্যন্ত, এই যে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে সরে আসছে, চিন্তা করছে বলা হচ্ছে, কারণ তার সামনে মিড-টার্ম ইলেকশন আছে। তার আগে যদি তার দেশেও প্রচুর ইনফ্লেশন হয়ে যায় সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সো আমরা আসলে মূলত ওই সংকটে পড়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন সবার দায়িত্ব মানুষকে এটা বলার চেষ্টা করা, প্যানিক বায়িং এবং মজুদ যাতে তারা অতটা না করেন। আর হ্যাঁ, পাম্প পর্যায়ে হয়তো কেউ কেউ স্টোর করার চেষ্টা করছে। আমাদের সরকার সেগুলো একটু দেখার চিন্তা করছে।’

পাম্প মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মজুদ করার যদি প্রবণতা কারও থাকে, তারা মনে করছেন যে, দাম যেকোনো মুহূর্তে বেড়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না। সুতরাং জ্বালানি তেলের দাম যেহেতু বাড়ছে না, এই মজুদ করে রাখার প্রবণতা আসলে তাদের জন্য খুব বেশি বেনিফিশিয়াল হবে না।’ এ সময় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা উপস্থিত ছিলেন।