হত্যা মামলার এজাহারে পরিবর্তন আসামিরা হয়ে গেলেন ‘অজ্ঞাত’!

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম

কক্সবাজারের উখিয়ায় একটি হত্যা মামলার এজাহার পরিবর্তন করে মূল আসামিদের বাদ দিয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। নিহতের পরিবার দাবি করছে, অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগসাজশ করেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এমনকি ইচ্ছা করেই আদালতে জমা দেওয়া হচ্ছে না ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করছে পুলিশ।

আদালত, পুলিশ ও নিহতের পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মার্চ ভোর ৪টার দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মোছারখোলা গ্রামে দুই সন্তানের জননী জদিদা আকতারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী নিহতের বাবা নুরুল ইসলাম ওই দিন বেলা ১১টার দিকে জদিদা আকতারের স্বামী, শ্বশুরসহ বাড়ির ছয় জনের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মামলার এজাহার জমা দেন। তবে পরে কৌশলে সেই এজাহার বদলে ফেলে পুলিশ। আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামাদের।

মামলার বাদী নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়ের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল নেওয়ার সময় পুলিশ আমাকে এজাহার জমা দিতে বলে। এ জন্য আমি মেয়ের মরদেহের সঙ্গে না গিয়ে উখিয়া থানায় ছয় জনের বিরুদ্ধে এজাহার জমা দিই। এরপর পুলিশ আমাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে। ঘণ্টা দুয়েক পরে পুলিশ আমার কাছ থেকে কয়েকটি কাগজে স্বাক্ষর নেয়। এর মাধ্যমেই তারা আমার দেওয়া এজাহার পাল্টে অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে হত্যা মামলা রুজু করে। তখন আমি বিষয়টি বুঝতে পারেনি।’

জদিদার বাবার দাবি, এজাহারে তিনি মেয়ের স্বামী শফিকুল ইসলাম, শ্বশুর নুরুল বশর প্রকাশ ফকির, শাশুড়ি ফাতেমা বেগম, দেবর নূর শাহেদ, মো. রফিক, ভাসুর ছৈয়দুল ইসলামকে আসামি করেছিলেন।

নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এজাহারনামীয় আসামি ছৈয়দুল ইসলাম আমার মেয়ে চুরি করার কারণে গণপিটুনিতে মারা গেছে উল্লেখ করে গত ২২ এপ্রিল আমিসহ আমার পরিবারের চার সদস্যের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন। তখন পুলিশ ডাকলে আমরা তাদের জানাই ছৈয়দুল আমার মেয়েকে হত্যা মামলার আসামি। অথচ পুলিশ তখন দাবি করে হত্যা মামলাটিতে এজাহারনামীয় কোনো আসামি নেই। এরপর আমি হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, উখিয়া থানার তখনকার ওসি, এসপি সার্কেল ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছে বিষয়টি লিখিতভাবে জানাই। কিন্তু তারা আমার আবেদনটি ফেরত দেয়। পরে বাধ্য হয়ে আমি বাদপড়া অভিযুক্তদের মামলার আসামি করতে আদালতের দ্বারস্থ হই।’

জদিদা হত্যার পরদিনই নিহতের দেবর নূর শাহেদকে ধারালো দাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে নূর শাহেদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানায় পুলিশ। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এখনো আদালতে সুরতহাল প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের চৌহদ্দির বিবরণ, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জমা দেননি।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের আইনজীবী এহেছান সেজান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনগতভাবে মামলার চৌহদ্দির বিবরণ, সুরতহাল প্রতিবেদন ও অন্য সমস্ত নথি মামলার চার্জশিটের সঙ্গে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে স্বচ্ছতার কারণে ও ভিকটিমের আইনি সুযোগ নিশ্চিত করতে এগুলো সাধারণত এজাহারের সঙ্গেই পুলিশ আদালতে জমা দেয়। এক্ষেত্রে সেটি কেন করা হয়নি তা পুলিশ ভালো বলতে পারবে।’

এদিকে এজাহার পরিবর্তন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে উখিয়া থানা পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার এসআই আবদুল আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি জীবনে অনেক হত্যা দেখেছি। তবে এটি ছিল একটি বীভৎস হত্যাকাণ্ড। ওই নারীর মরদেহ দেখে ঘটনাস্থলে আমি নিজেই জ্ঞান হারাই। সেখান থেকে আমাকে হাসপাতাল নেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ওই মামলার দায়িত্বভার গ্রহণ করি। এর আগে অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে হত্যা মামলাটি নথিভুক্ত হয়। ঘটনার দিন নিহতের বাবা কিংবা পরিবারের কেউ ভিকটিমের শ্বশুরবাড়ির লোকজন জড়িত বলে জানাননি। আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে এ ঘটনায় তার এক দেবর জড়িত বলে জানতে পারি। পরে তাকে গ্রেপ্তার করি। পরে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই মামলার চার্জশিট দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’

জদিদা সংঘবদ্ধ পিটুনিতে মারা গেছেন এমন একটি অভিযোগ থানায় এসেছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমার জানা নেই। যিনি সালিশ করেছেন তিনি হয়তো জানবেন।’

তবে এ বিষয়ে উখিয়া থানার এএসআই ইলিয়াছ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছৈয়দুল ইসলামকে চাকরিস্থল ও তার বসবাসের স্থানে নুরুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা খুন করার চেষ্টা করেছেন মর্মে একটি অভিযোগ থানায় এসেছিল। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুই পক্ষকেই ডেকে আমি সতর্ক করি এবং সমঝোতা করি। তবে সেই অভিযোগকে জদিদাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার কথা লেখা ছিল কি না আমার মনে নেই।’

নিহতের ভাই ওবাইদুল্লাহর দাবি যৌতুকের জন্য তার বোনকে শ^শুরবাড়ির লোকজন কুপিয়ে হত্যা করে। তিনি বলেন, ‘যৌতুকের জন্য শ্বশুরবাড়ির লোকজন প্রায়ই আমার বোনকে নির্যাতন করত। এ নিয়ে অনেকবার এলাকায় সালিশি বৈঠকও হয়। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর যৌতুকের জন্য আমার বোনকে মারধর করে ডান হাত ভেঙে দেয় শ্বশুরবাড়ির লোকজন। ওই ঘটনার ছয় মাস না পেরোতেই তারা আমার বোনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। থানায় আমার বাবার দেওয়া এজাহারে এসব বিষয়ের উল্লেখ ছিল। তবে বদলে ফেলা এজাহারে তা নেই।’

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ইউসুফ আরমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত পুলিশ এজাহারের সঙ্গেই হত্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি আদালতে পাঠায়। তবে এই মামলায় শুধু এজাহারের কপি পাঠানো হয়েছে। পরে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন বিচারক। গত ২ জুলাই এই আদেশ দেওয়া হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করেনি পুলিশ।’

বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উখিয়া থানার তখনকার ওসি নাছির উদ্দিন বলেন, ‘বাদীর দেওয়া এজাহার পরিবর্তনের সুযোগ পুলিশের নেই। এটি পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার।’ জদিদা গণপিটুনিতে মারা গেছেন এমন অভিযোগ নিয়ে সালিশি বৈঠক করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশকে কেউ কোনো অভিযোগ দিলে তা নিতে হয়। পরে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হয়তবা বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছেন।’ 

অন্যদিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ সামীম কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এজাহার পরিবর্তনের বিষয়টি আমার জানা নেই। পুলিশ কোনো কাগজপত্র আদালতে না দিয়ে থাকলে অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় জমা দেবে এটাই নিয়ম। এছাড়া আদালতের আদেশ মতোই পুলিশকে কাজ করতে হয়। নির্দেশনা অমান্য করলে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে আদালত।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত