জ্বালানি নিরাপত্তায় থাবা

আধুনিক বিশে^র প্রাণ, জ্বালানি। এই সম্পদের অপর্যাপ্ততা এবং জ্বালানির উৎস জীবাশ্মনির্ভর হওয়ায়, পরাশক্তি দেশগুলোর নজর জ্বালানির দিকে। তাদের উদ্দেশ্য, নিজের দেশকে আগামী দশকগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। পরিকল্পনা খারাপ নয়, তবে এর পন্থা সঠিক নয়। সোজা বাংলায়, যদি কথামতো না দাও, তো শক্তি ঠেকাও। যে কারণে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র আপ্রাণ চেষ্টা করছে, নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার সঙ্গে সঙ্গে দেশের জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করতে। ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলার তেলের দখল ট্রাম্পের হাতে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা পূরণ করছে। শুধু ইরান ছিল চীনঘেঁষা। ফলে এ দেশ আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল নিজের মতো সরকার প্রতিষ্ঠা করা। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, সব দেশেরই মাথাব্যথার কারণ জ্বালানি। কারণ জ্বালানি শক্তির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে, অর্থনীতি এক দিনে মুখ থুবড়ে পড়বে। অস্থিতিশীল হবে সরকারব্যবস্থা। বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ফলে জ্বালানির ওপর পুরো বিশ্ব অধিকাংশ মাত্রায় কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে অন্যতম মধ্যপ্রাচ্য। প্রাকৃতিকভাবেই এটা হয়েছে। হওয়ার কথা ছিল সুষ্ঠু বণ্টন। তা হচ্ছে না। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর শক্তির উৎপাদনের কারণে নিজেদের অর্থনীতির সুরক্ষা এবং শিল্প-কারখানার জোগান নিশ্চিত করতে, উন্নত দেশগুলো এখন মরিয়া। আবার মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে জ্বালানি তেল বিক্রি করে। যে কারণে বিশে^র নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে এক নতুন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে।

ইরান বা তুরস্কের মতো দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি নেই। এই দুই দেশ নিজেরাই সামরিক দিক থেকে অগ্রসরমান। যুদ্ধের ফলে তেলক্ষেত্র, গ্যাস অবকাঠামো এবং সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যার বড় প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশেও। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, এটি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে নাড়া দিয়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশি^ক অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্য সংকটসহ নানা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে প্রতিটি দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও সাধারণ মানুষের জীবনে। জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশও। আমাদের দেশের বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৬২ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, যদি মধ্যপ্রাচ্য অস্থির হয় তাহলে এশিয়ার দেশগুলোতে তার প্রভাব হবে সবচেয়ে বেশি। ইউরোপেও আঁচ পড়বে। কারণ হরমুজ প্রণালি। আগামীতে এ ধরনের সংকট আর আসবে না, সেটাও নিশ্চিত নয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই প্রভাব পড়তে শুরু করে দেশ জুড়ে। জ্বালানি তেল নিয়ে হইচই আর নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে আরও বেশি হচ্ছে ভোগান্তি। যে যেখানে পারছে জ্বালানি তেল লুকিয়ে ফেলছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন করা হয়, তা বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলেরও প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই পথ দিয়ে যায়।

যুদ্ধের কারণে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ  তৈরি হয়েছে। সংঘাতের ফলে বৈশি^ক তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ১২০ ডলার হয়েছে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জ্বালানি বিশ্লেষকদের অনেকেই সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত হয়, তাহলে তেলের দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশে^ প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের চাহিদা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশি^ক অর্থনীতিতে মন্দা, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহের হৃৎপি-ে অস্থিরতা বিশে^র বৃহৎ তেল ও গ্যাস ভা-ারের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের শীর্ষ জ্বালানি উৎপাদকদের মধ্যে রয়েছে। এই অঞ্চলের উৎপাদিত তেলের বড় অংশ যায় এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা তৈরি করে। সাম্প্রতিক সংঘাতে তেল শোধনাগার, গ্যাস স্থাপনা এবং জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে চলাচলের চেষ্টা করছে, আবার অনেক বীমা কোম্পানি যুদ্ধঝুঁকির কারণে এই রুটে জাহাজ বীমা করতে অনীহা দেখাচ্ছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব দেখা যায় উৎপাদনেও। সংঘাতের কারণে ইরাকের তেল উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাশং কমে যায়, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত। শিল্প উৎপাদন এবং কৃষি খাতের ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, এই পথ বন্ধ হওয়ার অর্থ বিশ্ববাজার থেকে এক ধাক্কায় প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল গায়েব হয়ে যাবে। তুলনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে দিনে ৪০ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেলের সংকট তৈরি হয়েছিল। এমনকি ১৯৭৮ সালের ইরানের ইসলামী বিপ্লব বা ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধের ধাক্কায়ও এই সংকট দৈনিক ৪০ থেকে ৬০ লাখ ব্যারেলে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ হরমুজের সম্ভাব্য এই সংকট হবে বিগত যেকোনো বড় ধাক্কার চেয়ে অন্তত চার গুণ বেশি শক্তিশালী। ভারত তার মোট তেলের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। ফলে তেলের দাম বাড়লে দেশটির জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে। চীন সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে তার কৌশলগত তেল মজুদ ব্যবহার করছে এবং রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়লে তাদের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতেও বড় চাপ তৈরি হয়। সংকট রয়েছে ইউরোপেও। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকেছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে, ইউরোপের গ্যাস বাজার আবার চাপের মুখে পড়তে পারে। বহু বছর ধরেই পৃথিবী বিকল্প শক্তির সন্ধানে হন্য হয়ে ছুটছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি করাই এর উদ্দেশ্য। এর পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। এক. জলবায়ু পরিবর্তনের হার কমিয়ে আনা এবং দুই. শক্তির বিভিন্ন উপাদানের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারে যাওয়া যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা এই মুহূর্তে টের পাচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন তা নিঃশেষ হয়ে আসছে, অন্যদিকে সভ্যতা গভীর সংকটে উপনীত হয়েছে। কয়েকটি দেশের হাতে জ্বালানির মজুদ অধিকাংশ মাত্রায় থাকার কারণে পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে বিশৃঙ্খলা। কারণ শক্তিধর দেশগুলো যেকোনো মূল্যে জ্বালানি পেতে চায়। কারণ জ্বালানি শক্তি ছাড়া আগামীতে প্রভুত্ব করা হবে না। পৃথিবী অন্তত আরও একশ বছর এই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর থাকবে। এরপর পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে। কারণ সবাই জানে যে, জীবাশ্ম জ্বালানি যা ব্যবহারের ফলে নিঃশেষ হবেই এবং প্রকৃতিতে তা আর ফেরত আনা সম্ভব না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির ব্যবহারও বেড়েছে বহুগুণে বেশি। ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ সম্পদ প্রায় শেষের দিকে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ জ্বালানির চিন্তা করতেই হচ্ছে। ভবিষ্যতের পৃথিবী কোনো বিজ্ঞানীরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে শক্তির ঘাটতি পূরণে। উৎপাদন, গাড়ি ও অন্যান্য যন্ত্র চালনা এমনকি উড়োজাহাজ, বিদ্যুৎ উৎপাদন সবক্ষেত্রেই নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। ভবিষ্যতে জ্বালানি ঘাটতির কথা বিবেচনা করেই এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আগামীতে যে এ ধরনের সমস্যা আসবে না, জ্বালানি সংকট হবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

এখনই আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন যে শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, তা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিভিন্ন উন্নত দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এতে উভয় দিকেই সুবিধা রয়েছে। অনবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার কমার সঙ্গে সঙ্গে নগরের সমস্যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও সঠিক সমাধান হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বিধায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি অন্যতম মাধ্যম। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করে উন্নত দেশগুলো আজ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। বর্তমান অবস্থান থেকে বিবেচনা করলে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। যা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশ বাস্তবায়ন করছে। এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির পর যে এই গতি আরও দ্রুত হবে অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ জ্বালানিতে স্বনির্ভর হতে চাইবে তা বলাই বাহুল্য। এর একমাত্র উপায় হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের সুযোগ  তৈরি করা। এর ফলে একদিকে যেমন বিশ্ব বসবাসের উপযোগী হবে, অন্যদিকে শক্তি অফুরন্ত উৎসের ব্যবহারের মাধ্যমে নাগরিক জীবন নিশ্চিত হবে। সেই সঙ্গে জ্বালানি সংকটে বর্তমানের পরিস্থিতি তৈরি হবে না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com