বর্ণিল প্যারেড স্কয়ারে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামের সক্ষমতা দেখাল বাংলাদেশ

বহরগুলোতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর আধুনিক সমরাস্ত্রের সমাহার। রীতিমতো গর্জে উঠল প্যারেড স্কয়ার। আধুনিক ট্যাঙ্কসহ ভূমি ও জাহাজ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য বিমান বিধ্বংসী রকেট ও মিসাইলের মডেল, দেশীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত ড্রোন, চালকবিহীন বিমানসহ অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র কী ছিল না সেখানে? দৃষ্টি জুড়িয়ে যায় সামরিক বাহিনীর সমর সক্ষমতার অনন্য নজির অবলোকনে।

মহান স্বাধীনতা দিবসে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে কার্যত শৌর্য আর বীরত্বের এক মহড়া দেখিয়েছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। আকাশে গগণবিদারী গর্জন আর রোমাঞ্চকর ফ্লাইপাস্ট মুগ্ধ করেছে সবাইকে। ভারী যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বাহিনীর নানা সরঞ্জাম আক্ষরিক অর্থে সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে শক্তিমত্তার জানান দিয়েছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমরাস্ত্র ও প্রতিরোধ সক্ষমতা হয়ে উঠে মূল উপজীব্য।

রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজ মুগ্ধতায় উপভোগ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুচকাওয়াজ প্রদর্শনীতে সমরে প্রতিরক্ষায় অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত সক্ষমতা জানান দেয় বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি। বাংলার জলে-স্থলে-আকাশকে সুরক্ষিত রাখতে সদা প্রস্তুত বাংলার বীর সেনারা। স্বাধীনতা দিবস কুচকাওয়াজে অশ্বারোহী হয়ে প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও সাভারের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এস এম আসাদুল হক। প্যারেডের দায়িত্বভার গ্রহণের পর প্রথমেই তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় 'স্বাধীনতা দিবস প্যারেড অস্ত্র নামাবে...।'

সকাল ৯টা ৫৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মিলিটারি পুলিশের (এমপি) মোটরশোভাযাত্রায় অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছান। এরপর সকাল ১০টায় একইভাবে ময়দানে আসেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

অভিবাদন মঞ্চে এসে পৌঁছলে তাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকু রহমান উপস্থিত ছিলেন।

সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মোট ২৫টি কন্টিনজেন্টের সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডের ২৬ জন অকুতোভয় ফ্রিফলার ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে ১০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ফ্রিফল জাম্প করে গ্যালারির পূর্ব প্রান্তে অবতরণ করেন। এ সময় ফুরফুরে মেজাজে করতালি দিতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে।

পদাতিক বহরের পর বিভিন্ন বাহিনীর সুসজ্জিত যান্ত্রিক বহর রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানায়। স্বাধীনতার পর সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে রূপরেখা ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন বাহিনীতে সংযোজিত হয়েছে অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি, যা কুচকাওয়াজের যান্ত্রিক বহরকে করে তুলে আরও আকর্ষণীয়। কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণকারী সম্মিলিত যান্ত্রিক বহরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ৯ আর্টিলারি ব্রিগেড এর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আনোয়ার উজ জামান।

সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো সদস্যরা দেশের বিশেষ সামরিক সক্ষমতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত অংশ। কঠোর শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা ও উচ্চমানের পেশাগত দক্ষতার সমন্বয়ে গড়ে উঠা এই বিশেষ বাহিনীকে জটিল ঝুঁকিপূর্ণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ামূলক অভিযানের জন্য প্রস্তুত করা হয়। তাদের মূলমন্ত্র 'ডু অর ডাই' কেবল একটি স্লোগান নয় বরং দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সাহস ও আত্মত্যাগ ও অটল প্রতিশ্রুতির প্রতীক। দৃপ্ত পদক্ষেপে রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানায় প্যারাট্রুপার কন্টিনজেন্টের নেতৃত্বে থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এস ইমরুল হাসানের নেতৃত্বাধীন প্যারা কমান্ডোরা।

ট্যাংককে বলা হয় যুদ্ধক্ষেত্রের রাজা। শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম। পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ট্যাংক যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করে শত্রুকে পর্যুদস্ত করে। কুচকাওয়াজ প্রদর্শনীতে সাজোয়া বহরের অগ্রভাগে ছিল ৬টি মিডিয়াম ট্যাংক টি-
৬৯ জি। মেকানাইজড ইনফ্রেন্টির যান্ত্রিক বহরে প্রদর্শিত হয় রাশিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক এপিসি বিটিআর-৮০। এর ভেতরে অবস্থান নিয়ে পদাতিক বাহিনীর যোদ্ধারা অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ শত্রুর অভ্যন্তরে দ্রুত গতিতে প্রবেশ করে আক্রমণ করতে সক্ষম। এই যানসমূহ পানির মধ্যেও অনায়েসে চলতে পারে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের বিভিন্ন অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই বাহনটি ব্যবহার করে আসছে। পদাতিক বহরে ছিল তুরস্কের তৈরি অত্যাধুনিক এলএভি কোবরা ওয়ান। উচ্চ গতিসম্পন্ন ও শক্তিশালী এই ট্যাকটিক্যাল যানটি পদাতিক বাহিনীর টহল ও দ্রুত সৈন্য পরিবহন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদে অভিযান পরিচালনায় অত্যন্ত কার্যকর।

তৃতীয় সারিতে ছিল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি মাইন রেজিজটেন্স অ্যামবুশ প্রটেক্টেট যান ম্যাক্স প্রো বেস। এই সাঁজোয়া যানটি মাইন ও আইডি বিস্ফোরণের আঘাত থেকে ভেতরে অবস্থাকারী সৈন্যদের সুরক্ষা প্রদান করে। দৃষ্টি আকর্ষণ করে এন্টি ট্যাংক ওয়েপেন পিএফ ৯৮, যা শত্রুর ট্যাংককে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এন্টি ট্যাংক গাইডেড ওয়েপন মেটিস এম-১ শত্রুর যেকোন ট্যাংক নির্ভুলভাবে আঘাত করে ধ্বংস করতে সক্ষম। সবশেষে ছিল অটোমেটিক গ্রেনেড লঞ্চেস সিস্টেম। যা স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শত্রুর অবস্থানের ওপর কার্যকর আঘাত হানতে সক্ষম। সম্মান ও গৌরব এই মূলমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ গোলন্দাজকে বলা হয় রনাঙ্গণের বিধাতা। গোলন্দাজের কামান বহরে চারটি ইতালির তৈরি ১০৫ মিলিমিটার প্যাক হাউইটজা প্রদর্শিত হয়। এ ছাড়া যুগোস্লাভিয়ায় তৈরি চারটি ১০৫ মিলিমিটার হাউইটজার এম ফিফটি সিক্স সবার নজর কাড়ে।

'শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্রে দুর্জয়' মন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যান্ত্রিক বহর। প্রথম সারিতে ছিল শত্রু জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মিসাইল মডেল। নিজ সমুদ্র সীমায় শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য মিসাইল এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ত্র। দ্বিতীয় সারিতে ছিল শত্রু জাহাজ ও বিমান নরজদারি ও অনুসন্ধানের জন্য দূরপাল্লার রাডার। এসব রাডার শত্রু জাহাজ ও বিমানকে দূর থেকেই সনাক্ত ও অনুসরণ করতে সক্ষম। তৃতীয় সারিতে ছিল জাহাজ থেকে শত্রু বিমানে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল মডেল ও বিমান বিধ্বংসী মধ্যম পাল্লার সমরাস্ত্র। এসব সমরাস্ত্র শত্রু বিমান থেকে নিজ জাহাজসহ যেকোনও স্থাপনা রক্ষা করতে সক্ষম। চতুর্থ সারিতে ছিল মাঝারি ও দূরপাল্লার কামান। যা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে গোলাবর্ষণে সক্ষম। এ ছাড়া যুদ্ধ জাহাজে নিরাপদ নেভিগেশন ও হেলিকপ্টার নিয়ন্ত্রক রাডার সিস্টেম জানান দেয় বাঙালি জাতি পরাভব মানে না। 'বাংলার আকাশ রাখিবো মুক্ত' এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনী যান্ত্রিক বহরের প্রথম সারিতে ছিল বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ৩০১ আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এফএম-৯০ এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম।

এই বহরে ছিল গণচীনের তৈরি সার্ভিল্যান্স রাডার, ট্র্যাকিং রাডার, গাইডেন্স রাডার, টিভি ট্র্যাকিং সিস্টেম। যা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে শত্রু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রকে সনাক্ত করতে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ১৫ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুকে আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম। পরবর্তী দেখানো হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অ্যারাস্পেস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমপ্লেক্স বা এআরডিসি থেকে নকশাকৃত ও উৎপাদিত টেক্স টু ক্লোজ রেঞ্জ ফিক্সড উইং ইউএভি। এআরডিসি থেকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত পিএফএক্সটু ভার্টিক্যাল টেক অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিংয়ে সক্ষম মডিউলর ইউএভি, ভারী থেকে হালকা ওজন ধারণ ও নজরদারিতে সক্ষম কিউএক্সেল এবং কিউএক্স মডেলের কোয়াট কপ্টার ইউএভি।

মহান স্বাধীনতা দিবসে সুরক্ষিত নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় ছিল সশস্ত্র বাহিনীসহ সকল নিরাপত্তা বাহিনীর। ১৮ বছর পর অনুষ্ঠিত স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাসেজই যেন দিয়েছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করা বাংলাদেশ। সেনা, নৌ, বিজিবি ও র‍্যাবের ফ্লাইপাস্ট ও দুঃসাহসী প্যারা কমান্ডোদের ফ্রিফল জাম্প কুচকাওয়াজকে করেছে স্মরণীয়। ছিল বিমান বাহিনীর মনোজ্ঞ ফ্লাইপাস্ট ও অ্যারাবেটিক ডিসপ্লে। সেই সময় যুদ্ধ বিমানের নানা রণকৌশলও দেখানো হয়। অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমান মিগ-২৯ এর ঢাকার আকাশ বিদীর্ণ করে বিজয় সূচক চিহ্ন দেখানোর মাধ্যমে শেষ হয় কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা। বিমান বাহিনীর ফ্লাইপাস্টের নেতৃত্ব দেন এয়ার কমোডর মেহেদী হাসান। এই কুচকাওয়াজের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজেদের শক্তিমত্তা ও সুদৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে তাঁরা বুঝিয়ে দিলো তাঁরা অপ্রতিরোধ্য, দুর্বার এবং দুরন্ত, প্রস্তুত জীবনবাজিতেও।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক