জেন জেডের ‘ফ্রেন্ডস’ বানানো কেন এত কঠিন?

‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো জনপ্রিয় হতে পারছে না জেন জেডকেন্দ্রিক নতুন সিটকমগুলো

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০০ এএম

আমেরিকান টেলিভিশন ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় সিটকম ‘ফ্রেন্ডস’। ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সম্প্রচারিত এই ধারাবাহিকটি নব্বইয়ের দশকের ‘জেন এক্স’ প্রজন্মের জীবনযাত্রাকে তুলে ধরে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। দশকের পর দশক পার হলেও এর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। ইউসিএলএ-এর ২০২৫ সালের ‘টিনস অ্যান্ড স্ক্রিনস’ রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান ‘জেন জি’ (১৯৯৭-২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম) তরুণদের প্রিয় তালিকার ১৬ নম্বরে এখনো অবস্থান করছে ‘ফ্রেন্ডস’। খবর বিবিসির।

বর্তমানে এই জেন জি প্রজন্মের তরুণদের জীবনকাহিনি, সংকট ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে তৈরি হচ্ছে একের পর এক নতুন আমেরিকান সিটকম। ‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’, ‘অ্যাডাল্টস’, ‘দ্য সেক্স লাইভস অফ কলেজ গার্লস’ কিংবা ‘আই লাভ এলএ’-এর মতো একাধিক সিরিজ এই চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে কোনোটিই ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো কালজয়ী প্রভাব ফেলতে পারছে না। অনেকগুলো ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে অথবা দর্শক টানতে হিমশিম খাচ্ছে।

বিনোদন বিশেষজ্ঞদের মতে, জেন জি প্রজন্মের জন্য 'নতুন ফ্রেন্ডস' তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। এর পেছনে মূলত পাঁচটি বড় কারণ রয়েছে:

১. কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক টিভি মাধ্যম

‘ফ্রেন্ডস’ যখন প্রথম প্রচার শুরু হয়, তখন দর্শকের মনোযোগ সরানোর মতো একাধিক স্ক্রিন বা সামাজিক মাধ্যম ছিল না। কিন্তু এক্টিভেট-এর ২০২৬ মিডিয়া আউটলুক রিপোর্ট বলছে, ৪৩ শতাংশ জেন জি তরুণ এখন পেইড স্ট্রিম বা টিভির চেয়ে ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও দেখতে পছন্দ করে। তাছাড়া ‘ফ্রেন্ডস’-এর প্রতিটি সিজনে ২০টির বেশি পর্ব থাকত, যা দর্শকদের চরিত্রের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে ও ভালোবাসতে সাহায্য করত। আধুনিক সিটকমগুলোতে থাকে মাত্র ৮ থেকে ১০টি পর্ব, ফলে চরিত্রগুলোর সঙ্গে দর্শকের আবেগীয় সংযোগ তৈরি হয় না।

২. বর্তমান প্রজন্মকে বুঝতে নির্মাতাদের ব্যর্থতা

জেন জি সিটকমগুলোর একটি বড় দুর্বলতা হলো এগুলোর নির্মাতারা বেশিরভাগই ‘মিলেনিয়াল’ বা তার আগের প্রজন্মের। বিনোদন সাংবাদিক ম্যাক্স গাও-এর মতে, জেন জি প্রজন্মের নতুন লেখকেরা এখনো ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। ফলে বর্তমান যুগের তরুণদের মানসিকতা বা তাদের ব্যবহার করা আধুনিক ভাষা প্রবীণ লেখকদের স্ক্রিপ্টে কৃত্রিম ও বেমানান মনে হয়।

৩. জেন জি-এর হতাশা তুলে ধরা কঠিন

দর্শকেরা স্বস্তির জন্য সিটকম দেখেন, যা ‘ফ্রেন্ডস’ সফলভাবে দিতে পেরেছিল। কিন্তু বর্তমান জেন জি প্রজন্ম মহামারী, অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। আমেরিকায় তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখন সর্বোচ্চ এবং এআই-এর কারণে চাকরির সুযোগ কমছে। যেখানে ‘ফ্রেন্ডস’-এর চরিত্রগুলোর মধ্যে নব্বইয়ের দশকের অর্থনৈতিক উন্মাদনা ও কর্মজীবনের আশা ছিল, সেখানে বর্তমান তরুণদের বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন। সিটকমে এই হতাশা আর কৌতুকের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা নির্মাতাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৪. সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যের জটিলতা

পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, আমেরিকার ইতিহাসে জেন জি সবচেয়ে বেশি বর্ণ ও জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় প্রজন্ম। ‘ফ্রেন্ডস’ তৈরি হয়েছিল তুলনামূলক সমজাতীয় ও শ্বেতাঙ্গ কেন্দ্রিক সমাজকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বর্তমান যুগে এত ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি, বর্ণ ও যৌন পরিচয়ের গল্প একটি মাত্র সিটকমে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত জটিল।

৫. সর্বব্যাপী ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব

বর্তমান তরুণদের জীবন ইন্টারনেট ছাড়া চিন্তা করা যায় না। কিন্তু পর্দায় ডিজিটাল জীবন ও ফোনের ব্যবহার নাটকীয়ভাবে ফুটিয়ে তোলা বেশ অস্বস্তিকর। কিছু ধারাবাহিক সাইবার জীবনকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলে, যা বাস্তবসম্মত মনে হয় না। আবার যেগুলো সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের কেন্দ্র করে তৈরি, সেগুলোও ইন্টারনেটের বাইরের আসল জীবন ও অনলাইনের ভুয়া জীবনের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি ঠিকমতো তুলে ধরতে পারছে না।

সব মিলিয়ে, বর্তমান সিটকমগুলোর মধ্যে ‘অ্যাডাল্টস’-এর মতো কিছু সিরিজ ইতিবাচক সাড়া পেলেও, ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো সার্বজনীন আবেদন তৈরি করা আধুনিক সিটকমের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত