বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যেমন কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্র্ণ। বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে কৃষি। ২০১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, এটি মোট জনশক্তির ৪০.৬ ভাগ জোগান দিয়ে থাকে এবং দেশের জিডিপিতে এর অবদান ১৪.১০ শতাংশ। বাংলাদেশের কৃষি এখনো প্রকৃতির খামখেয়ালির ওপর নির্ভরশীল। কখনো খরা, কখনো অনাবৃষ্টিতে পুড়ছে ফসলের মাঠ। আবার কখনো অসময়ে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ভেসে যাচ্ছে নিম্নাঞ্চলের ফসল ও কৃষকের বাড়ি-ঘর, পুকুরের মাছ। ২০২০ সালে অকাল বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির কারণে হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়, যা কৃষকের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে। পাহাড়ি ঢল ও দুর্বল বাঁধের কারণে আধাপাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এর ফলে স্থানীয়ভাবে অনেক জমিতে ধান কাটা সম্ভব হয়নি এবং কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাংলাদেশে বন্যা, খরা ও শিলাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত ৬ বছরে প্রায় ৭১ দশমিক ৭৮৩ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয় এবং ৭৫ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। শিলাবৃষ্টি ঝড়ে বোরো ধান, ভুট্টা, মরিচ ও শাকসবজি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে দেশে দিন দিন বাড়ছে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা।
বৃষ্টিপাত যখন বরফের বলের আকারে পতিত হয়, তখন তাকে শিলাবৃষ্টি বলে। এটি ফসলের প্রচুর ক্ষতি করে। এ বছর মানুষ যখন ঈদুল ফিতর পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বা পালন করছেন ঠিক তখনই হঠাৎ শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বোরো ধান, গম, ভুঁট্টা, আলু, পেঁয়াজ, আখ, মরিচ বিনষ্টের কারণে কৃষকের ঈদ আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। তারা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ভাবছেন, কীভাবে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করবেন? কীভাবে আবার নতুন ফসলের চাষ করবেন? কীভাবে মেটাবেন সংসার ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ? ১২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় অসময়ে শিলাবৃষ্টির কারণে কৃষকের উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে কিশোরগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ ও সিলেট ইত্যাদি। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ২৪ মার্চ মঙ্গলবার বিকাল থেকে রাতে জেলার বিভিন্ন স্থানে শিলাবৃষ্টি ও ঝড় বয়ে যায়। ঝড়ে মিঠামইন, ইটনা, নিকলী, পাকুন্দিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে মিঠামইন উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে এই উপজেলায়। এ ছাড়া ইটনায় ৯৮৬, অষ্টগ্রামে ১৪০, নিকলীতে ১০০ হেক্টর পাকুন্দিয়াতে ১২০, হোসেনপুরে ১০ হেক্টর, কুলিয়ারচরে ৫ হেক্টর এবং ভৈরবে ২ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানা যায়, এ বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। এর মধ্যে দুর্যোগের ক্ষতির শিকার হয় ৩ হাজার ৮৬৪ হেক্টর জমির বোরো ধান। এ ব্যাপারে মিঠামইন এলাকার একজন কৃষক বলেন, হাওরে শত শত কৃষকের কাঁচা-পাকা ধান মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। শিলার আঘাতে ধান গাছ থেঁতলে গেছে। কোথাও কোথাও বোরো ধানের ছড়া ভেঙে গেছে এবং গাছ হেলে পড়েছে, যা অকাল ধান কাটার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া হাওর এলাকার অনেক বাড়ির টিনের চাল শিলাবৃষ্টিতে ছিদ্র হয়ে গেছে। উত্তরের জেলা রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও ঠাকুরগাঁওয়ে শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় আম, লিচুর মুকুল ঝরে পড়াসহ ভুট্টা, আলু ও নামলা রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও জেলায় গত কয়েক দিনে যে শিলা, ঝড় ও বৃষ্টি হয়েছে তাতে জেলার বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, জেলায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির গম, ১ হাজার ৭১৭ হেক্টর জমির ভুট্টা, ২৭৫ হেক্টর জমির আলু, ৩ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীর পেঁয়াজ এবং ৬৬ হেক্টর জমির পেঁয়াজ বীজ নষ্ট হয়েছে। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার একজন ক্ষতিগ্রস্ত ভুট্টা চাষি জানান, তিনি এ বছর তিন বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেন। প্রতি বিঘায় সব মিলিয়ে খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এই খরচের অর্ধেকটাই তিনি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। শিলাবৃষ্টি আর ঝড়ে যে ক্ষতি হয়েছে তাতে তার পক্ষে ওই ঋণ শোধ করা দূরের কথা সামনের মৌসুমে ফসলে চাষ করতে হলে তাকে আবার ঋণ গ্রহণ করতে হবে। একই সময়ে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ২৪ মার্চ বিকেলে শিলাবৃষ্টিতে ভুট্টা, মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেই সঙ্গে আম, লিচুর মুকুল ঝরে গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অনেক জায়গায় ভুট্টা, ধান ও সবজি গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।
কৃষকরা ক্ষেতে জমে থাকা পানি সরানোর পাশাপাশি হেলে পড়া গাছগুলো উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ ও ত্রিশাল উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে বোরো ধান ছাড়াও মরিচ, করলা, শসা, ও বিভিন্ন জাতের শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝরে গেছে আম ও লিচুর মুকুল। শিলাবৃষ্টির আঘাতে বিভিন্ন গ্রামে বসতবাড়ির টিনের ঘরের চাল ছিদ্র হয়ে গেছে। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার একজন কৃষক বলেন, চলতি মৌসুমে তিনি ২ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ করেন। শিলাবৃষ্টিতে ধানগাছ একেবারে ভেঙে গেছে। তার ২০ শতাংশ জমিতে রোপণকৃত মরিচ গাছ, ১০ শতক জমির শসা গাছ এবং ২০ শতাংশ জমির চাষকৃত বেগুন গাছ শিলাবৃষ্টিতে একবারে শেষ হয়ে গেছে। এ ছাড়া বাড়ির আম ও লিচু গাছের মুকুল এবং গুটি ঝরে পড়েছে। এতে তার মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক প্রকৃতির করুণার ওপর নির্ভরশীল। বৈরী আবহাওয়া ও পোকামাকড় এবং রোগের আক্রমণ যেকোনো সময় কৃষকের মাঠের ফসল নষ্ট করে দিতে পারে। ফসল নষ্ট হলে কৃষক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। অর্থের অভাবে আবার নতুন করে ফসলে চাষ করা বা ঘুরে দাঁড়ানো তার পক্ষে সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের কৃষকের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। তাদের ওপর নির্ভর করে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষির টেকসই উন্নয়ন। ভারতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে, শিলাবৃষ্টি থেকে ফসল রক্ষার জন্য শস্য বীমার প্রচলন রয়েছে। ভারতে এ ধরনের ক্ষতির সময় শস্য বীমা কর্তৃপক্ষ কৃষককে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, যা কৃষককে ঘুরে দাঁড়াতে এবং পরবর্তী বপন মৌসুমে জন্য প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে।
একবার ফসল নষ্ট হলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। এমনকি তারা নিজেদের সামান্য জমিও বিক্রি করে দিতে দ্বিধা করে না। ভারত সরকারের শস্য বীমা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুরক্ষা প্রদান করে। শস্য বীমার কারণে কোনো রকম চরম পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়াই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নিজেরাই নিজেদের জীবন নির্বাহ করতে পারেন। বাংলাদেশে শিলাবৃষ্টি, বন্যা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের জন্য বর্তমানে সীমিত পরিসরে কৃষি বীমা চালু আছে, যা আবহাওয়া সূচকভিত্তিক। সরকার হাওর অঞ্চলে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বীমা ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করার পরিকল্পান গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়। তবে এটি এখনো সারা দেশে প্রচলিত নয়। আবহাওয়া সূচকভিত্তিক কৃষি বীমা হলো এমন একটি আধুনিক বীমা ব্যবস্থা, যা খরা, অতিবৃষ্টি বা বন্যার মতো প্রতিকূল আবহাওয়ায় শস্যের ক্ষতির ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় ক্ষতিপূরণ দেয়। এটি ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য একটি সুরক্ষা কবচ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাহায্য করে। তাদের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। নির্দিষ্ট আবহাওয়া সূচক (যেমন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বা তাপমাত্রা) নির্ধারিত মাত্রার বেশি হলে মাঠ পর্যায়ে জরিপ ছাড়াই দ্রুত বীমা দাবি নিষ্পত্তি করা হয়। আবহাওয়াভিত্তিক বীমার প্রধান দিকগুলো হলো এটি উপগ্রহের তথ্য বা স্থানীয় আবহাওয়া কেন্দ্রের ডাটা সংগ্রহ করে। মাঠ জরিপের প্রয়োজন না হওয়ায় দ্রুত সময়ে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। এটি বন্যা, খলা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও শৈত্যপ্রবাহ ঝুঁকি হ্রাস করে। গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, সাধারণ বীম করপোরেশন ও প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ইত্যাদি সংস্থা দেশের নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকল্প এলাকায় বাস্তবায়ন করছে।
সরকারিভাবে বাংলাদেশের সাধারণ বীমা করপোরেশনের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে দেশের বিভিন্ন দুর্যোগপ্রবণ জেলায় আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি বীমা চালু রয়েছে। এর মধ্যে মূলত খুলনা, সাতক্ষীরা, নওগাঁ, পাবনা, নাটোর ও সিলেটসহ বিভিন্ন বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা প্রবণ জেলায়গুলোতে ধান, আলু ও গম ফসলের ওপর এই বীমা কার্যকর রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ জন্য ৩টি জেলার ২১টি উপজেলায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কার্যালয়গুলোয় ২০টি আধুনিক আবহাওয়া স্টেশন স্থাপন এবং ৬০ হাজার কৃষকের মধ্যে বীমা পলিসি বিতরণ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই কার্যক্রম সঠিক বাস্তবায়নের ফলে আরও ১০৯৬টির অধিক বীমা (১৮%) পলিসি বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। এতে সার্বিকভাবে কৃষকদের মধ্যে বীমা সম্পর্কে অনীহা ও অবিশ্বাস দূর করা সম্ভব হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে বীমা পলিসির ৫০% অর্থ এবং ১০০% ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে। প্রান্তিক কৃষককে কৃষিতে জড়িত রাখা এবং কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সব স্থানে এ ধরনের একটি বীমা কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষককে সহায়তা প্রদান প্রয়োজন। প্রয়োজনে এই পাইলট প্রকল্পের মতো ১০০% ভ্যাট সরকার কর্তৃক ভর্তুকির মাধ্যমে প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
netairoy18@gmail.com