সরকারের ভাষা কেবল সরকারের বক্তব্য নয়; অনেক সময় সেটিই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের মনোভাবের প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে সংকটের সময়ে একটি পোস্ট, একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি কিংবা একজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কয়েকটি বাক্য মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারে। ডিজিটাল যোগাযোগের এ সময়ে সরকারি বার্তা প্রকাশের পর সেটি আর শুধু সরকারি নথি থাকে না কয়েক মিনিটের মধ্যে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা, সংবাদ শিরোনাম এবং জনমতের অংশ হয়। সরকারের প্রথম ছয় মাসের অভিজ্ঞতা, এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। কিছু ঘটনায় কর্র্তৃপক্ষ দ্রুত তথ্য দিয়েছে, ভুল স্বীকার করেছে, বক্তব্য সংশোধন করেছে এবং নাগরিকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সরকারি ভাষায় দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতা কিংবা এমন এক ‘দরবারী’ ভঙ্গি, যেখানে নাগরিকের উদ্বেগ বোঝার চেয়ে কর্র্তৃপক্ষের অবস্থান প্রতিষ্ঠা যেন প্রধান হয়ে উঠেছে। অথচ ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের মূল কথা হলো সংকট মুহূর্তে ক্ষমতার ভাষার চেয়ে প্রয়োজন আস্থার ভাষা। এখানেই সরকারি যোগাযোগে দরবারী ভাষা ও দরকারি কৌশলের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসকে শুধু নীতি, অর্থনীতি বা প্রশাসনিক সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠিতে বিচার করলে, একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র আড়ালে থেকে যাবে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব নেওয়া সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে সরকার নিজে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অগ্রগতির কথা বলেছে। আবার বিশ্লেষকরা আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি পরিস্থিতি, সমন্বয় ও কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে দুর্বলতার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই ছয় মাস তাই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে সরকারের কাজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কাজটি জনগণের কাছে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, সেটিও এখন সুশাসনের অংশ। এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ সম্ভবত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক যোগাযোগ। ৩ আগস্ট প্রকাশিত প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে, ‘মিথ্যা তথ্য’ বা ‘অপপ্রচার’ ছড়ালে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে সেই অংশ বাদ দেওয়া হয়। প্রশাসনিক বিবেচনায় মিথ্যা তথ্য ঠেকানোর প্রয়োজন থাকতে পারে। সরকারের সেই উদ্বেগ অযৌক্তিক নয়। কিন্তু রিস্ক কমিউনিকেশনে ভাষা শুধু কী বলা হচ্ছে, তা নয় মানুষ কীভাবে সেটি গ্রহণ করবে, সেটিও বিবেচ্য। যখন মানুষ ইতিমধ্যে বাড়তি বিল, লোডশেডিং ও সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ, তখন অভিযোগ যাচাইয়ের আশ্বাসের আগে আইনি ব্যবস্থার কথা বললে সতর্কতা হুমকিতে পরিণত হয়। এই ঘটনায় সরকারের ইতিবাচক দিকও আছে। সমালোচনা উপলব্ধি করে, দ্রুত বক্তব্য সংশোধন করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রের বিতর্ক আরও গুরুতর শিক্ষা দিয়েছে। ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ অভিযোগ করেন, আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিদের যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কয়েকজন বিদেশি অতিথিও অনুষ্ঠানস্থল ছাড়েন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং সংশোধনের আশ্বাস দেন। পরে মন্ত্রণালয় প্রামাণ্যচিত্র সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানায়। অনুষ্ঠান চলাকালে উত্তেজনার মধ্যে একজন প্রতিমন্ত্রীর তিরস্কারধর্মী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিপরীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনা ছিল তুলনামূলকভাবে কার্যকর ‘ডি-এসকেলেশন’। অর্থাৎ একই সংকটে সরকারের ভালো ও খারাপ দুই ধরনের যোগাযোগ দেখা গেছে। প্রথম ছয় মাসে আরও কয়েকটি ঘটনা একই শিক্ষা দেয়। প্রথমত, মার্চের জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর মানুষ পেট্রোলপাম্পে ভিড় করলে বিপিসি মোটরসাইকেল ও গাড়ির জ্বালানি কেনায় সীমা নির্ধারণ করে। সরকার বলছিল পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, কিন্তু একই সময়ে রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত মানুষের একাংশের কাছে উল্টো সংকটের প্রমাণ হিসেবে ধরা পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সরকারের একটি ইতিবাচক যোগাযোগ উদ্যোগ ছিল প্রবাসীদের জন্য ২৪ ঘণ্টার কল সেন্টার চালু করা এবং গণমাধ্যমে সেই তথ্য প্রচারের অনুরোধ। দ্বিতীয় ইতিবাচক উদাহরণ জুলাইয়ের বন্যা ব্যবস্থাপনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিস্থিতি জানানো, মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের তথ্য প্রকাশ, আশ্রয়কেন্দ্র, ত্রাণ বরাদ্দ এবং উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়েছে। সরকার ১০ দফা পদক্ষেপের ৎকথাও প্রকাশ করে। এখানে ‘একটি কেন্দ্রীয় কণ্ঠ’ থাকার সুবিধা দেখা যায়। তবে জাতীয় ব্রিফিংয়ের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একই ধরনের নিয়মিত, যাচাইকৃত আপডেট নিশ্চিত হলে এই মডেল আরও কার্যকর হতে পারে।
তৃতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের মন্তব্য। একটি পডকাস্টে দেওয়া মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, বক্তব্যটি ছিল অনানুষ্ঠানিক, সরকারি নীতি বা গবেষণাভিত্তিক বক্তব্য নয় এবং পরে সেটি প্রত্যাহার করেন। এখানে শিক্ষা হলো, একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে ‘ব্যক্তিগত নাগরিক’ হয়ে থাকেন না। তার ব্যক্তিগত বক্তব্যও, সরকারি অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য নিয়মিত মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রশিক্ষণ এখন আর বিলাসিতা নয়। চতুর্থত, এইচএসসি পরীক্ষা ও শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্য। ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের সঙ্গে যখন ওই মন্তব্য যুক্ত হয়, সংকট দ্রুত বড় হয়ে ওঠে। পরে শিক্ষামন্ত্রী সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা দিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এখানে পরবর্তী প্রতিকার যথার্থ হলেও, শুরুতেই সহমর্মিতার অভাব পরিস্থিতির রাজনৈতিক ও আবেগগত খরচ বাড়িয়েছে। সংকটের প্রথম বিবৃতিতে নীতি ব্যাখ্যার আগে মানুষের কষ্ট স্বীকার করাই ‘এমপ্যাথি ফার্স্ট’ নীতি।
পঞ্চমত, সরকারের ১০০ ও ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিং ও ই-ডায়েরি প্রকাশ জনসংযোগের কাঠামোগত একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। ১০০ দিনের ই-ডায়েরিতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মকাণ্ড ও পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়; ১৮০ দিনেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র সাংবাদিকদের সামনে সরকারের কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং প্রশ্নোত্তরের সুযোগ ছিল। ধারাবাহিক রিপোর্টিং সরকারের জবাবদিহি বাড়াতে পারে। তবে এটি যেন কেবল ‘সাফল্যের প্রচারপত্র’ না হয়। লক্ষ্য কত ছিল, কত অর্জিত হয়েছে, কোথায় ব্যর্থতা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়সীমা কী এসব একই প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তাই ছয় মাসের অভিজ্ঞতা থেকে, সরকারের জন্য কয়েকটি কাঠামোগত শিক্ষা স্পষ্ট। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে শুধু একজন জনসংযোগ কর্মকর্তা নয়, স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন ও ক্রাইসিস রেসপন্স সেল প্রয়োজন। জাতীয় ইস্যুতে ‘সিঙ্গেল সোর্স অব ট্রুথ’ নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য না আসে। গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট ও বক্তব্যে ‘ফোর-আই রিভিউ’ অর্থাৎ অন্তত দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার যাচাই চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার ডিজিটাল মনিটরিং, জনমতের প্রবণতা বিশ্লেষণ, পূর্বপ্রস্তুত ‘হোল্ডিং স্টেটমেন্ট’, মুখপাত্র প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি বড় ঘটনার পর কমিউনিকেশন অডিট জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, জনসংযোগকে সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল হিসেবে নয়, জনগণের আস্থা রক্ষার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। ভুল হলে দ্রুত স্বীকার ও সংশোধন, সরকারের কয়েকটি ঘটনায় সেই সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া গেছে। আবার অপ্রস্তুত বক্তব্য, তিরস্কারের ভাষা, সমন্বয়হীন বার্তা ও যথেষ্ট যাচাই ছাড়া রাষ্ট্রীয় কনটেন্ট প্রকাশ দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানগত কাঠামো এখনো শক্ত হয়নি। ছয় মাস কোনো সরকারকে পূর্ণাঙ্গ বিচার করার জন্য দীর্ঘ সময় নয়; কিন্তু তার যোগাযোগ-সংস্কৃতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা বোঝার জন্য যথেষ্ট। বাস্তবে তথ্যের পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক সময়, সঠিক ভাষা, সহমর্মিতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়। একটি কঠোর শব্দ, একটি অস্পষ্ট বাক্য কিংবা দুই প্রতিষ্ঠানের দুই ধরনের বক্তব্য সবই এমন সময়ে সংকটকে বড় করে তুলতে পারে। আবার সময়মতো ভুল স্বীকার, পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং নাগরিকের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আস্থা পুনর্গঠনের পথ তৈরি হয়। সরকারের প্রথম ছয় মাসের ঘটনাগুলো শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন জনসংযোগ-ভুলের গল্প নয়, এগুলো রাষ্ট্রীয় যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও পেশাদার করার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত। সরকারের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হলো; এমন একটি যোগাযোগ-সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে প্রশংসামূলক ‘দরবারী ভাষা’ কিংবা প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ার বদলে প্রাধান্য পাবে তথ্য, দায়িত্ব, সহমর্মিতা ও কৌশল। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রে ভালো ক্রাইসিস কমিউনিকেশন কোনো সৌন্দর্যবর্ধক জনসংযোগ নয় এটি আস্থা, জবাবদিহি এবং কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য অংশ।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক