মামলাজট

যতই রূপক ধরে সাক্ষীকে সোনার হরিণের মতো অবাস্তব বলে চিহ্নিত করি না কেন, দেশের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার পরিমাণ ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৭৩১টি। সুপ্রিম কোর্ট থেকে পাওয়া এই অঙ্ক দেশের উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতে ঝুলতে থাকা ও চলমান মামলার হিসাব। শুধু সাক্ষীর অভাবে অনেক মামলা ঝুলে আছে ২০ থেকে ২৬ বছর। অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি মামলার মধ্যে ফৌজদারি মামলা রয়েছে ২৩ লাখ ৭২ হাজার। সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন ১১টি গুরুতর ফৌজদারি মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেশ রূপান্তর জানতে পেরেছে, সাক্ষীর গরহাজিরা কিংবা অনিয়মিত সাক্ষ্যের কারণে কমপক্ষে ১৪ থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত বিচার অনিষ্পন্ন থেকে গেছে। কী ভয়াবহ পরিস্থিতি নিম্ন ও উচ্চ আদালতের। মামলার জট আর সাক্ষী-সাবুদ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে মামলাজট। একজন পাবলিক প্রসিকিউটর বলেছেন, দিনের পর দিন সমন পাঠালেও সাক্ষী আসে না। তাদের নির্ধারিত ঠিকানায় খোঁজ নিয়েও পাওয়া যায় না। সাক্ষী যেন সোনার হরিণের মতোই। এমতাবস্থায় মামলা চালানো দায় হয়ে পড়ে। আসামিপক্ষ থেকে মামলা অব্যাহতি চায় এবং অনেক সময় তারা অব্যাহতি পায়। একজন আইনজীবী বলেছেন আসামিরা তদবির করে না। সাক্ষীও আসে না। তাই দীর্ঘদিনেও মামলা নিষ্পত্তি হয় না।

আইনের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে এই প্রচলিত মিথটির মর্মমূলে আছে বিচার সঠিক সময়ে না হওয়ার ফলে। কেন সঠিক সময়ে মামলা শেষ করা যায় না, তার অন্যতম কারণ শুধু সাক্ষীর অনুপস্থিতিই নয়, সাক্ষীর জীবনের নিরাপত্তা দান ও রাহা-খরচের বিষয়টি অনেকটাই এর সঙ্গে জড়িত। প্রধান কারণ জীবনের নিরাপত্তাই। নেপথ্যে থাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও সীমাবদ্ধতা। ফলে সাক্ষ্য দিতে অনুৎসাহী তারা। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলে সাক্ষী অনেক বিষয় ভুলে যায়। স্মৃতি তাকে প্রতারিত করে কিংবা অর্থ বিনিময়ের কল্যাণে অনেক সাক্ষী উল্টো সাক্ষ্য দেয়। আদালতে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আদালতে বিচারকসহ অন্যান্য জনবলের ঘাটতির কারণে বিদ্যমান বিচারকরা ন্যায়বিচার সম্পন্ন করতে পারেন না। যেহেতু এতকাল অধস্তন আদালতের বিচারকরা বদলি হয়ে এসেছেন জনপ্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তারা অস্থায়ী বিচারক বিধায় তাদের মানসিকতায় এক রকম গা-ছাড়া ভাব থাকে। গায়ে লাগতে পারে এমন মামলা নিষ্পত্তিতে গড়িমসি করেন অনেকে। এজন্য জমেছে মামলার স্তূপ।

যে লাখ লাখ মামলা জমেছে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে, সেগুলো কীভাবে সম্পন্ন হবে? উচ্চ আদালতে বিচারকের পদ খালি পড়ে আছে। আর অধস্তন আদালতেও পড়ে আছে মামলা। সেখানেও বিচারকের ঘাটতি আছে। এগুলোর দায়িত্ব এখন গিয়ে পড়েছে সদ্য আলাদা (স্বাধীন) হওয়া বিচার মন্ত্রণালয়ের কাঁধে। এই মন্ত্রণালয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে বিচারকাজ নিয়মিত করতে পারলে কয়েক বছরের মধ্যে মামলার স্তূপ অনেকটাই কমে আসতে পারে। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কো-অর্ডিনেশনের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থায় গতি আনতে পারলে সময়মতো বিচার সম্পন্ন করা যাবে। তাহলে বিচারের বাণী আর নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে না বলেই আমরা ধারণা করি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে পারলে ন্যায়বিচার কায়েম সহজ। স্বার্থটা জনগণের নাকি সরকারের, সেটা বুঝতে হবে। যদিও ন্যায়বিচারের বিষয়টি নির্ভর করে বিচারকের নিজের বুদ্ধি আর বিবেচনার ওপর। ইংল্যান্ডের প্রয়াত আইন দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম বলেছিলেন, সাক্ষ্য হচ্ছে বিচারকের চোখ ও কান। কোন সাক্ষ্য সত্য আর কোনটা বানোয়াট তা উপলব্ধি করতে হবে বিচারককেই। দালিলিক প্রমাণ, ঘটনা দেখার বিবরণ ও শোনা এবং গুরুত্বপূর্ণ  উপলব্ধির ওপরই ন্যায়বিচার কায়েম হতে পারে।