আমদানি পণ্যের পর এবার রপ্তানি পণ্যেও বাড়ল জাহাজ ভাড়া। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে ইউরোপ ও আমেরিকাগামী জাহাজগুলোয় কনটেইনারপ্রতি ৮০০ থেকে ১২০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ভাড়া বেড়েছে। এসব ভাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত যুক্ত হচ্ছে বাড়তি ইন্স্যুরেন্স ফি এবং জ্বালানি তেলের বাংকারিং (বন্দরে বা মাঝ সমুদ্রে জাহাজে তেল নেওয়ার প্রক্রিয়া) ফি। অনির্ধারিত এসব বাড়তি চার্জে দিশেহারা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। এদিকে হরমুজ প্রণালির পর যদি সুয়েজ খাল পথও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়ায়নি। এতে অভ্যন্তরীণ রুটে জাহাজ ভাড়া না বাড়লেও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহনে ঠিকই ভাড়া বাড়ছে। চলতি মাসের শুরুতেই দেশের সব আমদানি পণ্যে কনটেইনারপ্রতি প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলার করে ভাড়া বাড়িয়েছিল শিপিং কোম্পানিগুলো। এই ধাক্কা কাটিয়ে না উঠতেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে শিপিং কোম্পানিগুলোর বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে বলে জাহাজ ভাড়াও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভাড়া বেড়েছে ইউরোপ ও আমেরিকা রুটে। একসময় শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের ওয়েবসাইটে বাড়তি ভাড়ার ঘোষণা দিলেও, এখন আর সেই ঘোষণা দিচ্ছে না। পণ্যের আনা-নেওয়ার অর্ডার করতে গেলেই বাড়তি ভাড়ার কথা জানিয়ে দিচ্ছে। পণ্যের ভাড়ার ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানিকারক ও শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশন। মূলত এই সংগঠনও ভাড়ার কাজগুলো করে থাকে। ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিপিং লাইনগুলো একসময় ইতিমধ্যে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী সপ্তাহে হয়তো আরও বাড়তে পারে। একসময় তারা ওয়েবসাইটে বাড়তি ভাড়ার কথা ঘোষণা দিলেও এটি নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারি সংস্থা আইনগতভাবে ঝামেলা করে বিধায় অর্ডারপ্রতি বাড়তি ভাড়ার কথা জানিয়ে দিচ্ছে।
কী পরিমাণ বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগে ইউরোপের বন্দরগুলোয় ৪০ ফুটের প্রতি কনটেইনার পণ্যের ভাড়া ছিল ১১০০ থেকে ১২০০ মার্কিন ডলার। যুদ্ধের কারণে এই রুটে সবচেয়ে বেশি ভাড়া বেড়ে প্রায় ২৮০০ থেকে ৩০০০ মার্কিন ডলার করা হয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার বন্দরগুলোয় আগে যেখানে ১৭০০ থেকে ১৮০০ মার্কিন ডলারে পণ্য পাঠানো যেত, এখন তা ৩০০০ থেকে ৩২০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত উঠেছে।
তবে জাহাজ ভাড়ার সঙ্গে ইন্স্যুরেন্স ফি ও তেলের বাংকারিং চার্জও (কনটেইনারপ্রতি ৩০০ ডলার) বাড়তি নেওয়া হচ্ছে বলে খায়রুল আলম সুজন জানান।
এদিকে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, গড়ে সব রুটে ২০ শতাংশ জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভাড়া বেড়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বন্দরগুলোয়। ইউরোপের বন্দরগুলোয় পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া বেড়েছে এবং আমেরিকার বন্দরগুলোয় বেড়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তো অনেকের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে।
এই চুক্তির মধ্যে ভাড়া নির্ধারণ করা রয়েছে। তাহলে এখন কীভাবে বাড়তি ভাড়া নেবে এই প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, এখন সারচার্জ হিসেবে বাড়তি ভাড়া যুক্ত করবে। কারণ যখন চুক্তি করা হয়েছিল, তখন তো তেলের দাম এত বাড়তি ছিল না। বিবাজারে যেখানে তেলের দাম বেড়েছে, তখন জাহাজ ভাড়া না বাড়িয়ে কোনো উপায় নেই।
তেলের দাম বাড়াতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। আর এসব খাতের মধ্যে পোশাক খাতের ওপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। পোশাক খাতের ওপর কেন বেশি পড়বে জানতে চাইলে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এসএম আবু তৈয়ব বলেন, ‘বিবাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সিনথেটিক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বাড়তি দামে এবং বাড়তি ভাড়ায় মালগুলো আমদানি করতে হচ্ছে। আবার রপ্তানির সময় বাড়তি ভাড়া দিয়ে এগুলো পাঠাতে হচ্ছে।’
কিন্তু রপ্তানির ভাড়া তো ক্রেতা দিয়ে থাকেন। তাহলে সমস্যা হবে কেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ক্রেতা পাঁচ থেকে ছয় মাস আগেই চুক্তি করে রেখেছেন। এখন তো সেই চুক্তি থেকে বাড়তি ভাড়া দেবে না। ব্যবসা চালিয়ে যেতে হলে এই বাড়তি ভাড়া আমাদের পরিশোধ করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এমনিতেই কম মার্জিনে অর্ডার নিয়ে থাকি। এখন এই বাড়তি ভাড়ার চাপে আমরা দিশেহারা।’
আন্তর্জাতিক বাজারে এক মাসে কয়েক দফায় বেড়ে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেল ১১৪ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছে। বিশে^র সমুদ্র বাণিজ্যের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম হয়ে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ২৯ লাখ ৬১ হাজার ১১৮ একক কনটেইনার পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছিল। এর মধ্যে আমদানি পণ্য ছিল ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ২৭০ একক কনটেইনার এবং রপ্তানি পণ্য ছিল ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৮ একক কনটেইনার। তাই বি সমুদ্র বাণিজ্যের প্রভাব এখানেও পড়ছে।