চট্টগ্রামের শিল্পগোষ্ঠী সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের তথ্য পেয়েছে দুদক। দেশের ১২টি প্রতিষ্ঠান থেকে এসব অর্থ লোপাট করা হয়। এ সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনিয়মের এ তথ্য পায় দুদক। ইতিমধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের ঋণ এবং করোনাকালে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ নিয়ে আত্মসাতের ঘটনায় ছয়টি মামলাও করেছে সংস্থাটি।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে সাদ-মুসা গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ মোহসিন ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ঋণের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পরে এটি অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদকে পাঠানো হয়। কমিশন অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সংস্থাটির উপ-পরিচালক মো. আল-আমিনকে প্রধান করে একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। তবে দুদক অনুসন্ধানে সাদ-মুসা গ্রুপের দেশের ১২টি ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাতের তথ্য পেয়েছে। অনুসন্ধান শেষে এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির একটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। দেশের ১২টি ব্যাংক থেকে এসব ঋণ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় পৃথক ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুরো অনুসন্ধান শেষ হয়নি। অনুসন্ধান দলের প্রধান উপ-পরিচালক মো. আল-আমিনকে চট্টগ্রামে বদলি করায় অনুসন্ধানকাজে কিছুটা ধীরগতি নেমে এসেছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ১২০ কোটি টাকার কম্পোজিট ঋণসীমা অনুমোদনের মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের সঙ্গে সাদ-মুসা গ্রুপের ব্যবসায়িক সম্পর্ক শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে গ্রুপটির ঋণসীমা ৯৫৯ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়ে। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে সাদ-মুসা হোমটেক্স অ্যান্ড ক্লথিং লিমিটেডের নামে ৪১৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এই ঋণের একটি অংশ প্রকৃত ব্যবসায় ব্যবহার না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, রেডিয়াম কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। রেডিয়াম কম্পোজিট ও সাদ-মুসা গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে খোলা ইইএসএম করপোরেশনের হিসাব ভুয়া বিল লেনদেনে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
তথ্য বলছে, সাদ-মুসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নামে-বেনামে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঋণের অর্থ পরিশোধের পরও ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সাদ-মুসা গ্রুপের কাছে পাওনা ছিল ১ হাজার ১৮০ কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সাদ-মুসা গ্রুপের কাছে পাওনা প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও করোনাকালে প্রণোদনার ৪০০ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংকের প্রায় ৯৫ কোটি টাকা ও প্রাইম ব্যাংকেও ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
৪৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার মামলা : দুদক অনুসন্ধানে নেমে ন্যাশনাল ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ৪৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য-প্রমাণ পায়। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাদ-মুসা গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ মোহসিনসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন করে দুদক। মামলায় ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাদেরও আসামি করা হয়। মামলায় এজাহারে বলা হয়, ঋণের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার, যথাযথভাবে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই না করা ও নিয়ম না মেনে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি মূলত কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
করোনার প্রণোদনা ঋণের ৪০৪ কোটি টাকা : সাদ-মুসা গ্রুপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি করোনাকালে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ নিয়ে। ৪০৪ কোটি টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মোহাম্মদ মোহসিনসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ২০২৫ সালের মে মাসে এ মামলা করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, সাদ-মুসা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোহসিন ও রেডিয়াম কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরস্পর যোগসাজশে ভুয়া কাগজপত্র ও অনুমোদনবিহীন প্রক্রিয়ায় প্রণোদনা ঋণ নেন। ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রকৃত আর্থিক প্রয়োজন যাচাই না করেই ৪০৪ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেন। পরে এই অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একাধিক ধাপে স্থানান্তর, ফ্লোর কেনা, আগের ঋণ কিস্তি পরিশোধ ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়।
পূবালী ব্যাংকের প্রায় ৯৫ কোটি টাকা : পূবালী ব্যাংকের প্রায় ৯৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাদ-মুসা গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ মোহসিন, তার স্ত্রী শামীমা নারগিস চৌধুরী ও পূবালী ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে মামলা করে দুদক। মামলার এজাহারে বলা হয়, এমএ রহমান ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজের নামে ঋণ নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম ও ঋণ মঞ্জুরিপত্রের শর্ত ভেঙে কাগুজে বিল তৈরি এবং ২৫টি লোকাল এলসির মাধ্যমে ওই ৯৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
প্রাইম ব্যাংকের ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা : প্রাইম ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মোহাম্মদ মোহসিনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের মার্চে মামলা করে দুদক। মামলার এজাহারে বলা হয়, সাদ-মুসা গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ১০০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদিত প্রকল্প ঋণের মূল অর্থ হিসেবে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা বেড়ে সুদসহ দাঁড়ায় ৮৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকায়।
সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণ নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানগুলোতে একটি অভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে, তা হলো একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়ার পর তা আংশিক বা পুরোটা অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর, পুরনো ঋণ সমন্বয়, কাগুজে বিল বা এলসির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ ঘোরানোর অভিযোগ। ন্যাশনাল ব্যাংককেন্দ্রিক অনুসন্ধানে এমন অভিযোগও এসেছে যে, সাদ-মুসা হোমটেক্স অ্যান্ড ক্লথিংয়ের নামে নেওয়া ঋণের একটি অংশ অন্য প্রতিষ্ঠানের ঋণ সমন্বয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল। করোনাকালে প্রণোদনা ঋণের ক্ষেত্রেও অর্থ একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানান্তর ও পুরনো ঋণ পরিশোধে ব্যবহারের অভিযোগ করেছে দুদক।
বিএফআইইউর অনুসন্ধানেও অনিয়ম : বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য উঠে আসে। তখনই বিষয়টি দুদককে জানানো হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়। বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে সম্পদ, কারখানা ও শিল্পপার্কের জমি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সাদ-মুসা শিল্পপার্কে গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারখানা এবং প্রায় ২০০ বিঘা জমির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যা ঋণের বিপরীতে সহায়ক জামানত হিসেবেই খুবই কম।