দেড় মাসের শিশুও হামে আক্রান্ত!

দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত টিকাদান সূচি অনুযায়ী ৯ মাস বয়সের আগে শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়, কারণ এ সময় পর্যন্ত মাতৃগর্ভ থেকে পাওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতার সুরক্ষায় থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, ৯ মাসের আগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি উদ্বেগজনক হারে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এই অস্বাভাবিক প্রবণতা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। এ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আজ সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টেকনিক্যাল কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে টিকার সময়সূচি পরিবর্তনসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

বর্তমানে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী (ইপিআই) শিশুকে ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ডোজে কাভারেজ প্রায় ৯২ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজে প্রায় ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ৮-১০ জন টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতি কয়েক বছর ধরে জমতে জমতে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়। সেজন্য প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের কভার করা হয়। কিন্তু ২০২০ সালের পর আর ক্যাম্পেইন হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘২০১৬ ও ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন করা হয়। কিন্তু করোনা-পরবর্তী বাস্তবতায় ২০২৪ সালের ক্যাম্পেইন করা সম্ভব হয়নি। এতে টিকার বাইরে একটি বড় অংশ থেকে গেছে, যা এখন সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০২৪ সালে যে ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, সেই ভ্যাকসিন আমাদের হাতে আসছে। কিন্তু লজিস্টিক এবং ফান্ডিং গ্রাভি এখনো দেয়নি। তাদের মেইল করছি। খুব শিগগিরই তারা এটার ব্যবস্থা করবে। আমরাও সেই মতো করে একটা কোয়ালিটি ক্যাম্পেইন করার প্রস্তুতি আগাচ্ছি। যাতে এ পরিস্থিতি স্মুথলি মোকাবিলা করতে পারি।’

তিনি আরও জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অনেকের বয়স ৯ মাসের কম। এটা আমাদের জন্য সত্যিই আশ্চর্যের এবং উদ্বেগজনক। রাজশাহীতে যারা মারা গেছে তাদের অধিকাংশের বয়সও ৯ মাসের কম।

ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘আমাদের ওপর আরও চাপ ছিল, যাতে আরও দেরিতে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ ১২ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৮ মাসে। কিন্তু এখন যা দেখা যাচ্ছে, তা রীতিমতো আশ্চর্যের বিষয়। ৯ মাসের আগেই শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি হাম নিয়ে যারা হাসপাতালে আসছে বা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের অনেকেরই বয়স ৯ মাসের কম। শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কি কমে যাচ্ছে কি না, সেটাও বিবেচনা করে দেখতে হবে। সেইমতো করেই টিকা দেওয়ার সময় এগিয়ে আনতে হবে কি না, ৯ মাসের জায়গায় ৬ মাস কিংবা আরও কম করতে হবে কি না, তা ভাবতে হবে। শিশুকে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং করালে এ রকম হওয়ার কথা না।’

‘অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় দুই বছরে অনেক প্রোগ্রামই হ্যাম্পার হয়েছে’ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেমন ভিটামিন এ ক্যাপসুল তারপর কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো, সেটাও হয়নি। এগুলো সব মিলেই হয়তো বা এ রকম হচ্ছে কি না। গতকাল সোমবার টেকনিক্যাল কমিটির একটা মিটিং আছে। সেই মিটিংয়ে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে। টেকনিক্যাল গ্রুপ কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেই মতো করে এগোতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাইরের কোনো সিকুয়েন্স এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে আসেনি। জিন এক্সপার্ট পরীক্ষা করে দেখা গেছে আগের সিকুয়েন্সই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা না গেলে প্রতিবছর যারা কাভারেজের বাইরে থাকে তা বাড়তে বাড়তে চার-পাঁচ বছরের মাথায় গিয়ে আউট ব্রেক হয়। এখন সেটিই হয়েছে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৯০ শতাংশই টিকা নেয়নি। এ ছাড়া একটা অংশ কম বয়সী। দেড় মাসের শিশুও হাম নিয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বাতিলের পর থেকে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এখন দ্রুত টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। বাসাবাড়িতে যারা রোগী আছে তাদের আইসোলেট করে এক জায়গায় রেখে খাওয়া-দাওয়া দেওয়া আর পর্যাবেক্ষণ করা, যাতে বেশি ছড়াতে না পারে।’

১২ দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু : ময়মনসিংহ প্রতিনিধি মো. মঈন উদ্দিন রায়হান জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১২ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ৬৬ শিশু চিকিৎসাধীন। ১৭ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ১০৬ শিশু ভর্তি হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই এক বছরের কম বয়সী।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৮ মার্চ গৌরীপুরের চার মাস বয়সী ওয়াজকুরুনী এবং ২৬ মার্চ ময়মনসিংহ নগরের তনুসা (৩) ও সামিয়া (২), ২৮ মার্চ বিকেলে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রামের সাত মাস বয়সী শিশু লিয়ন, একই দিন রাত ১১টার দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার ছয় মাস বয়সী নুরুন্নবী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

গৌরীপুর থেকে আসা এক বছরের শিশু তানিয়া আক্তারের মা বলেন, দুদিন আগে মেয়ের শরীরে হঠাৎ জ¦র ও লাল দানা দেখা দেয়। স্থানীয় চিকিৎসক দেখানোর পর দ্রুত এখানে নিয়ে আসি। কিন্তু এত রোগী দেখে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।

শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে।

হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম জানান, আগে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়নি। রোগীর চাপ সামলাতে পৃথক কর্নার চালু করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আইসোলেশন ওয়ার্ড সম্প্রসারণ করা হবে। বর্তমানে ময়মনসিংহ ছাড়াও নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুর থেকে আসা শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

রাজশাহীতে বাড়ছে প্রকোপ : রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আহসান হাবীব অপু জানান, রাজশাহী বিভাগে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি মার্চের শুরু থেকে ২৬ মার্চ ল্যাব পরীক্ষায় ৭৭ জনের শরীরে হামের জীবাণু নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন হাসপাতালে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এদের অধিকাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাস। যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের কারোরই আগে টিকা দেওয়া নেই।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। এ ছাড়া রাজশাহীতে ১০ জন, নাটোরে ৬, নওগাঁয় ৫ এবং বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় একজন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে। তবে জয়পুরহাটে এখন পর্যন্ত কোনো পজিটিভ কেস পাওয়া যায়নি।

পরিসংখ্যানে আরও বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজন পাবনা জেলার এবং একজন রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ১২৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ৭০ জন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য মতে, রামেক হাসপাতালে হামের সন্দেহভাজন ২৩০ জন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এ পর্যন্ত ৫৪ জনের ফল হাতে এসেছে, যার মধ্যে ২৮ জনের রিপোর্ট পজিটিভ অর্থাৎ তাদের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম বলেন, আমাদের অনুসন্ধানী টিমকে আরও গতিশীল করেছি। যেখানে হামের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে বা শিশু পাওয়া যাচ্ছে দ্রুত তাদের আইসোলেটেড করা হচ্ছে। তাদের পৃথককরণ করে চিকিৎসা গ্রহণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, যারা কোনো কারণে হামের টিকা পায়নি তাদের টিকার আওতায় আনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যশোরে দু’মাসে আক্রান্ত শতাধিক : যশোর প্রতিনিধি তবিবর রহমান জানিয়েছেন, যশোরে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দুই মাসে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে দুই শতাধিক শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই টিকা না নেওয়ায় সংক্রমিত হয়েছে।

গতকাল দুপুরে শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কেউ হাম শনাক্ত করতে, আবার কেউ বসন্ত সন্দেহে পরীক্ষা করাতে হাসপাতালে এসেছে।

মনিরামপুর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা উজ্জ্বল দাস জানান, তার আট মাস বয়সী মেয়ের জ¦র ও শরীরে র‌্যাশ দেখা দিলে প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পরে হামের সন্দেহে তাকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. সৈয়দ নূর-ই হামিম বলেন, হাসপাতালে টিকার কোনো সংকট নেই। তবে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণেই শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। সচেতনতা বাড়ানো গেলে এই হার কমানো সম্ভব।