বেসরকারিভাবে নন-ইউরিয়া সার, আগামী অর্থবছর ২০২৬-২৭ সাল থেকে আর আমদানি করা হবে না এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশেষজ্ঞ মহল। সরকারের গুদামে যে পরিমাণ ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার রয়েছে, তা দিয়ে বোরো মৌসুম পর্যন্ত চলতে পারে। অর্থাৎ আগামী জুন পর্যন্ত চলবে। তাহলে আসন্ন আমন মৌসুমে কী করবে মন্ত্রণালয়? বেসরকারি আমদানি বন্ধ করে দিলে সরকারের নন-ইউরিয়া সার যেমন ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সরকার জিটুজি পদ্ধতি এবং বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে আমদানি হয়ে আসছে। কৃষিসংশ্লিষ্ট সংস্থা কেমিক্যাল করপোরেশন ও বিএডিসি মিলে সেই ঘাটতি বা চাহিদা মেটাতে পারবে কি না, এ-প্রশ্ন উঠেছে। তাদের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের জন্য গুদাম সক্ষমতা আছে কি না, তা অনুমানভিত্তিক হলে চলবে না। কারণ বিদ্যমান গুদামের মাধ্যমে তারা চাহিদার এক-চতুর্থাংশই কেবল মজুদ রাখতে পারেন। এর একটি অংশ কৃষকের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য পরিবহনাধীন লাইনে থাকে। অর্থাৎ বাদবাকি সার কোথায় সংরক্ষিত হবে? উল্লেখ্য, সারা দেশে ইউরিয়া, নন-ইউরিয়া সারের প্রয়োজন ৬৫ লাখ ২৬ হাজার টন। এর মধ্যে ৩৯ লাখ টন সার নন-ইউরিয়া। বর্তমানে বিএডিসির সংরক্ষণাগার রয়েছে ৯৮টি সাধারণ সংরক্ষণাগার আর ৪৬টি পিএফজি। সব গুদাম মিলিয়ে ধারণক্ষমতা ২ দশমিক ৮০ লাখ টন। সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৬ দশমিক ৫০ লাখ টন প্রায়।
নির্মাণাধীন সংরক্ষণাগারগুলোর ধারণক্ষমতা হিসাবে নিলেও, কৃষি মন্ত্রণালয় কি এ-কাজ সুসম্পন্ন করতে পারবে? দ্বিতীয় চিন্তা হচ্ছে, হুট করে নন-ইউরিয়া আমদানি করে খরচ বাঁচলেও, তার ব্যবস্থাপনায় সংস্থাগুলোর সেই দক্ষতা ও যোগ্যতা আছে কি না, তা পরিমাপ করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, কৃষি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে হলে, সারের সময়মতো জোগানের বিকল্প নেই। পরিবহনের ক্ষেত্রেও রয়েছে ঝুঁকি। এর জন্য রয়েছে গাড়িওয়ালাদের গররাজির বিষয়। ঠিকমতো সার যদি ডিলারের গুদামে না পৌঁছায়, তাহলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং সব ধরনের সার উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জনে যে পরিমাণ সময় ও দক্ষতা প্রয়োজন, তা কি কৃষি মন্ত্রণালয়ের আছে? একটি পরিকল্পনার পেছনে যেসব কারণ থাকে, তার ব্যাকআপ রেখে সেই উদ্যোগের হাল ধরতে হবে। নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্র? হাতে আছে মোটে ২ মাস। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সার-হাব বলে খ্যাত মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি করা কঠিন। যদিও কিছু সার আসছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি হলে পরিস্থিতি নাজুক হতে পারে।
এটা মনে রাখতে হবে, বিশ্বের রাজনৈতিক সামরিক পরিস্থিতি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি ব্যাহত হলে, শুধু রাশিয়া ও চীন থেকে সার আমদানি করা যেতে পারে। কিন্তু রাশিয়ার ওপর মার্কিনি নিষেধাজ্ঞা থাকায়, দেশটির পারমিশন না নিলে আমদানি করা যাবে না। গ্যাস সংকটের কারণে এমনিতেই দেশের শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন করে সারের উৎপাদন বাড়ানো যাবে না। ফলে সার সরবরাহ চেইন ধসে পড়তে পারে। আসন্ন আমন মৌসুমের উৎপাদন যদি নিম্নমুখী হয়, তাহলে সেই খাদ্যঘাটতি মোকাবিলা করা কঠিন হবে। আমরা প্রায় সবকিছুতেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। বিগত সরকার এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৭ বছরে পরিস্থিতি এমনটাই হয়েছে। আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে, তাতে কোনো ভুল নেই। কিন্তু বৈশ্বিক সময় বিবেচনা করলে, এই মুহূর্তে নন-ইউরিয়া সার আমদানি সরকারের নিজের কাঁধে না নিয়ে, বেসরকারি আমদানির ওপর নির্ভর করা ভালো। হাতে সময় নিয়ে সুপরিকল্পনা সুফল দিতে পারে। সিদ্ধান্ত যেন ষড়যন্ত্রের অংশ না হয়, সেটি বিবেচনা করতে হবে।